Column
ভারত-বাংলা জলসম্পদঃ চাই বাস্তববোধ আর সদিচ্ছা

03 Sep 2013

#

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের দিকে তাকালে আপাতভাবে বলা যেতে পারে যে, দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক এই মূহুর্তে স্থিতিশীল নয়। তিস্তা জল-বন্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারেনি, স্থল সীমান্তের ব্যাপারে বোঝাপড়ার ব্যাপারটি এখনও ভারতীয় সংসদের অনুমোদন পায়নি, দু'দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ-বাণিজ্যের প্রস্তাবটিও বাস্তবায়িত হতে পারেনি, আর সীমান্ত দিয়ে গরু পাচারের সমস্যা তো রয়েই গেছে। এগুলি সবই বাস্তব। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই অন্য একটি বাস্তবও দেখতে পাওয়া যায়।

 উদাহরন হিসেবে তিস্তা জল চুক্তির বিষয়টির উল্লেখ করা যেতে পারে। এই ব্যাপারে বাংলাদেশ, ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মধ্যে যতটা অবস্থানগত বিরোধ আছে বলে বলা হচ্ছে, তা কিন্ত অতিরঞ্জিত।রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরকে সরিয়ে বৈজ্ঞানিক সত্যের দিকে তাকালে খুব সহজেই এই চুক্তি সম্ভব।

 
ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদীর সংখ্যা ৫৪ এবং তাদের বার্ষিক জলরাশির পরিমাপ ১২০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার(বি সি এম), যেখানে তিস্তার ক্ষেত্রে এই পরিমাপ মাত্র ৬০ বি সি এম। সিকিমে উৎপত্তি হওয়া এই নদী পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে। এটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য যে, যে কোনও নদীকে তার স্বাভাবিক গতিপথ (এনভারোনমেন্টাল ফ্লো) ধরে চলতে দেওয়া একান্তভাবে দরকার, কারণ তাহলে নদীও বাঁচে আর ভূগর্ভস্থ জলবাহী নুড়ির স্তরও সমৃদ্ধ হয়। 
 
নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি যথাসম্ভ বজায় রাখতে না পারলে তার মৃত্যু তো ঘটেই, জীব-শৃংখলাও নষ্ট হয়।তিস্তার ক্ষেত্রে তার \'এনভারোনমেন্টাল ফ্লো\'তার জলরাশি প্রবাহের ২০ শতাংশ, অর্থাৎ ১২ বি সি এম, যা ব্রহ্মপুত্রে মেশা পর্যন্ত বজায় রাখতেই হবে। তাহলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার জন্য থাকে মাত্র ৪৮ বি সি এম জল। সেই ভাগাভাগি কিরকম হবে, তা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার বিষয়। 
 
তবে একথা বলা যায় যে, বাংলাদেশকে তিস্তার জলের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ভাগ দিতে ভারতের সম্মত হওয়া দরকার, আর বাংলাদেশও অর্ধেকের বেশি ভাগ আশা করতে পারেনা। তাহলে দেখা যাচ্ছে, দর কষাকষির জন্য পড়ে থাকছে মাত্র দশ বি সি এম জল। কিন্তু তিস্তার জল নিয়ে বাগবিতন্ডার বহর দেখে মনে হয় যেন মতবিরোধের ক্ষেত্রটি বিশাল।
 
বাস্তব বলছে দুই দেশের মোট যৌথ জলসম্পদের মাত্র এক শতাংশের ভাগাভাগি নিয়েই যত সমস্যা, রাজনৈতিক অনুমোদন পেলে যার সুষ্ঠু ও বৈজ্ঞানিক সমাধান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সহজেই করতে পারবেন।
 
তবে এর থেকেও বড় সমস্যা অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত শুখা মরসুমে কতটা জল মিলতে পারে, তা নিয়ে। এই সমস্যার একই রকম শিকার পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের এবং বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের জেলাগুলির মানুষরা।
 
 জল সংরক্ষণের জন্য যৌথ প্রয়াসে তৈরি করা  বিশদ পরিকল্পনা, বৃষ্টির জল ছোট ছোট জলাধারে ধরে রেখে সেই জলে চাষের কাজ করা, সেচের ব্যাপারে নতুন পদ্ধতি চালু করা এবং ফসলের ধরণ ও কারিগরির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।যা এই দুই দেশের পক্ষে সম্ভব হচ্ছেনা, তা হল এই ধরণের একটি পরিকল্পনা নিয়ে একসাথে কাজ করা। কিন্তু এই যৌথ উদ্যোগই এই মূহুর্তে সবথেকে বেশি জরুরী।জল সংরক্ষণ এবং জলপ্রবাহ বাড়িয়ে তোলার জন্য যৌথ কর্মসূচি নিলে তা জলসম্পদ ব্যবহারে দু দেশের মধ্যে  বৃহত্তর সহযোগিতার দরজা খুলে দেবে।গঙ্গার জল বন্টনের ব্যাপারে  দুদেশের মধ্যে আলোচনা শেষ হতে লেগেছে ২০ বছর, আর তিস্তা নিয়ে কথা চলছে ১৮ বছর ধরে। যদি ভারত ও বাংলাদেশ এই গতিতে আলোচনা চালায়, তবে বাকি ৫২ টি নদীর ব্যাপারে আলোচনা শেষ হতে লেগে যাবে ৯০০ বছরেরও বেশি।
 
বর্তমানে যৌথ নদী কমিশন নামে যেটি পরিচিত, সেটি আদপেই যৌথ নয় এবং কোনও কমিশনও নয়। বাস্তবে এর জায়গা নিয়েছে দু\'দেশের মন্ত্রী-আমলা নিয়ে পৃথক দু\'টি সমান্তরাল কমিটি। এই অবস্থায় অতি প্রয়োজন, ১৯৭২ সালে করা চুক্তির সময়কার মনোভাব ফিরিয়ে এনে একজন চেয়ারম্যানের অধীনে এবং দু\'দেশের থেকে প্রতিনিধি নিয়ে যৌথ নদী কমিশনটি পুনর্গঠিত করা। 
 
অবশ্যই এই ধরণের কমিশনের উদ্দেশ্য হবে জলসম্পদ অধিকার রক্ষার প্রতিযোগিতা নয়, তা ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা। এছাড়াও নদীগুলির অববাহিকার মানুষজন কেউই যাতে জল থেকে বঞ্চিত না হন, সেই লক্ষ্যে দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এই কমিশনকে। 
 
এই ধরণের ব্যবস্থায় সবথেকে বেশি লাভবান কিন্তু হবে পশ্চিমবঙ্গই। জলসম্পদের ব্যাপারে একটি সর্বাঙ্গীন চুক্তি শুধু সুষ্ঠু ভাগ-বাঁটোয়ারাই করে দেবেনা, জলসম্পদ বাড়িয়ে তোলা এবং সংরক্ষণের ব্যাপারগুলি দেখবে এবং শুখা মরসুমে পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের সাহায্য করবে। দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের দরিদ্র অঞ্চলগুলিতে চাষের জল অপেক্ষাকৃতভাবে সহজলভ্য হলে সেখানে জীবন যাত্রার মান উন্নত হবে, এবং তার ফলে সেখান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে অনুপ্রবেশও কমে যাবে। 
 
রাজনৈতিক লাভের দিক থেকে দেখতে গেলে মনে রাখতে হবে, বর্তমান ইউ পি এ সরকার কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের জেলাগুলির আর্থ-রাজনৈতিক প্রয়োজনগুলি বিবেচনা করার ব্যাপারে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। ভবিষ্যতে অন্য কোনও সরকার ক্ষমতায় না এলে এমনটা নাও হতে পারে। যদি সেই সরকার তখন মনে করে জলবন্টনের ব্যাপারে অবৈজ্ঞানিক এবং আবেগপ্রসূত আপত্তিকে আমল দেওয়া মানে দেশ হিসেবে ভারতবর্ষের বিদেশ নীতি এবং জাতীয় সুরক্ষা ও  ্যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যের সঙ্গে আপোষ করা, তবে তারা বিশেষ কিছু সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিতে যেতেই পারে।আগেকার কয়েকটি কেন্দ্রীয় সরকার সিন্ধু ও গঙ্গা চুক্তি ছাড়াও বেশ কয়েকটি বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে  বিভিন্ন রাজ্য সরকারের আপত্তি উপেক্ষা করে এই পথেই হেঁটেছিল।
 
পুনর্গঠিত নদী কমিশনের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হস্তান্তরিত হলে, আশা করা যায়, জলসম্পদ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝিরও অবসান হবে এবং দুই প্রতিবেশী দেশ তখন পারস্পরিক যোগাযোগ, পুঁজি বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ বাণিজ্য, জল পরিবহন এবং জাতীয় সুরক্ষামূলক বিষয়গুলির প্রতি মনোযোগ দিতে পারবে।সব থেকে গুরুত্বপূর্ন হল, ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এবং সেই সাথে এই দুই দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে ঠিক করতে হবে তারা প্রতিবেশীর সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলে দেশের অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা জোরদার করে তুলতে চায়, না এক শতাংশ জলের ব্যাপারে মতান্তরকে সেই সম্ভাবনার অন্তরায় হতে দিতে চায়। আবেগের রাজনীতি না যুক্তির রাজনীতি--সব শেষে বেছে নিতে হবে এর দুটির একটিকে।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics