Column
বাংলাদেশে আল কায়দার সমর্থনভিত্তি

10 Mar 2014

#

'ইসলামি পন্ডিতদের বেপরোয়া হত্যা' এবং অন্যান্য 'ইসলাম বিরোধী কাজকর্ম' বন্ধ না করলে খুব খারাপ পরিণতির হুমকি দিয়ে আল কায়দা প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরির সম্প্রতি প্রকাশিত অডিও বার্তাটি দেশে আল কায়দার এবং তার অনুগামী সংস্থাগুলির উপস্থিতির ব্যাপারে জোরদার বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

 বাংলাদেশকে একটি ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করা লক্ষ্য নিয়ে আফগানিস্তানের তালিবানের আদলে হরকত-উল-জেহাদ-আল-ইসলামি(হুজি) নামে একটি বড় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন এর আগেই সৃষ্টি হয়েছিল দেশে। এই হুজি গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের হেজব-এ-ইসলামিকে সাহায্য করার জন্য ৫০০০ বাংলাদেশি মুজাহিদকে পাঠিয়েছিল আফগানিস্তানে। পরে, ১৯৯৫ সালে অবশ্য হেকমতিয়ারকে ত্যাগ করে তারা যায় তালিবানের দলে। আফগানিস্তানে তালিবানের সাফল্যের পর তাদের একটি দলকে পাঠানো হয় কাশ্মীরে হরকত-উল আনসার (হুয়া)-র হয়ে লড়তে। আমেরিকা হুয়াকে একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করায় দলটি ভেঙ্গে দুটি নতুন সংগঠনের সৃষ্টি হয়--হরকত-উল-মুজাহিদিন (এইচ ইউ এম) এবং হরকত-উল-জাহেদ-আল-ইসলামি (হুজি)। বাংলাদেশে হুজির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মৌলানা শেখ আবদুস সালামকে দু হাজার চার সালের ২১শে অগাস্ট তারিখে আওয়ামি লিগের একটি জনসভায় গ্রেনেড হানায় জড়িত থাকার দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এই আক্রমণটি চালান হয়েছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। এই ঘটনায় আর এক অভিযুক্ত,  হুজির কমান্ডার   মুফতি আবদুল হান্নানও বিচারাধীন।  হান্নান প্রকাশ করেছে যে, ওই বোমা আক্রমণের পর কিছু প্রভাবশালী বিএনপি মন্ত্রীর নিরাপত্তায় ছিল সে।


আফগান তালিবানদের সাথে হুজির এক দল বাংলাদেশি মুজাহিদ ১৯৯৭ সালে রাব্বানির(মাসুদ) নর্দার্ন অ্যালায়েন্স ফোর্সের হাতে ১৯৯৭ সালে আফগান-ইরানের সীমান্তের কাছে ধরা পড়েছিল। তালিবানের বিদেশী যোগাযোগের প্রমাণ হিসেবে তাদের রাষ্ট্র সংঘের প্রতিনিধিদের সামনে উপস্থিতও করা হয়েছিল। 

 

 

বাংলাদেশে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন লশকর-এ-তৈবা(এল ই টি)-র কয়েক জন জঙ্গির গ্রেপ্তা্রের ফলে এল ই টি-র সঙ্গে হুজির যোগাযোগ প্রকাশ পেয়ে গেছে। বিএনপি ও জামাত-এ-ইসলামির বেশ কিছু নেতা এবং জামায়তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ(জে এম বি) সহ চরমপন্থী ইসলামি সংগঠনগুলির সহায়তায় এল ই টি বাংলাদেশে তার শিকড় ছড়িয়েছে। আওয়ামি লিগের জনসভার উপর গ্রেনেড হানায় যুক্ত থাকা আটক হুজি নেতাদের এবং জেএমবি প্রধান শেখ আবদুর রহমান ও দলের সহকারী প্রধান বাংলা ভাইকে (নাশকতা এবং জঙ্গি কাজকর্মে লিপ্ত থাকার জন্য  ২০০৭ সালে এদের ফাঁসি হয়) জেরা করে পাকিস্তানের এল ই টি, জইশ-এ-মহম্মদ এবং সেই সঙ্গে আল কায়দের আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কথা প্রকাশ পেয়েছে। 

 

এর আগে হুজি জঙ্গিরা কলকাতায় ২০০২ সালে আমেরিকান সেন্টারের উপর আক্রমণ চালানোর পর এই সূত্রে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের জেরা করে জানা গিয়েছিল যে, হুজির সহযোগী সংগঠন আসিফ রেজা কম্যান্ডো ফোর্সের একজন নেতা আফতাব আনসারি ২০০১ সালের ২৫শে জুলাই কলকাতার ব্যবসায়ী পার্থপ্রতিম রায় বর্মনের অপহরণে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল। হাওলার মাধ্যমে ভারতীয় ৩.৭৫ কোটি টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে ওই বছরের ৩০ শে জুলাই তারিখে রায় বর্মনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, এই অর্থ থেকেই আমেরিকান সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্লের হত্যাকারী জে ই এম নেতা ওমর শেখ ৯/১১-র হানায় বিমান ছিনতাইকারীদের নেতা মহম্মদ আটাকে এক লক্ষ ডলার পাঠিয়েছিল। এর থেকে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয় যে, হুজি কার্যত আল কায়দার সন্ত্রাসবাদী চক্রেরই একটি অংশ। 

হুজি এবং আল কায়দার মধ্যে যোগাযোগ গড়ে ওঠে সেই সময়, যখন ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্টের একটি ফতোয়ায় স্বাক্ষর করেন  বাংলাদেশের হুজি নেতা ফজলুল রহমান। ১৯৯৮ সালের ওই ফতোয়ায়  আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ইহুদি এবং ধর্মযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে জেহাদের ডাক দেওয়া হয়েছিল। ফতোয়ায় অন্যান্য স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেন এবং আইমান আল জাওয়াহিরি, রিফাত আহমেদ তাহা, ইজিপশিয়ান ইসলামিক গ্রুপের আবু ইয়াসির এবং জামায়েতুল উলেমা-এ-পাকিস্তানের সেক্রেটারি শেখ মির হাম্মা। পরে, ২০০৮ সালের ৫ই মার্চে একটি প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তি জারি করে মার্কিণ স্বরাষ্ট্র দপ্তর হুজিকে একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংস্থা বলে ঘোষণা করে। 

আল কায়দাপন্থি আর একটি সংগঠন, জামায়েতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জএমবি) উদয় হওয়ার পর হুজির থেকে বিপদের আশংকা আরও বেড়ে যায়। এই সংগঠনটি ২০০৫ সালে এক সাথে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা এবং বাংলাদেশে আত্মঘাতী মানব বোমা তৈরি করার  জন্য দায়ী। ইসলামের নামে এরা এক অত্যাচারের রাজত্ব শুরু করে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ষেখ আবদূর রহমান এবং তাঁর সহকারী  সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই ২০০৭ সালে তাঁদের ফাঁসির আগে স্বীকার করেছিলেন যে, এল ই টি নেতা আবদুল করিম টুন্ডার সংস্পর্শে আসার পর পাকিস্তানে তাদের একটি শিবিরে অস্ত্র চালানো এবং বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। তাঁরা এও বলেছিলেন যে, জঙ্গি কার্যকলাপ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থ আসত পাকিস্তান, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং আরও কিছু মধ্য প্রাচ্যের দেশ এবং ইসলামি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি থেকে। সব থকে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, আল কায়দা এবং তালিবানের মত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গ যোগাযোগ এবং অর্থের উৎস প্রকাশ করেছিলেন এরা। কিন্তু তাদের জেরা করে যে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছিল, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি । 


২০০৫ সালের ১৭ই অগাস্ট রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের ৬৪টির মধ্যে ৬৩টি জেলায়একই সাথে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় জে এম বি। হাই কোর্ট, বিমানবন্দর এবং প্রশাসনিক ভবনের মত জনবহুল জায়গাগুলির আশেপাশেই অধিকাংশ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের জায়গাগুলি থেকে আরবি এবং বাংলায় লেখা যে প্রচারপত্রগুলি পাওয়া যায়, তাতে দেশে খেলাফত প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছিল মুসলিম রাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য নয় এবং গণতন্ত্র ও কম্যুনিজম আসলে ধর্মদ্রোহীদের পথ। যারা এই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল, তাদের \'আল্লাহর সৈনিক\' আখ্যা দিয়ে প্রচারপত্রগুলিতে দেশে আল্লাহর শাসন অথবা খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছিল।

