Column



স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে এখনও বাংলাদেশকে স্বীকার করেনি পাকিস্তান
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে এখনও বাংলাদেশকে স্বীকার করেনি পাকিস্তান
ভাবলে অবাক হতে হয়, ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান হাই কমিশন কী ভাবে কুটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে জিয়া উর রহমান ( বি এন পি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াত স্বামী) -কে নিয়ে তৈরি একটি ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করতে পারে। এই ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন জিয়া উর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান ( বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা) নন।

 এই ভিডিওতে আরও দাবি করা হয়েছে যে, শেখ মুজিবুর রহমান নাকি স্বাধীনতা নয়, শুধুমাত্র স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ ১৬ই অগাস্ট তারিখে ৪৭তম স্বাধীনতা দিবস পালন করার ছ' সপ্তাহ আগে এই ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছে। খুব সম্ভবত এই ভিডিওটির উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ সৃষ্টির ব্যাপার নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে মানুষকে বিভাজিত করা। এই ঘটনার পরে বাংলাদেশের বিদেশ সচিব কামরুল আহসান পাকিস্তানের হাই কমিশনারকে ডেকে পাকিস্তানের তরফ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার দাবী করেন। আহসানের বক্তব্য অনুসারে,  এই কাজ "অভিসন্ধিমূলক নয়" এবং পরিস্থিতি বুঝে করা হয়নি  বলে পাকিস্তানি কূটনীতিক ক্ষমা চেয়েছেন।

 

 

উনিশশো একাত্তর সালের ১৬ই ডিসেম্বরে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিক থেকে একটু একটু করে পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ, যা পারেনি পাকিস্তান। আর সেই নতুন রাষ্ট্রের পারঙ্গমতায় হতাশাগ্রস্ত, ঈর্ষাণ্বিত হয়েছে পাকিস্তান। জেনারেল আইয়ুব খানের আত্মজীবনী "ফ্রেন্ডস, নট মাস্টার্স" বইতে বর্নিত "খর্বাকৃতি এবং কৃষনবর্ন" বাঙালিরা অবিভক্ত পাকিস্তানে কখনও নাগরিক হিসেবে সমমর্যাদা পায়নি। পূর্ববাংলার বাঙালিদের ততদিনই সহ্য করা হয়েছে, যতদিন তাদের পাট বিদেশে রপ্তানি হয়ে পাকিস্তানের সরকারি কোষাগারে সবথেকে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে এসেছে।
এই কাজকে  দুরভিসন্ধিমূলক বলে বর্ননা করে আহসান বলেছেন, "ইতিহাস ইতিহাসই থাকবে। মিথ্যা প্রচার করে কেউ এর অন্যথা করতে পারেনা।" তিনি বলেছেন এই ধরণের কাজ  সত্য এবং ন্যায়ের পথে থাকতে চাওয়া পরবর্তী প্রজন্মের ঐতিহাসিক, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষদের অপকার করবে।
এই কাজের অর্থ পাকিস্তান  বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসকে বিকৃত করে অপপ্রচার চালাতে চায়।

 

উনিশশো একাত্তর সালের ১৬ই ডিসেম্বরে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর  রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিক থেকে একটু একটু করে  পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ, যা পারেনি পাকিস্তান। আর সেই নতুন রাষ্ট্রের পারঙ্গমতায় হতাশাগ্রস্ত, ঈর্ষাণ্বিত হয়েছে পাকিস্তান। জেনারেল আইয়ুব খানের আত্মজীবনী "ফ্রেন্ডস, নট মাস্টার্স" বইতে বর্নিত  "খর্বাকৃতি এবং কৃষনবর্ন" বাঙালিরা অবিভক্ত পাকিস্তানে কখনও নাগরিক হিসেবে সমমর্যাদা পায়নি। পূর্ববাংলার বাঙালিদের  ততদিনই সহ্য করা হয়েছে, যতদিন  তাদের পাট বিদেশে রপ্তানি হয়ে পাকিস্তানের সরকারি কোষাগারে সবথেকে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে এসেছে। 

যদি ১৯৭২-৭৩ সালে প্রকাশিত পাকিস্তানের খবরের কাগজগুলি পড়া যায়, তাহলে দেখা যাবে সেগুলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সম্পাদকীয় লেখক, কলাম লেখক, ভবিষ্যদ্বক্তা, জ্যোতিষী এমন কি হস্তরেখাবিদদের এই মন্তব্যে ভর্তি যে, বাংলাদেশ মাত্র এক কি দু'বছর টিকে থাকবে। একটি অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে, ভারত বাংলাদেশ দখল করে নেবে। এ দিকে অবিভক্ত পাকিস্তানের সম্পদের ভাগ বাংলাদেশকে পাকিস্তান দিতে অস্বীকার করায় নবগঠিত রাষ্ট্রের প্রাথমিক পথ চলা আরও কঠিন হয়ে গিয়েছিল।

 

বাজারে কৃত্রিম পাট আসার পর যখন থেকে এই আয় কমতে শুরু করেছে, তখনই বিকল্প রপ্তানি হিসেবে সিন্ধ এবং দক্ষিণ পাঞ্জাবে তুলোর চাষের উপর মনোনিবেশ করে  পাকিস্তান এবং  বাঙালিদের বোঝা হিসেবে মনে করতে থাকে। এই বাঙালি-বোঝা ঝেড়ে ফেলতে ষাটের দশকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সংগে আলোচনা শুরু করেন জেনারেল আইয়ুব খান। কিন্তু এই পরিকল্পনা ফাঁস করে দেন পাঠান নেতা খান আবদুল ওয়ালি খান। লাহোর থেকে প্রকাশিত উর্দু সাপ্তাহিক 'চট্টান' -এ খান আবদুল ওয়ালি খান লেখেন যে, এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন তিনি।  আইয়ুব যে আলোচনা এ বিষয়ে শুরু করেছিলেন, তা সেনাবাহিনীর উপর মহলের পূর্ব সম্মতি ছাড়া নিশ্চয়ই করা হয়নি।

