Column
জামাতের বিচার

23 Mar 2014

#

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যে ভূমিকা নিয়েছিল জামাত, তার জন্য একটি অপরাধী সংগঠন হিসেবে তার বিচারের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আই সি টি)।

 এর আগে আই সি টি-তে জামাতের প্রাক্তন আমির গুলাম আজমের বিচারের রায় দেওয়ার সময় জামাতকে অপরাধী সংগঠন হি্সেবে বর্ননা করে  যে কোনও সরকারি, বেসরকারি এবং সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনগুলির প্রধান পদে স্বাধীনতা বিরোধী দল ও ব্যক্তিদের থাকার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার প্রস্তাব দেওয়া হয় সরকারের কাছে। ঐ রায়ে বলা হয়, "পারিবেশিক এবং তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে চালিত হয়ে বলা যায় যে,  রাজনৈতিক দল হিসেবে জামাত...একটি অপরাধী সংগঠন হিসেবে কাজ করেছে, বিশেষত স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। " রায়ে আরও বলা হয়, ১৯৭১-এ যারা স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকা নিয়েছিল, তারা স্বাধীনতার যুদ্ধে শহিদ হওয়া ৩০ লক্ষ মানুষের প্রতি সম্মান জানিয়ে  তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে, তার কোনও প্রমাণ এমন কি এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

 
দখলদারি পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে ন মাস নিরন্তর সংগ্রাম করে এবং বহু লক্ষ মানুষের চরম আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে বাংলাদেশে স্বাধীনতা লাভ করেছিল। দাঁত-নখ দিয়ে সেই স্বাধীনতার তীব্র বিরোধিতা করেছিল জামাত। দখলদারি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করা জঙ্গি ইসলামি দলগুলির মধ্যে সব থেকে বড়, সংগঠিত এবং সক্রিয় ছিল এই জামাত। তাদের তৈরি করা সশস্ত্র জঙ্গি বাহিনী--রাজাকার, আল শামস এবং আল বদর সেই সময় অমানুষিক অত্যাচার চালিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষদের উপরে। যাতে পূর্ব পাকিস্তান দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়, তার জন্য সেখানে গণহত্যা চালানোর উদ্দেশ্যে  এই অসামরিক জঙ্গি বাহিনীগুলিকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিল পাকিস্তান। 
 
ন মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম চলার সময় জামাতের সরাসরি সহযোগিতায় যে অত্যাচার, জঘন্যতম অপরাধের ঘটনা ঘটিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী, তাতে খুন হয়েছিলেন তিরিশ লক্ষ মানুষ, ধর্ষিতা হয়েছিলেন আড়াই লক্ষ মহিলা। এর মধ্যে আছে ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর তারিখে পরিকল্পিত ভাবে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার ঘটনাও। তাই দেশের স্বাধীনতা বিরোধী একটি অপরাধী সংগঠন হিসেবে জামাতের বিচারের দাবি বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি পুরানো বিষয়। 
 
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর অত্যাচার চালানো ছাড়াও বর্তমানে যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত গুলাম আজমের নেতৃত্বে থাকা জামাত বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার অব্যবহিত পরেই অন্য রাষ্ট্রগুলি যাতে তাকে স্বীকৃতি না দেয়, সেই প্রচেষ্টায় দেশে দেশে, বিশেষত মধ্য প্রাচ্যে  ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিল। স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ মেনে নিতে না পেরে গুলাম আজমের মাধ্যমে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে কয়েক বছর ধরে  বাংলাদেশ বিরোধী প্রচার চালিয়েছিল জামাত। ঠিক যখন যুদ্ধে হারতে শুরু করেছিল পাকিস্তান,  সেই সময় গুলাম আজম পাকিস্তানে চলে যান এবং পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গড়ে তুলে শুরু করেন ব্যাপক প্রচার।
 
১৯৭২ সালে লন্ডনে গিয়ে সোনার বাংলা নামে একটি সাপ্তাহিক প্রকাশ করেন গুলাম আজম। ভারত বিরোধী প্রচার চালানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা এই পত্রিকায় অভিযোগ করা হয়েছিল যে, \'পূর্ব পাকিস্তানের\' মুসলমানদের ধরে ধরে হত্যা করা হচ্ছে এবং সেখানকার মন্দির, মাদ্রাসগুলিকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে হিন্দুরা। এও প্রচার করা হয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসলে পাকিস্তানকে ভাঙা এবং ইসলামি সৌভ্রাতৃত্বে বিভেদ ঘটানোর উদ্দেশ্যে ভারতীয় চক্রান্তেরই ফসল।
 
 ১৯৭৩ সালে ম্যাঞ্চেস্টারে ফেডারেশন অফ স্টুডেন্টস ইসলামিক সোসাইটিজের বার্ষিক সভায় এবং পরে লেস্টারে ইউ কে ইসলামিক কমিশনের সভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়েছিলেন আজম। পরের বছর লন্ডনে থাকা এক দল কট্টর পাকিস্তানপন্থির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির একটি বৈঠকের আয়োজন করেন তিনি। সেখানে ঠিক হয়, পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন হওয়া রোখা না গেলেও বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানকে নিয়ে একটি \'কনফেডারেশন\' গড়ার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করা হবে। 
 
এর আগে, ১৯৭২ সালে রিয়াধে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউথ কনফারেন্সে আজম পূর্ব পাকিস্তানের পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাহায্যের জন্য সমস্ত ইসলামি রাষ্ট্রগুলির কাছে  আবেদন জানিয়েছিলেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে তিনি সাতবার সৌদি আরবের রাজার সাথে দেখা করে কোনও ভাবেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি অথবা সাহায্য না দিতে অনুরোধ জানান তিনি। ১৯৭৪ সালে মক্কায় সৌদি-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ইসলামি সংস্থা রাবেতা-এ-আলম-আল-ইসলামির সভা এবং ১৯৭৭ সালে কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেন তিনি। এর পরে আবার ১৯৭৫ সালে সৌদি সফরের সময় সেখানকার রাজা ফয়জলের সঙ্গে দেখা করে আজম অভিযোগ করেছিলেন যে, হিন্দুরা পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিয়েছে এবং মুসলমান হত্যা ও পবিত্র কোরান পোড়ানোর পাশাপাশি সেখানে চলছে মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির বানানো। তাই পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের তথাকথিত দুর্গতির কথা বলে তাদের সাহায্যার্থে সৌদি আরব এবং  মধ্য প্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলি থেকে বিপুল তহবিল যোগাড় করেছিলেন তিনি। 
 
১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে আই সি টি এ পর্যন্ত ছ জন জামাত নেতার শাস্তি ঘোষণা করেছে। গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যে জামাত এবং তার নেতারা আজ বিচারাধীন, সব সময়েই তারা ধর্মের আবরণ ব্যবহার করে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রুখতে তাদের করা  জঘন্য অপরাধগুলির দিক থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাবার জন্য। এই উদ্দেশ্যেই তারা বলতে শুরু করল যে,  বাংলাদেশে ইসলামকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই এই বিচারের আয়োজন করা হয়েছে। সেই কারণেই আওয়ামি লিগ সরকারের গায়ে ইসলাম বিরোধী তকমা লাগিয়ে ধর্মীয় আবেগ জাগিয়ে তুলতে চাইছে তারা। দলের তরুণ কর্মীদের এগিয়ে দিয়ে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে তাকেই \'জিহাদ\' বলে চালাতে চাইছে তারা। 
 
যখনই জামাত তাদের নিজস্ব অবৈধ কর্মসূচী প্রয়োগ করতে চেয়েছে, তখনই তাকে বৈধতা দিতে জিহাদের আবেগ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছে তারা। জিহাদের নামে তারা যে শুধু সাধারণ মানুষকে হত্যা করে এবং নারী ধর্ষণ করে তা-ই নয়, মসজিদেও তার আগুন লাগায়। জাতীয় মসজিদের প্রধান ইমাম  বইতুল মুকররম সহ বহু ইসলামি পন্ডিত ইসলামের নামে মসজিদে ধ্বংসকার্য না চালানোর জন্য আবেদন করেছেন জামাতের কাছে। 
 
১৯৭১ সালে যখন মধ্যরাত্রে বাংলাদেশের উপর হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি সেনারা নিরীহ মানুষদের হত্যা করা শুরু করে, সেই সময় সেই কাজকে জামাত \'ইসলামি হত্যা\' বলে প্রচার করেছিল। ২৫শে মার্চ  তারিখে শুরু হওয়া সেই আক্রমণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু সংখ্যক ছাত্রকে হত্যা করা হয়। ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ঘাতক বাহিনী এক রাতের মধ্যেই শহরের ৭,০০০ মানুষকে হত্যা করেছিল। এই ঘটনাকেও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে \'ইসলামি যুদ্ধ\' বলে প্রচার করে জিহাদের অঙ্গ হিসেবে প্রচার করেছিল জামাত।
 
১৯৭১ সালের ৩১শে মার্চ তারিখের বিবরণ দিয়ে ঢাকার মার্কিণ দূতাবাস থেকে  জানানো হয়েছিল যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের সিলিং ফ্যানগুলি থেকে  ধর্ষিত এবং গুলিতে নিহত নগ্ন নারী দেহ পায়ে দড়ি বাঁধা অবস্থায় উলটো অবস্থায় ঝুলতে দেখা গেছে। এই ধরণের কাজকে ইসলাম রক্ষার্থে জিহাদেরই অঙ্গ বলে সমর্থন করেছিলেন জামাতের প্রাক্তন আমির গুলাম আজম। 
 
এখন যখন বাংলাদেশ সরকার একাত্তরের সেই যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছে, পবিত্র কোরান এবং ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সেই বিচার বাণচাল করার সব রকমের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে জামাত। দেলওয়ার হোসেন সাইদির মৃত্যুদন্ড ঘোষণার পর থেকে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চাইছে জামাত। কিন্তু  এ ব্যাপারে দেশের জনগনের কাছ থেকে খুব সামান্যই সমর্থন জুটেছে তাদের। 
 
দলের খুনি ও ধর্ষক নেতাদের বাঁচাতে ইসলামকে বাঁচানোর নাম করে চতুর্দিকে মিথ্যা প্রচার চালানো জামাত বিশ্ব জনমত নিজেদের দিকে আনার জন্য পশ্চিমী দুনিয়ায় বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। কিন্তু মানুষ বুঝে গেছেন যে, রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা এবং ইসলামকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যেই এ ভাবে ধর্মীয় আবেগ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। 
 
ঐতিহাসিক ভাবেই বাংলাদেশের মানুষ সব সময় অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে এসেছেন এবং জয়ী হয়েছেন। প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও এ  দেশের মানুষ মাতৃভূমির স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন। যুদ্ধপরবর্তী সময়েও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা জয় করেছেন তাঁরা। যখন আই সি টি অপরাধী সংগঠন হিসেবে জামাতের বিচার শুরু করবে, বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মানুষ, বিশেষত যাঁরা ১৯৭১-এর পরে জন্মেছেন, তাঁরা তখন জানতে পারবেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের উপর কী চরম পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছিল জামাত এবং কী চরম মূল্য দিতে হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য। জঘন্যতম অপরাধের সাফাই দিতে কী ভাবে ধর্মের অপব্যবহার করা হয়েছিল, তাও জানতে পারবেন তাঁরা। ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ধর্মের অপব্যবহার যে দিন বন্ধ হবে বাংলাদেশে, তখনই সার্থক হবে এই বিচারের আয়োজন।



Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics