Column
'যুদ্ধ শিশু' আমার চোখ খুলে দিয়েছে

06 Jun 2014

#

ধর্ম প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্বাস। আমিও আমার মতেই আমার ধর্মকে দেখি এবং জীবনে বিশেষ স্থান দিয়েছি। আমার বিশ্বাস সিনেমা হলে গিয়ে বিনোদন ধর্মীয় চেতনার বিরুদ্ধে। কেন বিরুদ্ধে, সেই ব্যাপারে আলোচনা করছিনা। আমার এই লেখার প্রয়াসের মূলে আমার কিছু উপলব্ধি এবং শিক্ষা, যা আমি পেয়েছি একটি সিনেমা দেখতে গিয়ে। আমি আগেই বলেছি, সিনেমা দেখা আমার নীতির বিরুদ্ধে কিন্তু দেশের ইতিহাস জানার ইচ্ছা সব সময় থাকে।

আমার বন্ধু আনোয়ার আমাকে একটি সিনেমা, \'যুদ্ধ শিশু\' দেখার প্রস্তাব দেয়। সিনেমা শুনেই আমি আমার চিন্তাধারা প্রকাশ করে বলি যে, আমি যেতে পারবোনা। তখন আনোয়ার বলল, কোনও কাল্পনিক কাহিনী নয়, এই সিনেমা তৈরী হয়েছেে আমাদের দেশেরই প্রেক্ষিতে, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে-যা আমাদের ইতিহাস, যা সত্যি, তাই নিয়ে। আমার বন্ধু আনোয়ার বই পোকা, সে সব সময় পড়াশোনা নিয়ে থাকে। সে বলল এই \'যুদ্ধ শিশু\' কোনও আক্ষরিক অর্থে বিশেষ কোনও সাহসী ছেলের অথবা শিশুর কাহিনী নয়। এই ছবি তৈরী হয়েছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে। ছবিটি তৈরী এবং পরিচালনা করেছেন মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রত, যিনি জন্মসূত্রে বাংলাদেশী, ফরিদপুরের ছেলে। দেবব্রত ছবিটির নাম দিয়েছিলেন \'দ্য বাস্টার্ড চাইল্ড\' এবং \'বাস্টার্ড\' শব্দটি থাকায় ভারতীয় সেন্সর বোর্ড ছবিটি মুক্তি পাওয়ার অনুমতি দেয়নি। পরবর্তীতে নাম বদল করে রাখা হয়ে \'যুদ্ধ শিশু\' এবং ইংরাজি নাম \'চিল্ড্রেন অফ ওয়ার- নাইন মান্থস টু ফ্রিডম।\' আনোয়ার জানালো
ছবিটি একই সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের অনেক হলে দেখানো হচ্ছে, যে হেতু বাংলাদেশেও এই ছবি প্রদর্শনের ছাড়পত্র পেয়েছে। ছবিটি সন্মন্ধে সে বলল, এইছবিতে নির্দিষ্ট কোনও একটি গল্প নেই। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের কয়েকটি ঘটনা নিয়ে তৈরী এই ছায়াচিত্র আড়াই ঘন্টা সময়ের মধ্যে দেখানো হয়েছে। ছবিতে কিছু সমসাময়িক ঘটনা- যেমন, শাহবাগের গণজাগরন মঞ্চের আন্দোলনের ছবি দেখানো হয়েছে। এই গণ জাগরনের বা আন্দোলনের মূল কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন ১৯৭১ সালের
মুক্তিযুদ্ধকে।

 ছবিটির শুরুতে দেখানো হয়েছে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ, যা দেখে আমেরিকার অবস্থান যে আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, তা বুঝতে কারুর বাকী থাকেনা। আনোয়ার দু\'টি
মর্মস্পর্শী ঘটনা শোনাল- কী ভাবে এক সাংবাদিক, আমিরের  চোখের সামনে তারই স্ত্রী ফিদাকে ধর্ষণ করে তুলে নিয়ে যায় জেনারেল মালিক নামে এক পশু এবং এই ফিদা স্থান পায় \'রেপ ক্যাম্পে\', যেখানে দিনের পর দিন তার উপর চলে অকথ্য
যৌন অত্যাচার। আর একটি করুণ দৃশ্য দুই কিশোর কিশোরীকে নিয়ে। পাক সেনারা গুলি করে গ্রামের সবাইকে হত্যা করে, কিন্তু অলোকিক কারণে বেঁচে যায় রফিক এবং কৌসর। রফিক তার বোনকে বাঁচাতে বদ্ধপরিকর। সে যে কোনও উপায়ে চায় ভারতে পৌঁছতে, কারণ তার বাবা একদিন তাকে বলেছিলেন বাঁচার জন্যে প্রয়োজন হলে ভারতে চলে যেতে।

আনোয়ারের মুখ থেকে \'যুদ্ধ শিশু\'র বর্ননা পেয়ে আমার চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে। আমি সিনামাটি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করি এবং রাজধানীর এক প্রেক্ষাগৃহে আমি ও আমার বন্ধু চলে যাই। ছবির মূল অংশ শুরু হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের (আমি ছবিটি দেখার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত \'বঙ্গবন্ধু\' বলতে পারিনি) স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করার জন্য বেতারে নথি পাঠানোর মধ্য দিয়ে। ছবিটিতে নারীদের বিভিন্ন ভাবে দেখানো হয়েছে, যেমন কিশোরী থেকে চল্লিশ বছরের নিচের মেয়েরা এবং চল্লিশ বছরের উপরের নারীরা  এবং বয়স্কা নারীদের মেরে ফেলা হয়েছে। দেখানো হয়েছে কী ভাবে লাশ ফেলা হচ্ছে। এই মেয়ে, নারী, বৃদ্ধা সবাই তো আমাদের কারও মা, বোন বা স্ত্রী। আমার মনে হয়েছিল এই দৃশ্যগুলি আপত্তিকর, কিন্তু না, সেটা ছিল আমার ভ্রম। এটাই সত্যি, কারণ এটাই ইতিহাস। উপলব্ধি করতে পারছি, ছবিতে যা দেখানো হয়েছে- সেই সময় আমাদের মেয়েদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের আচরণ- কী ভয়ংকর ছিল তা। এই ছবি থেকেই আভাস পাওয়া যায় কী ভাবে আমাদের দেশের  ৩০ লক্ষ মানুষ, বুদ্ধিজীবীকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে, ধর্ষিতা হয়েছেন লক্ষ লক্ষ নারী। ছবিটি দেখে আমি ভাবছিলাম যে আমিও সেই পাকিস্তানপন্থী ছিলাম, আমার পথপ্রদর্শক নেতাদের মতোই। আমরা একই অপরাধ করেছি পাকিস্তানি হানাদারদের সাহায্য করে। ধর্মকে নিয়েই রাজনীতি করছিলাম, কিন্তু এই ছবি আমার চোখ খুলে দিয়েছে। ধর্ম আমার কাছে প্রধান, কিন্তু ইতিহাস আমাদের জানতেই হবে। \'যুদ্ধ শিশু\' আমাকে সঠিক রাস্তা দেখিয়েছে। আমার জ্ঞানী
পথপ্রদর্শকদের অনুরোধ করব, আপনারাও ইতিহাস প্রত্যক্ষ করে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিন কোন পথে চলবেন আপনারা-- দেশকে আবার পাকিস্তান তৈরী করবেন, না স্বাধীন বাংলাদেশকে মনে প্রানে মেনে নেবেন?




Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics