Column
১৪ই ডিসেম্বর

22 Dec 2017

#

বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ই ডিসেম্বর দিনটি 'শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস' হিসেবে পালিত হয়।

শ্রদ্ধা জানানো হয়  বুদ্ধিজীবী এবং বিভিন্ন পেশার কৃতী সেই সব মানুষদের, ১৯৭১ সালের এই দিনে যাদের গণ হারে হত্যা করেছিল দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীরা, বিশেষত জামাত।  এই বছরে এই দিনটি স্মরণের একটু ভিন্ন তাৎপর্যও আছে, কারণ ইতিমধ্যে বিচারে দোষী প্রমাণিত হয়ে  ছ'জন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হয়ে গেছে। এরা হলঃ মতিউর রহমান নিজামি, আলি আহসান মহম্মদ মোজাহিদ, আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামরুজ্জামান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং মির কাশেম আলি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণ, নির্যাতন এবং গণহত্যা করার জন্য এরা দোষী সাব্যস্ত হয় এবং যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে এদের প্রাণদণ্ডের আদেশ কার্যকর করা হয়। 

 

সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা প্রথম থেকেই পাকিস্তানি শাসককের টার্গেট ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হতে দখলদারি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে তাঁদের হত্যা করতে শুরু করে। যুদ্ধের শেষের দিকে, যখন বাংলাদেশের জয় আসন্ন, সেই সময়, ১৪ই ডিসেম্বর তারিখে, হাজার হাজার বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং পেশাদার মানুষদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে, চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় নির্যাতন কেন্দ্রগুলিতে, যেখানে অবশেষে নাগাড়ে গুলি চালিয়ে পাইকারি হারে হত্যা করা হয় তাঁদের। এইসব নিহত মানুষদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক, চিকিৎসক, স্থপতিবিদ, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, শিক্ষক এবং অন্যান্য বিশিষ্ট জনেরা।
পাকিস্তান-প্রচারিত তথাকথিত দ্বিজাতি তত্ত্বকে না মানা এবং সংগ্রামের সময় মানুষকে 'প্ররোচিত' করার জন্য নিয়মিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল সাবেক পূর্ব পাকিস্তান অথবা পরবর্তীকালের বাংলাদেশের অগণিত বুদ্ধিজীবীকে। এই কাজে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেছিল রাজাকার, আল বদর এবং আল শামসের মত চরম দক্ষিনপন্থী সংগঠনগুলি। এগুলি সৃষ্টি করেছিল জামাত এবং তার ছাত্র শাখা, সেই সময় যার নাম ছিল ইসলামি ছাত্র সংঘ।

 

বস্তুতপক্ষে, ন'মাসব্যাপী স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোটা সময় ধরেই চলেছিল বুদ্ধিজীবী নিধন। তবে সব থেকে বেশি সংখ্যায় হত্যা করা হয়েছিল একাত্তর সালের ১৪ই ডিসেম্বরে।

 

যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের যে বিচার বাংলাদেশে বর্তমানে চলছে, তার মূল অভিমুখ ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বরের ভয়াবহতার প্রতি। একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বরে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পনের মাত্র দু'দিন আগে বুদ্ধিজীবীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরিকল্পনা করার দায়ে জামাতের শীর্ষ নেতৃত্বের বেশিরভাগই এখন অভিযুক্ত।

 

পরবর্তীকালে জামাতের প্রধান পদাধিকারী মতিউর রহমান নিজামি সেই সময় দলের ছাত্র শাখা ইসলাম ছাত্র সংঘের প্রেসিডেন্ট ছিল। আলি আহসান মুহাম্মদ মোজাহেদ, জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল, ছিল ইস্ট পাকিস্তান ইসলামি ছাত্র সংঘের প্রধান। এরা এবং এদের  রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর অনুচরেরা স্বাধীনতা সংগ্রামকে গুঁড়িয়ে দিতে বহু ভয়ংকরতম অপরাধ করেছিল সেই সময়। এদের উদ্দেশ্য ছিল তখনও জন্ম না নেওয়া বাংলাদেশকে বুদ্ধিজীবীশুণ্য করে এমনভাবে পঙ্গু করে দেওয়া, যাতে বাঙালিদের নিজের রাষ্ট্র হলেও সেখানে যাতে নেতৃত্ব দেওয়ার মত কেউ না থাকে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সংঘটিত গণহত্যা-কাহিনীর সবথেকে কলঙ্কজনক অধ্যায় বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ড। এই বীভৎস হত্যালীলার মূল কারিগর ছিলেন এক উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার, জেনারেল রাও ফরমান আলি। ঐ সময় তিনি ছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা। স্বাধীনতার পর গভর্নরের বাসভবন থেকে জেনারেল রাও ফরমান আলির একটি ডায়েরি পাওয়া যায়, যাতে ১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে নিহত বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা ছিল। এর থেকেই স্পষ্ট হয়, বুদ্ধিজীবী নিধনের নীল নকশা প্রস্তুত করেছিলেন এই ব্যক্তিই।

 

ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালে নিজামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলির মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ন হল ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর তারিখে দেশের বুদ্ধিজীবী এবং বিশিষ্ট পেশাদারদের পরিকল্পিতভাবে গণ হারে হত্যা করায় তার ভূমিকা। নিজামি নিজেই স্বীকার করেছে যে, পাকিস্তান ভেঙ্গে যাতে বাংলাদেশ না হয়, তার জন্য সে দেশজুড়ে প্রচার করেছিল, যদিও তার দাবি, কোনও হত্যায় জড়িত ছিলনা সে।

 

আলি আহসান মহম্মদ মোজাহিদ ছিল কুখ্যাত আল বদরের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। এই আল বদর ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়ক শক্তি। একাত্তরে বাংলাদেশের  স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গণহত্যার সমন্বয়কারী ছিল যে ব্যক্তি, সে এই মোজাহিদ। এ-ই ছিল জামাতের খুনে বাহিনী আল বদরের  মূল ব্যক্তি। তার বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, প্ররোচনায় অংশ নেওয়া এবং অত্যাচারের শরিক হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

 

উনিশশো বাহাত্তর সালের ৯ই জানুয়ারি দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় জামাত নেতা আশফারুজ্জামান খানকে জঙ্গি আল বদর বাহিনীর কমান্ডার এবং বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারী হিসেবে বর্ননা করা হয়েছিল। সে ছিল জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র সঙ্ঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। বাংলাদেশ হওয়ার পর এই ব্যক্তি পাকিস্তানে পালিয়ে যায় এবং কিছুদিন সেখানে রেডিও পাকিস্তানের হয়ে কাজ করে।   স্বাধীনতার পর আশফারুজ্জামানের বাড়ি থেকে তার ব্যক্তিগত ডায়েরি উদ্ধার হয়। সেখানে দুপাতা জুড়ে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  বেশ কিছু শিক্ষক এবং মেডিক্যাল অফিসারদের নাম ও ঠিকানা,  যাঁরা একাত্তরে এই জামাত নেতার হাতে খুন হন। আমেরিকায় পালিয়ে থাকা আশফারুজ্জামানের অনুপস্থিতিতেই তার বিচার হয় এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে   প্রাণদণ্ড দেওয়া হয় তাকে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ব্যক্তি নিউ ইয়র্ক শহরে বসবাস করছে। বর্তমানে সে ইসলামিক সার্কল অফ নর্থ আমেরিকার (আই সি এন ) প্রধান।

 

যে একাত্তরে ঢাকায় বুদ্ধিজীবী নিধনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা নেওয়া আর একজন আল বদর কমান্ডারের নাম চৌধুরী  মুইন উদ্দিন । সে এখন ইস্ট লন্ডন মস্ক-এর ভাইস চেয়ারম্যান এবং ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা, 'মুসলিম এইড'-এর প্রধান। এই সংস্থার বার্ষিক বাজেটের পরিমাণ কুড়ি মিলিয়ন পাউন্ড। ঢাকার দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার একদা সাংবাদিক মুইন উদ্দিন স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় একজন জামাত কর্মীও ছিল। জন্ম নিতে চলা বাংলাদেশকে বুদ্ধিজীবীশুণ্য করে সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ধ্বংস করে দিতে সে বহু বিশিষ্ট নাগরিককে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করেছিল। একেও তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের জন্য।

 

সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা প্রথম থেকেই পাকিস্তানি শাসককের টার্গেট ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হতে দখলদারি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে তাঁদের হত্যা করতে শুরু করে।  যুদ্ধের শেষের দিকে, যখন বাংলাদেশের জয় আসন্ন, সেই সময়, ১৪ই ডিসেম্বর তারিখে, হাজার হাজার বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং পেশাদার মানুষদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে, চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় নির্যাতন কেন্দ্রগুলিতে, যেখানে অবশেষে নাগাড়ে গুলি চালিয়ে পাইকারি হারে হত্যা করা হয় তাঁদের। এইসব নিহত মানুষদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক, চিকিৎসক, স্থপতিবিদ, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, শিক্ষক এবং অন্যান্য বিশিষ্ট জনেরা।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সংঘটিত গণহত্যা-কাহিনীর সবথেকে কলঙ্কজনক অধ্যায় বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ড। এই বীভৎস হত্যালীলার মূল কারিগর ছিলেন এক উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার, জেনারেল রাও ফরমান আলি। ঐ সময় তিনি ছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা। স্বাধীনতার পর গভর্নরের বাসভবন থেকে জেনারেল রাও ফরমান আলির একটি ডায়েরি পাওয়া যায়, যাতে ১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে নিহত বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা ছিল। এর থেকেই  স্পষ্ট হয়, বুদ্ধিজীবী নিধনের নীল নকশা প্রস্তুত করেছিলেন এই ব্যক্তিই।
 




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics