Column
কোরআনের আড়ালে জামাতের সন্ত্রাস

30 Sep 2013

#

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি প্রবীণ ইসলা্মি নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন।

 এর আগে, ফেব্রুয়ারি মাসে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে জামাত এ ইসলামির  এই চতুর্থ প্রধান নেতার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন সাজার আদেশ হয়েছিল। \'মীরপুরের কসাই\' নামে পরিচিত মোল্লার এই \'স্বল্প\' সাজা ঢাকার শাহবাগ স্কোয়ারের আন্দোলনভূমিতে নজিরবিহীন ক্ষোভের সৃষ্টি করে। নানা বয়সের লক্ষ লক্ষ মানুষ শাহবাগ চত্বরে জড়ো হয়ে মোল্লা এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদন্ডের দাবি তোলেন। অবশেষে, মোল্লার যাবজ্জীবন্ শাস্তিকে খারিজ করে দেশের সর্ব্বোচ্চ বিচারালয় তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ায় এখন সেই বিক্ষুব্ধ মানুষেরা আনন্দিত।

 
 বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ধর্ষণ, খুন এবং একজন কবি ও একজন অত্যন্ত নামী সাংবাদিকসহ ৩৫০ জন নিরস্ত্র অসামরিক বাঙ্গালির গণহত্যার দায়ে মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। ওই ঘটনাগুলি যখন ঘটে, সেই সময় মোল্লা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার একজন ছাত্র। 
 
মোল্লার চরমদন্ডের আদেশ হওয়ার পর জামাতের সদস্যরা দেশজুড়ে হিংসাত্মক প্রতিবাদ আন্দোলনে নেমে পড়ে। শুরু হয়  ব্যাপক দাঙ্গা এবং বিশেষত চট্টগ্রামে সৃষ্টি হয় ভয়ানক পরিস্থিতির। সারা দেশজুড়ে ডাকা হয় দু\'দিনের হরতাল, চলতে থাকে সহিংস তান্ডব, যাতে দু\'জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ হয়েছেন আহত। 
 
১৯৭১ সালের যুদ্ধ-সম্পর্কিত অপরাধে গত জানুয়ারি মাস থেকে ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত ছ\'জন ইসলামি নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। ওই যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী যোদ্ধারা লড়াই করেছিলেন প্রধানত স্থানীয় জামাত এ ইসলামি নেতাদের মদত পাওয়া পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে। 
 
উনিশশো একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা জামাত এবং তাদের যে সব নেতা আজ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারাধীন, সবসময়ই তারা ধর্মের আবরণ ব্যবহার করে চেষ্টা করেছে নিজেদের জঘন্য অপরাধের দিক থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে। 
 
এর আগে, যখন তাদের আর একজন সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ের নেতা, দেলওয়ার হোসেন সাইদির বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ ঘোষিত হয়, তখনও একই কৌশল অবলম্বন করেছিল জামাত। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিসে সাইদির মৃত্যুদন্ডের আদেশ হওয়ার পরেই সারা দেশজুড়ে জামাত কর্মীদের সন্ত্রাস ও হিংসাত্মক তান্ডবে ছ’জন পুলিশকর্মীসহ অন্তত ৭৪ জন নিহত হন। একই সঙ্গে আক্রমণ চলে সংখ্যালঘু হিন্দুদের মন্দির ও বাড়ীঘরের উপরে। জিহাদের নামে সেই সময় বেশকিছু হিন্দু বাড়িতে লুঠপাট চলে, পুড়িয়ে দেওয়া হয় ছ’টি মন্দির।
 
উনিশশোএকাত্তর সালে পাকিস্তানি দখলদারি বাহিনী এবং তাদের বাংলাদেশী সহযোগীরা মিলে নজিরবিহীন মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনা ঘটিয়েছিল এ’দেশে। পাক বাহিনীর সঙ্গে স্থানী যারা হাত মিলিয়েছিল, তাদের মধ্যে জামাত ছিল প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। এইসব স্থানীয় সহযোগীরা তাদের জঘন্য কুকর্মের সাফাই গাইতে ইসলামের নাম ব্যবহার করেছিল। কিন্তু ইসলামকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশীদের মাতৃভূমিতে হত্যা, ধর্ষণ এবং ধ্বংসলীলা চালিয়ে আসলে তারা ইসলামেরই অবমাননা করেছিল। এইসব দেশদ্রোহীরা চেষ্টা করেছিল বাংলাদেশের প্রতি ভালবাসা এবং ইসলামের প্রতি ভালবাসার মধ্যে সংঘাত ঘটাতে। বাংলাদেশের কিছু মানুষের মধ্যে ইসলামি আবেগকে কাজে লাগিয়ে এবং বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার মুসলমানদের সমর্থন আদায় করে এ কাজে তারা কিছুটা সফলও হয়েছে।
 
দু’হাজার দশ সালে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ আদালত জামাত নেতাদের বিচার শুরু করার সময় থেকেই এর বিরুদ্ধে জামাতের প্রচার তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারন করেছে। অতীতের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে এখন তারা মিথ্যা প্রচারের বন্যা বইয়ে দিয়ে অভিযোগ করছে যে, যুদ্ধাপরাধ বিচার আসলে একটা লোক দেখান ব্যাপার এবং এর আসল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে ইসলামকে ধ্বংস করা। আওয়ামি লীগ সরকারকে ‘ইসলাম বিরোধী’ তকমা দিয়ে এরা চেষ্টা করছে ধর্মীয় উন্মাদনা জাগিয়ে তুলতে। এই করতে গিয়ে তারা নৈরাজ্য তৈরি করছে আর আইনরক্ষকদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে জিহাদের নামে প্ররোচনা দিচ্ছে দেশের  তরুণদের।
 
এটা দেখা গেছে, যখনই জামাত তাদের বে-আইনি কর্মসূচি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখনই তারা তার সাথে জিহাদের আবেগ জুড়ে দিয়ে কুকর্মের বৈধতা পেতে চেষ্টা করে। কিন্তু এই জিহাদের নামে শুধু যে তারা সাধারন মানুষকে হত্যা করছে এবং মহিলাদের ধর্ষণ চালাচ্ছে, তা-ই না, মসজিদেও আগুন লাগাচ্ছে। জাতীয় মসজিদের ‘খাতিব’ (প্রধান ইমাম) বৈতুল মুকার্‌রমসহ বেশিরভাগ ইসলাম শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি ইসলামের নামে মসজিদে হামলা না চালানর জন্য জামাতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
 
উনিশশো একাত্তর সালের ২৫ শে মার্চ, গভীর রাত্রে যখন পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত মানুষদের ব্যাপক হত্যা শুরু করে, জামাত নেতারা তখন একে ‘ইসলামি হত্যা’ বলে বর্ননা করেছিলেন। ওই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করা হয় এবং হত্যা করা হয় বহু ছাত্রকে। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান ঘাতক বাহিনীর হাতে মাত্র একটি রাতের মধ্যে খুন হয়ে যান ৭০০০ মানুষ। এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকার অর্ধেক বাসিন্দা শহর ছেড়ে পালিয়ে যান, আর খুন হন ৩০,০০০ মানুষ। এই ঘটনাকে বিতর্কিত রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে জামাত তখন বলেছিল, যা হচ্ছে তা আসলে ‘জিহাদ’, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ‘ইসলামি সংগ্রাম।‘
 
ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার বিবরণ দিয়ে আমেরিকান কনস্যুলেটের রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, রোকেয়া হলের ভিতরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে পায়ে দড়ি বাঁধা অবস্থায় নগ্ন নারীদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা গেছে। মনে হয় গুলি করে মারার আগে এদের ধর্ষণ করা হয়েছিল। জামাতের ‘আমির’ গুলাম আজম সেই সময় এই কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছিলেন, এ হচ্ছে ইসলাম রক্ষার্থে ‘জিহাদের অংশ।স’
 
ওই বছরে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং নাবালিকাসহ আনুমানিক আড়াই লক্ষ মহিলার উপর পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছিল। এই ব্যাপারটিকে জিহাদের অংশ বলে সমর্থন জানিয়েছিল জামাত । এর পর যখন হাজার হাজার ধর্ষিতা মহিলার সন্তান জন্ম নিল, তখন ইসলামের নামে জামাত তাঁদের উপর এমন মানসিক নির্যাতন চালায় যে, এই মহিলাদের অনেকেই আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন অথবা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে্ যান।
 
আজ যখন বাংলাদেশের সরকার সেইসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে, জামাত তখন ‘পবিত্র কোরআন’ এবং ‘ইসলাম’কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সেই চেষ্টা বানচাল করতে সবরকমভাবে চেষ্টা করছে। তাদের দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা দেলওয়ার হোসেন সাইদির মৃত্যুদন্ডের আদেশের পর জামাত মরীয়া চেষ্টা চালাচ্ছে গৃহযুদ্ধের ধাঁচে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে। এর আগেই তারা দেশে গৃহযুদ্ধ বাঁধানর হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু এ’ব্যাপারে জনগণের কাছ থেকে তারা অল্পই সাড়া পেয়েছে।
 
‘ইসলাম’কে বাঁচানর এবং ‘জিহাদ’ ঘোষণার মিথ্যা প্রচার চালিয়ে জামাত চাইছে তাদের খুনি, ধর্ষক নেতাদের বাঁচাতে। আর এই ব্যাপারে বিশ্ব জনমত আদায় করতে তারা পয়সা ছড়াচ্ছে এবং প্রভাব বিস্তার করার জন্য লোক নিয়োগ করছে। তবে মানুষ এখন বুঝে গেছেন যে, এইভাবে ধর্মীয় আবেগ উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে ‘ইসলাম’কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা।
 
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের মানুষ সবসময় অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং তাঁরা জয়ী হয়েছেন। প্রবল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ একদিন মুক্ত হয়েছিল এবং মানুষ লাভ করেছিলেন স্বাধীনতা। যুদ্ধপরবর্তী সময়েও এ’দেশের মানুষ সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেছেন। এবার সময় এসেছে সমস্ত পাকিস্তানপন্থী ইসলামি শক্তিগুলি এবং যুদ্ধবাজদের সমূলে উৎখাত করার। দু\'হাজার তেরোতে, যখন শাহবাগ প্রজন্মের উত্থান ঘটেছে বাংলাদেশে, মানুষ তখন কোনও অপরাধীকে আর কোরআনের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে থাকতে দেবেননা। পবিত্র কোরআনের পবিত্রতা এবং প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা করবেন তাঁরাই। 



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics