Muktijudho


পাকিস্তান কি একাত্তরের গণ হত্যার জন্য ক্ষমা চাইবে ? : স্যামুয়েল বয়েদ
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মানুষের কাছে ১৬ ই ডিসেম্বর তারিখটি স্মরনীয়-যদিও ভিন্ন কারনে।যেখানে বাংলাদেশে প্রতি বছর এই দিনটি বিজয় উচ্ছ্বাসের সাথে পালন করা হয়, সেখানে পাকিস্তানের সাধারন অরাজনৈতিক মানুষ এই দিনটিতে লজ্জা, দুঃখ ও পরাজয়ের গ্লানি অনুভব করেন। উনিশশো একাত্তর সালে এই দিনেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ২৬৬ দিন ধরে চলা (২৫ শে মার্চ- ১৬ই ডিসেম্বর) গণ হত্যার অবসান ঘটিয়ে তাঁদের মুক্তির ইতিহাস রচনা করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের মাতৃভূমির নাম দেন বাংলাদেশ।পাকিস্তানের যে সব সেনা নায়ক, সরকারি আমলা এবং রাজনীতিকের নীরব কার্যকলাপ দেশ ভাগের জন্য দায়ী তাঁরাও কিন্তু মুক্ত বোধ করেছিলেন এবং সাধারন মানুষকে বোকা বানাতে খন্ডিত পাকিস্তানকে 'নিউ পাকিস্তান' অথবা নব পাকিস্তান নামে অভিহিত করেন। 

 

গণ হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী প্রজন্মের বাঙ্গালিরা এবং ১৬ ই ডিসেম্বর, ১৯৭১-এর পরবর্তী প্রজন্মও একধিক বার এই বার্তা দিয়েছে যে, তারা পাকিস্তানকে ক্ষমা করতে রাজি, যদি কৃত কর্মের জন্য সে ক্ষমা চায়। গত মাসে যখন পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রী হিনা রাব্বানি খার বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইসলামাবাদে হতে চলা আটটি মুসলিম রাষ্ট্রের ডি-৮ সামিটে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রন জানাতে এসেছিলেন, তখন তাঁর হাতে বাংলাদেশের কতকগুলি দাবির তালিকা দেওয়া হয়। এই দাবিগুলির মধ্যে ছিল ১৯৭১-এর গণ হত্যার অপরাধে যে সব পাকিস্তানি সেনা অপরাধী তাদের বিচার এবং পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা। শ্রীমতি খারের উত্তর ছিল, আমাদের উচিৎ অতীত ভুলে পারস্পরিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এর পরে শেখ হাসিনা নিজে সেই শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেননি।  পরিতর্তে তিনি যাকে বৈঠকে পাঠান, তিনি এমনকি দেশের বিদেশ মন্ত্রীও নন, প্রধান মন্ত্রীর দপ্তরের এক জন উপদেষ্টা মাত্র। বলা হয়, পাকিস্তান ক্ষমা প্রার্থনা না করার জন্যই তিনি ইসলামাবাদ যাননি। সেই ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর থেকেই বাংলাদেশ অপরাধী পাক সেনাদের বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে।
 
শ্রীমতি খারের আগে যে সব পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতারা বাংলাদেশ সফরে এসেছেন, তাঁরাও একই দাবির মুখোমুখি হয়েছেন। এঁদের মধ্যে আছেন পাকিস্তানের প্রথম প্রধান মন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো। ডিসেম্বর, ১৯৭০-এর সাধারন নির্বাচনে জিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালিরা যখন তাঁদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি করেছিলেন, সেই সময় সেনা বাহিনী বাঙ্গালিদের পাইকারি হারে খুন করতে শুরু করে। যে দিন এই গণ হত্যা শুরু হয়, সেই দিন, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ ভুট্টো ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভুট্টো মন্তব্য করেছিলেন, "ইশ্বরকে ধন্যবাদ যে পাকিস্তান রক্ষা পেল।" অন্য কথায়, তিনি পাক সেনাদের এই কাজকে সমর্থন করেছিলেন। সুতরাং পাক বাহিনীর অপরাধের জন্য কি করে আর তিনি ক্ষমা চাইতে পারতেন !
 
একই ভাবে তাঁর কন্যা বেনজির ভুট্টোও পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হওয়ার পর ঢাকা সফরে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারননি। কারন, পাক সেনাদের এই সব অপরাধের মূল ছিল তাঁর পিতা এবং পূর্বতন পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের চক্রান্তের মধ্যে। উনিশশো পয়ষট্টি সাল থেকে চলে আসা এই চক্রান্তের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার জন্য ভারতের ঘাড়ে দোষ চাপানো। 
 
প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মুশারফ, যিনি বালুচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর সেখানকার মানুষের অধিকারের দাবি জানানো বালুচ নেতা নওয়াব আকর বুগতিকে হত্যা করার জন্য সেনা বাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, তাঁর কাছ থেকেও বাংলাদেশের মানুষ ক্ষমা প্রার্থনা আশা করেননি। যে ভাবে তিনি বালুচিস্তানের মানুষদের দমন করেছিলেন, তাতে বলা যেতেই পারে যে, ১৯৭১ সালে যদি তিনি পাক সেনা প্রধান থাকতেন, তাহলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে গণ হত্যা চালানোর জন্যেও সৈন্যদের অভিনন্দন জানাতেন। 
 
পাকিস্তান বুঝে উঠতে পারেনা তাদের সৈন্যরা এক সময়ে যে নরমেধের খেলায় মেতে উঠেছিল, বাংলাদেশীরা এখনো কেন সেই ঘটনা মনে করে রেখেছে। লাখে লাখে বাঙ্গালি পুরুষ, মহিলা, শিশুদের হত্যা করা হয়েছিল, লাখে লাখে অল্প বয়সী মেয়ে এবং মহিলাদের ধর্ষন করে খুন করা হয়েছিল। আর এই বিপুল নর হত্যালীলার বিশেষ লক্ষ্য ছিলেন চিন্তাবিদ, বিদ্দজ্জন এবং রাজনীতিকরা। লেঃ জেনারেল এ এ কে নিয়াজি, যিনি ঢাকার পতনের সময় মিলিটারি গভর্নর ছিলেন, তাঁর আত্ম জীবনীতে লিখেছেন যে, সামরিক কর্তৃপক্ষের নীতিই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালিদের যাতে কোন নেতা না থাকে। আর এই দানবিক পরিকল্পনা রূপায়িত করতে হত্যা করা হল লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালিকে। উপর থেকে দেখলে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনার দাবি খুব সাধারন ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের দৃষ্টিকোন থেকে এর অনেক অস্বস্তিকর দিক আছে। প্রথমত, পাকিস্তান সৈন্য বাহিনী অথবা পাকিস্তান সরকার তাদের দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য ক্ষমা চাইবেনা। গত পঁয়ষট্টি বছরে এরা বালুচিস্তানে ছ'বার আকাশ থেকে বোমা ফেলেছে, যেমনটা করা হয় অন্য রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধের সময়, তাদের মাটিতে। অথচ যদি এক বারও সৈন্য বাহিনী অথবা সরকার বালুচিস্তানের মানুষের কাছে ক্ষমা চাইত, তবে সেই বিদ্রোহ-জর্জর প্রদেশের পরিস্থিতি হয়তো অন্য রকম হতে পারত। 
 
এ ছাড়াও ওয়াশিংটনের পিঠ চাপড়ানি পাওয়ার জন্য গত ন' বছরের মধ্যে পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনী হাজার হাজার নিরীহ উপজাতীয় মানুষকে সন্ত্রাসবাদী দমনের নামে মেরেছে। ঠিক কত জন অসামরিক ব্যক্তি মারা গেল, সে খবর যাতে বাইরে না যায়, সেই উদ্দেশ্য ঐ সব জায়গা থেকে সংবাদ মাধ্যমকে দূরে রাখা হয়েছে। কোন ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়নি। 
 
ক্ষমা প্রর্থনার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রশ্ন উঠে আসে ঃ পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কে ক্ষমা চাইবে ? যে সামরিক অভিযান করা হয়েছিল তা পুরোপুরি ভাবেই সামরিক সিদ্ধান্ত। পাকিস্তানে ঐ সময়ে কোন অসামরিক সরকার ছিলনা।  অবশ্য কোন অসামরিক সরকারও সেনা বাহিনীর সম্পূর্ন সন্মতি ছাড়া বাংলাদেশের দাবি মেনে ক্ষমা চাইতে পারবেনা। আর সামরিক কর্তারা সেই সন্মতি দেবেননা, কারন তা দিতে গেলে ঢাকায় আত্ম সমর্পনের পর সেটা পাকিস্তান সেনা বাহিনীর কাছে আরও একটি অগৌরবের কারন হবে। ক্ষমা চাওয়ার অর্থই হবে এটা স্বীকার করা যে, পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান করা উচিৎ হয়নি এবং সৈন্যরা যুদ্ধাপরাধ করেছিল। 
 