ইসলামি আইনের দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করতে যখন জজ, আইনজীবী এবং আদালত চত্বরকে নিশানা করে জে এম বি-র মানব বোমাদের ব্যবহার করা শুরু হতে সারা দেশের উপর তীব্র আঘাত নেমে এল। দেশে মানব বোমা আক্রমণের প্রথম ঘটনা ঘটে ২০০৫ সালের ৩রা অক্টোবর, যখন একই সাথে তিনটি জেলা আদালতে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। আরও দুটি ঘটনা একই সাথে ঘটে চট্টগ্রাম এবং গাজিপুর আদালতে ২০০৫ সালের ২৯শে নভেম্বর, যাতে নিহত হন ১৩ জন মানুষ এবং আহত ৫০ জন। এই ধরণের আর একটি ঘটনায় মারা যান দু জন বিচারক এবং অন্য একটিতে নিহত হয়েছিলেন ৭ জন মানুষ, আর আহত হন শতাধিক। 

পরে আনসারুল্লা বাংলা টিম নামে আরও একটি আল কায়দা অনুগামী চরমপন্থি সংগঠনও আন্তর্জাতিক পরিচিতি পায়। এরা শাহবাগ কর্মী রাজীব হায়দারকে ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি হত্যা করে। রাজীব হত্যার মূল চক্রী সালমান ইয়াসের মাহমুদ জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের কর্মী। 

আল কায়দার ইয়েমেনি আধ্যাত্মিক নেতা আনোয়ার আল-আওলাকির অনুগামী মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানি, যিনি ২০১১ সালে আমেরিকান ড্রোন আক্রমণে নিহত হন, তার আগে কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে বেপরোয়া ভাবে তাঁর কাজকর্ম চালিয়েছিলেন।  তিনি যে সব অল্পবয়সী যুবকদের অনুপ্রেরণা ছিলেন, তাদের মধ্যে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বিস্ফোরণ ঘটানোর চক্রান্তে ৩০ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত ২২ বছরের কাজি মহম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস  এবং ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের কর্মী, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ রাজীব করিম, ২০১১ সালের মার্চ মাসে একটি ব্রিটিশ বিমান উড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করার দায়ে যার ৩০ বছরের কারাবাস হয়েছে। এই চক্রান্তের আগে আল কায়দা নেতা আনোয়ার আল-আওলাকির সঙ্গে পরামর্শ করেছিল সে। সশস্ত্র জিহাদে বিশ্বাসী মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানির আছে চার সহস্রাধিক জঙ্গি অনুগামী। 

 

 

চক্ষু বিশেষজ্ঞ এবং জামাতের মাদারিপুর জেলার আমির ডাঃ ফরিদ  উদ্দিন ২০১৩ সালের মার্চ মাসে তাঁর গ্রেপ্তারের পর প্রকাশ করেছিলেন যে, কৌশল ঠিক করতে এবং  বাংলাদেশে খেলাফত শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনকে কী ভাবে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করতে মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানির সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছিল তাঁর। 

 

আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গোয়েন্দারা আল কায়দা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি এবং সংগঠনের আন্তর্জাতিক চক্রের ২০ জন কর্মীর মধ্যে চলা একটি কনফারেন্স কলের হদিশ পেয়েছিলেন।এর পরেই আমেরিকা এবং তাদের বেশ কয়েকটি মিত্র দেশ বড় আক্রমণের আশঙ্কায় সব মুসলিম রাষ্ট্রেই তাদের দূতাবাসগুলি বন্ধ করে দেয়। ২০১৩ সালের পয়লা অগাস্ট হঠাত করে এক দিনের জন্য ঢাকায় মার্কিণ দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় আন্তর্জাতিক ভাবে কোনঠাসা হয়ে পড়ার ভয় আজ বাংলাদেশের সামনে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক সম্মানের ক্ষেত্রে এই বিপদ দূর করতে সচেষ্ট হোক দেশের সরকার।




Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics