Muktijudho


একাত্তরের গণ হত্যা ঃ একটি দলিল
ঢাকা, ডিসেম্বর ৭ঃ ঊনিশশো একাত্তর সালে বাংলাদেশের (পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তান) গণ হত্যার ভয়াবহতার সাথে সম্ভবত জার্মানদের হাতে সোভিয়েত  যুদ্ধ বন্দী ও ইহুদীদের নিধন এবং রোয়ান্ডার গণ হত্যারই একমাত্র তুলনা করা যেতে পারে। স্বাধীনতার দাবী করা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীদের আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দিতেই লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক সরকারের সেনা বাহিনী পরিকল্পিত ভাবে নামিয়ে এনেছিল এই আক্রমণ। 

পূর্ব কাহিনী ভারতীয় উপ মহাদেশে প্রায় দু'শো বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সঙ্গেই সৃষ্টি হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের (পূর্ব ও পশ্চিম) । ধর্ম ও জাতির ভিত্তিতে ভারত ভাগের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও বিদায়ী ব্রিটিশ শাসক ও বেশ কিছু ভারতীয় রাজনীতিক প্রবল ভাবে চাইছিলেন ভারতের হিন্দু অধ্যুষিত অংশ (ভারত) ও মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল গুলি(পাকিস্তান) নিয়ে দু'টি পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি করতে, এবং শেষ পর্যন্ত তাই হল। ঊনিশশো সাতচল্লিশে ভারত ভাগের সাথেই রচিত হল শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ 'ট্র্যাজেডি'।

 

সাওম্জাপ্টীসাসাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সামরিক সংঘাতে প্রান হারালেন হাজার হাজার মানুষ। পাকিস্তান থেকে হিন্দুরা ভারতে আর ভারত থেকে মুসলমানরা পালিয়ে এলেন ভারতে, যদিও তা সত্ত্বেও বহু  সংখ্যা লঘু মানুষ রয়ে গেলেন দু' দিকেই। কিন্তু এই ব্যবস্থা কোন স্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারলনা, যার ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিনটি বড় যুদ্ধের এবং একটি চতুর্থ 'প্রায় পুরোপুরি যুদ্ধের' ঘটনা ঘটে যায় । সেই সাথে ঊনিশশো সাতচল্লিশের প্রথম যুদ্ধের পরে যুদ্ধ বিরতি রেখায় বিভক্ত কাশ্মীর পৃথিবীর একটি অন্যতম 'ট্রাব্‌ল স্পট' হয়ে রইল। এ দিকে  ভারতের বিপরীত দুই প্রান্তে শত শত মাইল ব্যবধানে, জাতি পরিচয়ের ক্ষেত্রে ততোধিক দূরত্বে থাকা নব গঠিত পাকিস্তানের দু'টি অংশ পড়ে থাকল  দশকের পর দশক জুড়ে। বিশেষত, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে গণতন্ত্রকে সরিয়ে সামরিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে পূর্ব আর পশ্চিমের মধ্যে ক্রমাগত অবনতির পথে যাওয়া সম্পর্ক যেমন নয়া ঔপনিবেশিকতার চেহারা নিল, তেমনি পূর্বের বাঙ্গালিদের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকল।  শেখ মুজিবর রহমান বিধ্বংসী বন্যা ঊনিশশো সত্তরের অগাস্টে বাংলাদেশে আছড়ে পড়ে, কিন্তু তখনকার শাসকরা ত্রাণের ব্যাপারে গুরুতর অবহেলা করে, ফলে শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে থাকা আওয়ামী লীগ প্রচারের একটি বড় সুযোগ পেয়ে যায় । তারা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্ব শাসন এবং সারা দেশে সামরিক শাসনের অবসানের দাবী করে। ডিসেমবর মাসের জাতীয় নির্বাচনে তারা বাঙ্গালি অধ্যুষিত অঞ্চল গুলিতে বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে।  ঊনিশশো একাত্তরের বাইশে ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা প্রধানরা সিদ্ধান্ত নেন যে, আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থকদের গুঁড়িয়ে দিতে হবে। বিদ্রোহ দমন করতে যে গণ হত্যা  চালানো দরকার, এটা প্রথম থেকেই ঠিক করা ছিল। "ওদের তিরিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা কর, তাহলে বাকি সবাই নতি স্বীকার করবে," ফেব্রুয়ারী কনফারেন্সে তৎকালীন প্রেসিডেণ্ট ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন (রবার্ট পেণ, ম্যাসাকার [১৯৭২], পৃষ্ঠা ৫০ )। শেশেশেঈশেঈ

 

২৫ তারিখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমন করে শয়ে শয়ে ছাত্রকে হত্যা করা হয়। ঢাকার পথে পথে তখন জল্লাদ বাহিনী ঘুরছে, এক রাতের মধ্যে খুন হয়ে গেলেন ৭,০০০ মানুষ । কিন্তু এটা ছিল সবে শুরু। "এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা শহরের অর্ধেক বাসিন্দা পালিয়ে গেলেন এবং নিহত হলেন অন্তত ৩০,০০০ মানুষ । চট্টগ্রামের জনসংখ্যাও অর্ধেক কমে গেল। পুর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র মানুষ লড়াই শুরু করে দিল। একটি আনুমানিক হিসেব অনুসারে, মিলিটারির হাত থেকে বাঁচার জন্য এপ্রিল মাসে গোটা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে প্রায় তিন কোটি মানুষ অসহায় ভাবে ঘুরে বেড়িয়েছিল (পেন, ম্যাসাকার, পৃঃ ৪৮)। এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিলেন, যার ফলে সে দেশের উপর ভয়ানক চাপ সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত ভারতীয় সেনা বাহিনী হস্তক্ষেপ করে। ( গণহত্যার সময় কালে বাংলাদেশের/ পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল ৭।৫ কোটি)। এপ্রিল মাসের দশ তারিখে

 

আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এ দিকে পাকিস্তানী সেনাদের মোকাবিলা করার জন্য তৈরি হয় মুক্তি যোদ্ধা বাহিনী। স্থানীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞ এই সব যোদ্ধারা স্থানীয়  মানুষের সাথে মিশে গিয়ে গেরিলা কায়দায় লড়াই চালাতে লাগলেন। এই গণ প্রতিরোধের ফলে যুদ্ধের শেষ দিকের মধ্যেই বাংলাদেশের বিশাল অঞ্চল মুক্ত করা গেছিল।  বাঙ্গালি পুরুষ হত্যা বাঙ্গালিদের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল পুরুষদের ধরে ধরে হত্যা করা। অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বক্তব্য, " এই  গণ হত্যার মূল লক্ষ্য সন্মন্ধে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।" কারা লক্ষ্য ছিলেন ? (১) ইস্ট পাকিস্তান রেজিমেণ্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্‌স, পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনীর কর্মীরা এবং স্বাধীনতার যোদ্ধারা । (২) হিন্দুরা (৩) আওয়ামী লীগের সমস্ত পদাধিকারী থেকে নীচু তলার সদস্য-স্বেচ্ছা সেবক (৪) ছাত্র--কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং কিছু জংগী ছাত্রীও (৫) অধ্যাপক, শিক্ষক প্রভৃতি বাঙ্গালি বুদ্ধিজীবি (অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, দ্য রেপ অফ বাংলাদেশ[দিল্লি, বিকাশ পাবলিকেশন্স, ১৯৭২, পৃঃ ১১৬-১৭)। সুতরাং,গণ হত্যার সাথে যে লিঙ্গ এবং সামাজিক অবস্থানের সম্পর্ক ছিল, এটা স্পষ্ট ( বুদ্ধিজীবি, অধ্যাপক, শিক্ষক, বিভিন্ন পদাধিকারী এবং অবশ্যই যোদ্ধারা স্বাভাবিক ভাবেই বেশীর ভাগ ছিলেন পুরুষ, যদিও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের পরিবারের অন্যান্যরাও অত্যাচারের শিকার হয়ে মারা গিয়েছিলেন। তাই বাংলাদেশের ঘটনাকে একই সাথে 'জেন্ডারসাইড' এবং 'এলিটোসাইড' বলে ধরা যায়। এই দুই ধরনের আক্রমনের শিকার বহুলাংশে ছিলেন পুরুষরা । বাঙ্গালি পুরুষ এবং তরুনদের হত্যা সমাজের যে কোন স্তরের বাঙ্গালি যুবক ও কিশোর আক্রমণের লক্ষ্য ছিল। রওনাক জাহানের বক্তব্য অনুসারে, "স্বাধীনতার যুদ্ধ চলাকালীন সমস্ত সক্ষম যুবক, তরুণকেই মুক্তি যোদ্ধা বলে সন্দেহ করা হত। এদের হাজার হাজার সংখ্যায় গ্রেপ্তার ও অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বড় ও ছোট শহর গুলিতে অল্প বয়সী পুরুষ-শুন্য হয়ে গেছিল। এরা সবাই হয় ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল অথবা মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছিল। আর জে রামেল লিখেছেন, "পাকিস্তানী সেনারা অল্প বয়সী ছেলে, যারা মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিতে পারে, তাদের খুঁজে বেড়াত। এই ধরনের কিশোর-তরুণদের পাইকারি হারে ধরে নিয়ে যাওয়া হত, এবং তার পরে আর কোনদিন তাদের দেখা মিলতনা। পুরুষদের লাশ ভাসত নদীতে, পড়ে থাকত মাঠে অথবা সেনা ছাউনির কাছে। এর ফলে আতঙ্কিত পনেরো থেকে পঁচিশের কিশোর-যুবক সবাই এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম অথবা ভারতে পালিয়ে গেল ( ডেথ বাই গভর্নমেণ্ট, পৃষ্ঠা ৩২৯)। ভোএএঈ ঈহুদীদের উপর

 

নাৎসি অত্যাচারের কথা মনে পড়িয়ে দেওয়ার মত ভয়ংকর ঘটনার কথা লিপিবদ্ধ করে রামেল জানাচ্ছেন, "গণ হত্যা চলা কালীন হিন্দুদের খুঁজে বের করে ঘটনাস্থালেই মেরে ফেলা হত। পাকিস্তানী সৈন্যরা পুরুষদের পরীক্ষা করে দেখত তাদের সুন্নত করা আছে কিনা। যদি তা থাকত, তবে বাঁচত, নচেৎ মৃত্যু ।   ঢাকা শহরে এবং তার আশে পাশে পরিকল্পিত ভাবে অসামরিক পুরুষদের বাছাই করে ধরা এবং তাদের হত্যা করার ঘটনার বর্ননা দিয়েছেন রবার্ট পেন " "ঢাকার কাছা কাছি এমন সব জায়গায় সৈন্যরা গ্ণ হত্যার অভিযান চালিয়েছিল, যেখানে সাধারণত সাংবাদিকদের যাওয়া আসা নেই। ঢাকার কাছেই বুড়ি গঙ্গার ধারে হরিহর পাড়ায় তারা (সেনা বাহিনী) এমন তিনটি জিনিষ খুঁজে পেল, যাতে পাইকারি হারে হত্যা লীলা চালানোর সুবিধা হয়--একটি জেলখানা, যেখানে বেশ কিছু মানুষকে আটকে রাখা যাবে, একটি জায়গা, যেখানে বন্দীদের খুন করা যাবে এবং লাশ গায়েব করার উপায়। জেলখানাটি আসলে ছিলে নদীর ধারে থাকা পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির বেশ বড় একটি গুদাম, হত্যা স্থল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল নদীর পাড় এবং মৃতদেহ গুলি খুব সহজেই নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া গেছিল। রাতের পর রাত সেই হত্যার তান্ডব চলেছিল। সাধারনত বন্দীদের ছয় অথবা সাত জন করে এক সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে  নদীর জলে নামতে বলা হত। পাড় থেকে তাদের উপর ফেলা হত খুব জোরাল বৈদ্যুতিক আলো, আর পাড়ের উপর থেকে ছোঁড়া হত গুলি। এক দল বন্দীকে এই ভাবে গণ হারে হত্যা করে আবার আর এক দলকে নিয়ে আসা হত, এবং এই প্রক্রিয়া চলতে থাকত। সকালে গ্রামের মাঝিদের দিয়ে দেহগুলি দড়ি কেটে মাঝ নদীতে ফেলে দিয়ে আসা হত (পেন, ম্যাসাকার[ম্যাকমিলান, ১৯৭৩] পৃ ঃ ৫৫}। একই রকম

 

নারকীয় ঘটনার ঘটেছিল আর্মেনিয়া অথবা ১৯৩৭ সালে চীনের নানজিং গণ হত্যার সময়। বাঙ্গালি মহিলাদের উপর অত্যাচার আর্মেনিয়া কিংবা নানজিঙ্গের মতই পাশবিক অত্যাচারের জন্য বাঙ্গালি মহিলাদের বেছে নেওয়া হয়েছিল। একদিকে যেমন চলেছিল পুরুষদের গণহত্যা, তেমনই প্রথম থেকেই মহিলারা শিকার হয়েছিলেন নির্বিচার গণ     ধর্ষণের। আর মহিলাদের উপর এই সুপরিকল্পিত পাশবিক অত্যাচারের জন্যই 'রেপ অফ বাংলাদেশ' কথাটি পশ্চিমীদের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত। "এগেইনস্ট আওয়ার উইলঃ মেন, উইমেন অ্যান্ড রেপ'-এই প্রামাণ্য বইটিতে সুসান ব্রাউনমিলার বাংলাদেশের ঘটনাগুলিকে নানজিং এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় জার্মান সৈন্যদের হাতে রুশ মহিলাদের অত্যাচারের সঙ্গে তুলনা করেছেন...।"২০০,০০০, ৩০০,০০০ অথবা সম্ভবত ৪০০,০০০ মহিলা ধর্ষিতা হয়েছিলেন। এই ধরনের মহিলাদের আশি শতাংশই ছিলেন মুসলমান, যা বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় মানুষের আনুপাতিক হিসেবের প্রতিফলন। কিন্তু হিন্দু বা ক্রিশ্চান মহিলারাও রেহাই পাননি। অসংখ্য ছোট ছোট জন বসতির উপর আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে তান্ডব চালিয়ে আবার চলে যাওয়া পাক সেনাদের এই ধরনের ধর্ষণ কান্ড চালিয়ে যাওয়া  ছিল জল ভাত..." ( পৃঃ ৮১)। একই ধরনের বর্নণা দিয়েছেন সাংবাদিক

 

অব্রে মেনেন, যেখানে পাশবিক অত্যাচারের শিকার একটি নব বিবাহিতা মেয়ে। "  সদ্য বিবাহিত দম্পতির জন্য তৈরী ঘরে   দু'জন .সৈন্য ঢুকল । অন্য সৈন্যরা দাঁড়াল বাইরে। তাদের মধ্যে এক জনের বন্দুক সঙ্গে থাকা পরিবারের অন্যান্যদের দিকে তাক করা। ভিতর থেকে ভেসে এল ধমকের সুরে একটা আদেশের মত আওয়াজ আর মেয়েটির স্বামীর প্রতিবাদ। তার পর একটু নীরবতা, এবং তার পরেই মেয়েটির আর্তনাদ। তার পর আবার চুপ চাপ, শুধু মাঝে মাঝে অস্পষ্ট কান্নার আওয়াজ, সেটাও পরে থেমে গেল। একটু পরেই সেই সৈন্যটি বাইরে বেরিয়ে এল, তার সামরিক পোষাক অবিণ্যস্ত। এক গাল হেসে সে তার সঙ্গীদের দিকে তাকাল। এর পরে অন্য একটি সৈন্য ভিতরের ঘরে ঢুকল, এবং এই ভাবেই চলতে থাকল যতক্ষন পর্যন্ত না উপস্থিত ছ' জন সৈন্যই গ্রাম্য মেয়েটিকে ধর্ষন করল। তার পর তারা চলে যেতেই মেয়েটির বাবা ঘরে ঢুকে দেখলেন তাঁর মেয়ে একটি দড়ির খাটের উপর রক্তাক্ত অবস্থায় অচেতন হয়ে পড়ে আছে, আর তার স্বামী মেঝের উপর বমি করে উবু হয়ে রয়েছে(উদ্ধৃতঃ ব্রাউনমিলার, এগেইনস্ট আওয়ার উইল, পৃঃ ৮২)।" ব্রাউনমিলার জানাচ্ছেন, বাংলাদেশে ধর্ষণের কোন বাছ বিচার ছিলনা। ", আট বছরের মেয়ে থেকে ৭৫ বছরের ঠাকুমা, সবার উপরেই যৌন নির্যাতন চলেছিল। পাকিস্তানী সৈন্যরা শুধু যে বাড়ি বাড়ি ঢুকে ধর্ষণ করেছিল তাই নয়, হাজারে হাজারে মহিলাকে জোর করে তুলে নিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল সেনা ব্যারাকে, রাতের ফুর্তির জন্য । কোন কোন মহিলার উপর একই রাতে আশি বার পর্যন্ত অত্যাচার চালানো হয়েছিল"(ব্রাউনমিলার, পৃ ঃ ৮৩)। কত জন মহিলা

 

এই পাশবিক অত্যাচারের ফলে প্রান হারিয়েছিলেন,আর কতজন সাধারন ভাবে চলতে থাকা ধ্বংসলীলা আর গণ হত্যায় মারা গিয়েছিলেন, তার একটি আন্দাজ মাত্র করা যায়। কত জন নিহত হয়েছিলেন ? পরে সব থেকে বড় গণ হত্যার এই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা রোয়ান্ডার গণ হত্যায় নিহতের (৮০,০০০) সংখ্যা থেকে অনেক বেশী তো বটেই, সম্ভবত ইন্দোনেশিয়ার থেকেও বেশী ( ১৯৬৫-৬৬ সালে ইন্দোনেশিয়ায় দশ থেকে ১৫ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল)। মাত্র ২৬৭ দিনে যে সংখ্যায় মানুষ খুন হয়েছিলেন, তা অবিশ্বাস্য। সামান্য নমুনা- বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদ পত্র অথবা তদন্ত কমিটির অসম্পূর্ন রিপোর্ট অনুসারে পাকিস্তানী সেনারা ঢাকায় ১০০,০০০, খুলনায় ১৫০,০০০, জশোরে ৭৫,০০০, কুমিল্লায় ৯৫০০০ এবং চট্টগ্রামে ১০০,০০০ মানুষকে হত্যা করেছিল। বাংলাদেশের ১৮ টি জেলা মিলিয়ে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১,২৪৭,০০০। কিন্তু এই নিহতদের এই সংখ্যার হিসেব অসম্পূর্ন, এবং আজ পর্যন্ত কেউ সঠিক ভাবে জানেনা কত লোক প্রান হারিয়েছিল। কোন কোন হিসেব অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা অনেক কম,যেমন একটি মতে ৩০০,০০০। কিন্তু অধিকাংশ হিসেব অনুসার। নিহতের সংখ্যা দশ লক্ষ থেকে তিরিশ লক্ষ্। পাকিস্তানী সেনা এবং আধা সামরিক বাহিনীর হাতে গোটা পাকিস্তানের জন সংখ্যার প্রতি ৬১ জনের মধ্যে এক জন করে খুন হয়েছিলেন, আর পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পঁচিশ জন বাঙ্গালী, হিন্দু এবং অন্যান্যদের মধ্যে এক জন করে প্রান হারিয়েছিলেন..."(রামেল, ডেথ বাই গভর্নমেন্ট, পৃ ঃ ৩৩১)। এ' ক্ষেত্রে নিহত পুরুষ এবং মহিলাদের অনুপাত  বিচার করা অসম্ভব, তবে একটা অনুমানের চেষ্টা করা যেতে পারে ঃ যদি যত মহিলা ধর্ষিতা হয়েছিলেন এবং যত মানুষ খুন হয়েছিলেন, তার সর্বোচ্চ হিসেব ধরা যায় (্যথাক্রমে ৪০০,০০০ এবং ৩,০০০,০০০ ), যদি ধরা যায় ধর্ষিতাদের সম সংখ্যক মহিলা নিহত হয়েছিলেন এবং যদি মৃত শিশুদের ক্ষেত্রে সেই সংখ্যাকে দ্বিগুণ করা যায়( ৬০০,০০০), তাহলেও দেখা যায় নিহতদের ৮০ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ (৩০ লক্ষের মধ্যে ২৪ লক্ষ)। এই ধরনের অসামঞ্জস্য বিগত 

 

পাঁচশো বছরের মধ্যে সব থেকে সাংঘাতিক লিঙ্গ ভিত্তিক হত্যালীলার দিকে নির্দেশ করে।  রবার্ট পেন লিখছেন, পূর্ব পাকিস্তানের সব অঞ্চলেই মাসের পর মাস ধরে গণ হত্যা ঘটেছিল। " সেগুলি কিছু অল্প বয়সী অফিসারের কাজ দেখানোর ছোট খাটো ঘটণা ছিলনা। যা হয়েছিল, তা ছিল উঁচু তলার অফিসারদের নেতৃত্বে সুপরিকল্পিত ভাবে ঘটানো গণ হত্যা। যারা এটা করেছিল তারা জানত তারা কি করছে। মুসলমান কৃষকদের মারার জন্য পাঠানো মুসলমান সৈন্য যান্ত্রিক এবং দক্ষ ভাবে তাদের কাজ করত। তাদের কাছে প্রতিরোধহীন মানুষদের মারা ধূম পান করা অথবা মদ খাওয়ার মত অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছিল।" (পেন, ম্যাসাকার, পৃঃ ২৯)।নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ঘটনা সব থেকে

 

সুচারু এবং কেন্দ্রীয় ভাবে ঘটানো গণ হত্যা গুলির মধ্যে একটি, এবং এর হোতা পাঁচ জন পাকিস্তানী জেনারেল--প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, জেনারেল টিক্কা খান, চিফ অফ স্টাফ জেনারেল পিরজাদা, সিকিওরিটি চিফ উমর খান এবং গোয়েন্দা বাহিনী প্রধান জেনারেল আকবর খান। পাকিস্তানে সামরিক শাসনের বহু দিনের সমর্থক আমেরিকা সরকার গণ হত্যার ঘটনা শুরু হতে প্রায় ৩৮ লক্ষ ডলারের সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করেছিল। "পরে এক জন সরকারী মুখপাত্র কংগ্রেসে জানায়, ইয়াহিয়া সরকারকে জল পথে পাঠানো সব সাহায্য বন্ধ হয়েছ।" (পেন, ম্যাসাকার, পৃ ঃ ১০২)



Picture of the day
লীগ নেতৃবৃন্দদের সাথে হাসিনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মে ৩০, ২০১৩ গণভবনে মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দদের সাথে মতবিনময় করেন।

For more Muktijudho news