এ ছাড়াও প্রশ্ন আছে ঃ ক্ষমা প্রার্থনার পরে কি হবে ? তা' হলে পাকিস্তানকে অবিভক্ত পাকিস্তানের সম্পদ বাংলাদেশের সাথে ভাগ করতে হবে, যেটা বাংলাদেশ পাকিস্তানকে প্রায়ই মনে করিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, কোন ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়াই অপরাধী সেনাদের বিচারের কথা হাস্যকর। সেনা বাহিনী এবং তাদের সহযোগী ইসলামি দলগুলি, বিশেষত জামাত-এ-ইসলামি, যারা ১৯৭১-এর বাঙ্গালি গণ হত্যায় সক্রিয় ভাবে সহযোগিতা করেছিল, তারা সেনা বাহিনী দেশের অখন্ডতা রক্ষায় তাদের কর্তব্য করেছিল, এই অজুহাতে বিচারের দাবির বিরোধিতা করবে। কিন্তু সত্যিই কি পাক সেনারা দেশের অখন্ডতা রক্ষার ব্যাপারে চিন্তিত ছিল ? পরবর্তী উদাহরনগুলির থেকে এর উত্তর পাওয়া যেতে পারে ঃ (১) পাকিস্তানের প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধান রাও রশিদ খানের প্রশ্ন এবং উত্তরের ভিত্তিতে  'জো ম্যায়নে দেখা' (আমি যা দেখেছি) বইটিতে বলা হয়েছে,যখন সেনারা প্রায় হারতে বসেছে আর ঢাকা পতনের মুখে, জেনারেল আকিম আখতার রানি, যিনি  সামরিক কর্তাদের জন্য মহিলা এবং অভিনেত্রী সরবরাহের জন্য খ্যাত ছিলেন, সুইমিং পুলে রাত দু'টো থেকে তিনটে অবধি জলকেলিতে ব্যস্ত থাকতেন। উপলক্ষ্য ছিল জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নতুন বাড়ির উদ্বোধন।অতিথিদের মধ্যে ছিলেন 'সি আই এ'র এজেণ্ট' হিসেবে পরিচিত বিকিনি পরিহিতা এক জর্মান সুন্দরী। মত্ত জেনারেলরা তাঁকে বার বার জলে ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন, আর যত বার তা হচ্ছিল ততবার হাসির হর্‌রা উঠছিল। রাও রশিদ বলছেন, পূর্ব পাকিস্তানে কি হতে চলেছে, সেই বিষয়ে জেনারেলদের কোন মাথা ব্যথা ছিলনা। 
 
লেঃ জেনারেল এ এ কে নিয়াজির ভূমিকাও এর থেকে বেশী কিছু ছিলনা। অধুনা লুপ্ত করাচির বামপন্থী ঊর্দু সাপ্তাহিক 'আল ফাতাহ্‌' লিখেছিল নিয়াজি ঢাকায় গভর্নরের বাস ভবনকে হারেমে পরিনত করেছিলেন।  সেখানে নিঃসহায়, বাঙ্গালি মেয়েদের বিবস্ত্র অবস্থায় রাখা হত। সাপ্তাহিকটিতে লেখা হয়েছে, জেনারেল নিয়াজি সৈন্যদের সামনে তার ভাষণে শেষ অবধি লড়াই করার জন্য উৎসাহ দিতেন, আর গভর্নর হাউজে ফিরে এসে ক্ষুধার্ত বাঘের মত ঐ সব ভয়ে কাঁপা মেয়েদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন। 
 
 
জেনারেল নিয়াজি সম্পর্কে যা বলা হয়েছিল তার সমর্থনে তাঁর আত্ম জীবনীতে আরো অনেক কিছু পাওয়া যায়। সামরিক কর্তারা চেয়েছিলেন বাঙ্গালি শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিকদে হত্যা করে পূর্ব পাকিস্তানকে শেষ করে দিতে। এই পরিকল্পনা আসলে ছিলে আয়ুব খানের। পাঠান নেতা খান আবদুল ওয়ালি খান ১৯৮৪ সালে উর্দূ সাপ্তাহিক 'চাতান'-কে জানিয়েছিলেন আয়ুব খান রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে তাঁর পরিকল্পনার সমর্থন চাওয়া শুরু করেছিলেন। 
 
 যদি ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষা করাই পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল, তবে হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করতে সামরিক কর্তাদের এত অনীহা কেন ? ঢাকার পতনের ব্যাপারে এই কমিশন তদন্ত করেছিল। 
 
ভবিষ্যতে আদৌ ্যদি পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইবার সাহস অর্জন করে, তা হলে সেই ক্ষমা প্রার্থনা কীভাবে করা হবে, সেটা কৌতুহলের বিষয়। কী ভাবে পাকিস্তান হত্যা এবং ধর্ষনের জন্য ক্ষমা চাইবে ? তাই বাংলাদেশী জন সাধারনকে হয়ত অনির্দিষ্ট কাল অথবা চিরকালের জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। একই রকম ভাবে পাকিস্তান সরকার যে কখনো অপরাধী সৈন্যদের বিচার করবে, সেই আশা করা চাঁদ পেড়ে আনতে বলারই সমান। 
 


Picture of the day
লীগ নেতৃবৃন্দদের সাথে হাসিনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মে ৩০, ২০১৩ গণভবনে মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দদের সাথে মতবিনময় করেন।

For more Muktijudho news