 

এই লেখকের অভিমত এই যে, তিনটি উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তান একাত্তরের যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল ঃ (১) বাঙালিদের থেকে মুক্ত হতে (২) তাদের এতটাই পঙ্গু করে দিতে যাতে তারা নিজেরা দেশ চালাতে না পারে এবং (৩) পাকিস্তান ভাঙার জন্য ভারতকে দায়ী করে ভারত-বিদ্বেষকে স্থায়ী করতে। ঢাকায় পাকিস্তানের শেষ মিলিটারি কমান্ডার লেঃ জেনারেল এ এ কে নিয়াজি এই যুদ্ধের ব্যাপারে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ভারতে যুদ্ধবন্দী শিবির থেকে রাওয়ালপিন্ডিতে ফেরার পর তিনি শুনে মর্মাহত হলেন যে,  যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং নেতাদের হত্যা করে জাতিটার সর্বনাশ করে দেওয়া, যাতে দেশ চালানোর মত ক্ষমতা তাদের না থাকে।

 

যদি ১৯৭২-৭৩ সালে প্রকাশিত পাকিস্তানের খবরের কাগজগুলি পড়া যায়, তাহলে দেখা যাবে সেগুলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সম্পাদকীয় লেখক, কলাম লেখক, ভবিষ্যদ্বক্তা, জ্যোতিষী এমন কি হস্তরেখাবিদদের এই মন্তব্যে ভর্তি যে, বাংলাদেশ মাত্র এক কি দু'বছর টিকে থাকবে। একটি অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে, ভারত বাংলাদেশ দখল করে নেবে। এ দিকে অবিভক্ত পাকিস্তানের সম্পদের ভাগ বাংলাদেশকে পাকিস্তান দিতে অস্বীকার করায় নবগঠিত রাষ্ট্রের প্রাথমিক পথ চলা আরও কঠিন হয়ে গিয়েছিল।

 

কিন্তু পাকিস্তানের যাবতীয় ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণ করে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ আরও স্থিতিশীল রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে। সামাজিক সূচকের দিক দিয়ে  বাংলাদেশ পাকিস্তানের থেকে উন্নত জায়গায়। পাকিস্তান   যেখানে ইসলামি জঙ্গিপনা এবং রাষ্ট্র- লালিত সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত, বাংলাদেশ সেখানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞভাবে ইসলামি জঙ্গিবাদকে দমন করে। যেখানে পাকিস্তান সব সময়ই তার প্রতিবেশীর সঙ্গে একটা যুদ্ধের আবহের মধ্যে থাকে, সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে আর সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌহার্দ্যের সম্পর্ক। বর্তমানে মায়ানমারের সংগে যেটুকু সামান্য বিতর্ক চলছে, তা রোহিংগিয়া সমস্যা নিয়ে। প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে পাকিস্তান কোনোদিনই সুসম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেনা, কারণ তাদের বাঁকাচোরা চিন্তাধারা - ইরানের সংগে সম্প্রদায়গতভাবে, ভারতের সংগে ধর্মীয় দিক দিয়ে এবং আফগানিস্তানের সংগে নিরাপত্তা বিষয়ক দৃষ্টিকোণ থেকে।
 

এখনও পর্যন্ত পাকিস্তান এমন কিছু করেনি, যাতে মনে হতে পারে যে তারা বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে অবিভক্ত পাকিস্তানের সম্পদের ভাগ দেয়নি এরা। এরা একাত্তর সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যার জন্য ক্ষমাও  চায়নি , উপরন্তু বাংলাদেশে যে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়ে ফাঁসি অথবা জেল হয়েছে, তাদের স্বপক্ষে কথা বলেছে।  ঢাকা এই ব্যাপারটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে পাকিস্তানের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।  ২০১৬ সালের ১৪ই অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা ভারতের একটি সংবাদপত্রকে বলেছিলেন এই ব্যাপারটি এবং সন্ত্রাসবাদের কারণেই তাঁর সরকার ইসলামাবাদে হতে চলা সার্ক শীর্ষ বৈঠক থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, "পাকিস্তানের ব্যবহারের কারণে তাদের সংগে সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য আমার উপর চাপ ছিল। কিন্তু   আমি বলেছি, সম্পর্ক থাকবে এবং সমস্যাগুলি আমাদের মিটিয়ে নিতে হবে। বাস্তব হল, পাকিস্তানের সংগে লড়াই করে আমরা আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি এবং তারা পরাজিত পক্ষ।"

 

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কগত দিক দিয়ে পাকিস্তান এই পরাভূত শক্তির জটিল মানসিকতায় চালিত। এর থেকেই ফেসবুকে পাকিস্তান হাইকমিশনের ভিডিওটির উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। অতএব, এটি উদ্দেশ্যমূলক নয় বলে পাকিস্তান হাইকমিশনের যে ব্যাখ্যা, তা অচল। বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে বিতর্কের আগুন জ্বালানোর দুষ্কর্ম ঘটানোই   এর লক্ষ্য ছিল বলে মনে হয়।  




Video of the day
Morning Live Bangladesh TV News BD 16 December 2017 Bangla News 24 TV Online Bangla TV News
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics