Column
সন্ত্রাসের আর এক নাম 'ইসলামি ছাত্র শিবির'

30 Sep 2013

#

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে যে ব্যাপক হিংসাত্মক এবং নাশকতামূলক কাজকর্মের ঘটনা ঘটে চলেছে,

 তার পুরোভাগে থাকা সংগঠনটির নাম ইসলামি ছাত্র শিবির, জামাত-এ-ইসলামির ছাত্র ফ্রন্ট।  দেশের অন্যতম বৃহৎ   ছাত্র সংগঠন, শিবিরের প্রায় দেড় লক্ষ তৃণমূল স্তরের কর্মী ছাড়াও আছে আরও বহু লক্ষ কর্মী -সমর্থক-দরদী। সারা দেশজুড়ে এদের আছে ১০৩টি শাখা এবং ১৫০০টি ইউনিট।            

 
যে ধরনের হিংসাত্মক আক্রমণ চালাচ্ছে এই সংগঠন, তার মধ্যে আছে হত্যা, প্রতিপক্ষের অঙ্গচ্ছেদ করে কিংবা শরীরের গুরুত্বপূর্ন ধমনী কেটে দিয়ে জীবনের মত পঙ্গু করে দেওয়া, ইত্যাদি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির ছাত্র সংগঠনগুলির উপর নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতেও শিবির খুনের রাজনীতির পথ নিয়েছে। এ ছাড়াও প্রতিপক্ষ সংগঠনের কর্মীদের শরীরের বিশেষ অংশের কন্ডরা অর্থাৎ অস্থির সঙ্গে মাংসপেশীর বন্ধনকারী তন্তুরজ্জু ছিন্ন করে দিয়ে তাদের চিরকালের মত চলৎশক্তিহীন করে রাখার কায়দা চালু করে বার বার খবরে এসেছে এই সংগঠন। 
 
শিবির, যা জামাত কর্মী হিসেবে দলে অভিষেকের প্রধান মাধ্যম, বাংলাদেশকে ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা চালানোর সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনে  সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। আগে যেমন ছিল, তেমনি এখনও ধর্ম নিরপেক্ষ শক্তিগুলি এদের সবথেকে বড় শত্রু। পাকিস্তানের আই এস আই-য়ের সঙ্গে শিবিরের গোপন যোগাযোগ একটিই ইঙ্গিত দেয়--বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে নষ্ট করে তাকে পাকিস্তানের আজ্ঞাবহ দেশে পরিণত করাই এদের প্রধান কর্মসূচী।
 
বর্তমানে চলতে থাকা যুদ্ধাপরাধ বিচার যে জামাত-শিবিরের বিনাশ ডেকে আনবে এবং দলের উঁচু তলার নেতাদের ফাঁসির দড়িতে ঝোলাবে, তা বুঝতে পেরে \'প্রকৃত ইসলামি বাংলাদেশ\'-য়ের লক্ষ্যে কাজ করা এবং নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখতে মরীয়া এই দুই সংগঠনই এখন জামাত নেতাদের বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল হিসেবে দেখাতে চাইছে।ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের অপরাধে বিচারাধীন জামাত নেতাদের মামলার রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই এরা দেশজুড়ে শুরু করেছে হিংসাত্মক তান্ডব। পুলিশ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ, হিন্দুদের মন্দির জ্বালিয়ে দেওয়া, যানবাহন ভাঙ্গচুর করা, অথবা সরকারী সম্পত্তি ধ্বংস করা--কিছুই বাদ যায়নি এদের কর্মসূচী থেকে। 
 
আন্তর্জাতিক আদালতে জামাতের প্রবীণ তাত্ত্বিক নেতা দেলওয়ার হোসেন সাইদির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পরেই বাংলাদেশের বেশ কিছু জেলায় হিন্দুদের উপর আক্রমণ শুরু হয়ে যায়। প্রায় ১,০০০ হিন্দু বাড়ি জ্বালিয়ে এবং ধ্বংস করে নিরাশ্রয় করে দেওয়া হয় বাসিন্দাদের । হিন্দুদের উপর  আক্রমণের এই খবর স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত হলেও তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচার পায়নি, যদিও সোশাল মিডিয়াতে কিছু ছবি বেরিয়েছে। হিন্দু ছাড়াও বৌদ্ধদের বাড়ি-ঘর, উপাসনাস্থলেও ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়েছে জামাত-শিবিরের কর্মীরা। 
 
জামাতের ঝটিকা বাহিনী, শিবি্‌র, বাংলাদেশকে পরিণত করেছে একটি নতুন সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রে। উনিশশো সাতাত্তর সালে সংগঠনের পুনর্জন্মের পর থেকেই দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে বিপরীতমুখী করে তালিবান-ধাঁচের ইসলামি ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে ধারাবাহিক আন্দোলন করে যাচ্ছে এরা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসার ছাত্রদের মধ্যে \'জিহাদি\' মনোভাব জাগিয়ে এরা তাদের জিহাদি লক্ষ্যের জন্য প্রস্তুত করছে। 
 
দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন মসজিদ এবং মাদ্রাসাগুলিতে বিপুল অস্ত্র মজুত করে রেখেছে শিবির। অস্ত্র তৈরি এবং ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আই ই ডি) ব্যবহারে বহু শিবির কর্মীই বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। শিবিরের আখড়া, মাদ্রাসাগুলিতে ছাত্রদের প্ররোচনা এবং অস্ত্রশিক্ষা দেওয়ার পর বাছাই করা ছাত্রদের পাঠান হয় পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে পরবর্তী পর্যায়ের অস্ত্রশিক্ষার  জন্য। শিবিরের রাজনৈতিক ইসলামের তও্ব, যা আধুনিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রের বিরোধী, পৃথিবীর নানা জায়গার সন্ত্রাসবাদী সংগঠনসহ বেশিরভাগ  চরমপন্থী ইসলামি দলগুলির কাছ থেকে মানসিক এবং আর্থিক সাহায্য আদায় করে নেয়।
 
সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা শিবির ১৯৭৯ সালে কুয়েতের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফেডারেশন অফ স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশনের সদস্যপদ পায়। শিবিরের প্রেসিডেন্ট স্যাম তাহের একসময় আই আই এফ এস ও\'র সেক্রেটারি জেনারেল এবং সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকা, সৌদি আরবের ওয়ার্লড অ্যাসেমব্লি অফ মুসলিম ইউথের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দু\'হাজার এক থেকে দু\'হাজার ছয় পর্যন্ত বি এন পি-জামাত শাসনকালে তিনি জামাতের সাংসদ ছিলেন এবং ওই সময় বিভিন্ন  হিংসাত্মক কাজকর্মের পুরোভাগেও থাকতেন। 
 
 আজ চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সবথেকে শক্তিশালী জঙ্গি সংগঠন হিসেবে পরিচিত। খুলনা ও সিলেটের প্রধান ইসলামি সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশের বিশাল সংখ্যক মাদ্রাসায় তারা এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী চরমপন্থী শক্তি। 
 
বর্তমানে \'শিবির\' নামে পরিচিত এই সংগঠনটির জন্ম হয় জামাতের ছাত্র শাখা হিসেবে, লাহোরে, ১৯৪৭ সালের ২৩শে ডিসেম্বর। তখন এর নাম ছিল জামাত-এ-তালাবা (\'তালাবা\' অর্থ ছাত্র)। এর এর পরে, ১৯৫৫ সালে \'ইসলামি ছাত্র সংঘ\' নামে তালাবার পূর্ব পাকিস্তান শাখা তৈরি হয়। 
 
ইসলামি ছাত্র সংঘ কুখ্যাতি অর্জন করে ১৯৭১ সালে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি তাদের নির্মম বিরোধিতার জন্য। সেই সময় স্বাধীনতা সংগ্রাম দমন করতে এরা হানাদার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ্মুক্তিযোদ্ধাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা ছাড়াও গণহত্যা, ধর্ষণ এবং আরও নানা জঘন্যতম অপরাধ করেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের সমর্থনকারী অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে যারা হত্যা করেছিল, সেই কুখ্যাত আল বদর কার্যত গঠিত হয়েছিল ইসলামি ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি্র সদস্যদের নিয়েই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিষিদ্ধ  ঘোষিত হলেও ১৯৭৭ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি মসজিদে ইসলামি ছাত্র শিবির নাম নিয়ে এই সংগঠনের পুনর্জন্ম হয়। 
 
একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম চরমপন্থী ইসলামি শক্তিগুলির কাছে একটি বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের মুজিবুর রহমান সরকার সেই সময় ইসলামি ছাত্র সংঘসহ সমস্ত ইসলামি সংগঠনগুলিকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু অন্য নাম দিয়ে জামাত তার কর্মীদের ফের সংগঠিত করে এবং \'গণতন্ত্র ইসলাম বিরোধী একটি আদর্শ\', এই জিগির তুলে তাদের কর্মীদের দীক্ষিত করতে থাকে। অবশেষে ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান নিষিদ্ধ করে দেওয়া সমস্ত পাকিস্তানপন্থী সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলিকে আবার ফিরিয়ে এনে তাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করেন।
 
প্রমাণিত নথি অনুযায়ী, ইসলামি ছাত্র শিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মির কাশেম আলি এবং পরবর্তী দুই সভাপতি--মহম্মদ কামরুজ্জামান ও আবদুল জাহির মুহাম্মদ আবু নাসের--ছিলে আল বদরের কার্য নির্বাহী সদস্য। ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধের একজন অন্যতম মূল চক্রী ও সেই সময় আল বদরের প্রধান মতিউর রহমান নিজামি জামাত-এ-ইসলামির বর্তমান আমির। তিনি  ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত খালেদা জিয়া-সরকারের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর মত ইসলামি ছাত্র সংঘের আরও অনেক প্রাক্তন নেতা, যাঁরা পরে পুরোপুরিভাবে জামাতেরও নেতা হন, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত ছিলেন। এঁরা সকলেই এখন যুদ্ধাপরাধ বিচারের মুখোমুখি।
 
\'ইসলামি ছাত্র সংঘ\' নামটি তাই মানুষের মনে ঘৃণা এবং ধিক্কার জাগিয়ে তোলে। এই কারণেই ইসলামি ছাত্র সংঘ সংগঠনের নাম পালটে ইসলামি ছাত্র শিবির নাম দিয়ে নিজেদের গায়ে লেগে থাকা কলঙ্কের দাগ লুকোতে চেয়েছিল।
 
পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই-য়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে যুক্ত এই শিবির। এই শক্তির সাহায্য নিয়ে এরা ভারতের বহু অঞ্চলে, বিশেষত, বাংলাদেশ লাগোয়া উত্তর-পূর্ব ভারতে নাশকতামূলক কাজকর্মে মদত দিচ্ছে। আই এস আই, সৌদি আরব, কুয়েত এবং অন্যান্য অনেক মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ছাড়াও আন্তর্জাতিক ইসলামি সংগঠনগুলির কাছ থেকে এদের কাছে বিপুল অর্থের যোগান আসে। পাকিস্তানে ঘাঁটি করা জঙ্গি সংগঠনগুলি, যেমন জামাত (পাক) এবং তার ছাত্র শাখা জামাত-এ-তালাবার সঙ্গেও এরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। আবার জামাত (হিন্দ) এবং তার ছাত্র সংগঠন ইসলামিক অর্গানাইজেশনের সঙ্গেও শিবিরের রীতিমত যোগ আছে। প্রাপ্ত খবর অনুসারে, ভারতে নিষিদ্ধ সিমি এবন ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন (আই এম) সঙ্গেও শিবিরের যোগাযোগ আছে। সিমি এবং আই এম-য়ের হাতে অস্ত্র এবং সৌদি আরব থেকে আসা অর্থ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব এরাই বহন করে।
 
দু\'হাজার দশ সালে আমেরিকার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের \'ন্যাশনাল কনসর্টিয়াম ফর স্টাডি অ্যান্ড রেসপন্স টু টেররিজম\'-এর প্রকাশিত একটি রিপোর্টে শিবিরকে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বলে বর্ননা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, হিংসাত্মক কাজকর্ম এবং হত্যাকান্ড ঘটান ছাড়াও এই সংগঠনটি পৃথিবীজুড়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী দলগুলির সঙ্গে যুক্ত।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics