Column
বিএনপি-র 'কীর্তিমান' সিনিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট তারিক রহমান

09 Jun 2014

#

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং বিএনপি-র সিনিয়ার চেয়ারম্যান তারিক রহমানকে 'তস্কর সরকার এবং হিংসাত্মক রাজনীতির প্রতিভূ' বলে বর্ননা করে ঢাকার মার্কিণ দূতাবাস থেকে তারিককে আমেরিকায় প্রবেশাধিকার না দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল।

 মার্কিণ দূতাবাসের বক্তব্য অনুযায়ী তারিক \'চরম রাজনৈতিক দূর্নীতির অপরাধে অপরাধী\', যার জন্য আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। উইকিলিকের ফাঁস করা খবর অনুযায়ী, তাঁর জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্থায়িত্ব এবং বৈদেশিক সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারে আমেরিকার  নীতির উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে বলে মনে করে মার্কিণ সরকার।

 
এই মর্মে বাংলাদেশে আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ারটির ৩রা নভেম্বর, ২০০৮ সালে ওয়াশিংটনে পাঠানো একটি কেবল বার্তা ২০১১ সালের ৩০ অগাস্ট প্রকাশ করেছিল উইকিলিক।
 
সেই বার্তায় তারিকের কিছু বড় দূর্নীতির উল্লেখ করে মরিয়ারটি এই ব্যক্তিকে আমেরিকায় ঢুকতে দেওয়ার ব্যাপারে তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অবশ্য এই ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা জানা যায়নি। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে তারিক লন্ডনে আছেন।
 
মরিয়ারটির সুপারিশের ছ মাস বাদে ঢাকায় মার্কিণ দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার গীতা পাসি তারিকের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের কাছে আর একটি কেবল পাঠিয়েছিলেন। তাতে বলা হয়েছিল, মার্কিণ স্বরাষ্ট্র দপ্তর সে দেশের প্রেসিডেন্টের আদেশবলে তারিকের ভিসা প্রত্যাহারের কথা বিবেচনা করছে। 
 
"তারিক রহমানের দূর্নীতিমূলক কাজকর্ম আমেরিকার স্বার্থের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে," মরিয়ারটি লিখেছিলেন। তারিক সম্পর্কে তিনি আরও বলেছিলেন, "তাঁর উদ্ভট কাজকর্ম সরকারের উপর জনগণের আস্থাকে দূর্বল করেছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্থায়িত্ব নষ্ট করেছে।"
 
"আইন লঙ্ঘন করার যে কুখ্যাতি তারিক রহমান অর্জন করেছেন, তার ফলে আইন সংস্কার ও উন্নত প্রশাসনের জন্য এবং আইনের অপব্যবহার বন্ধ করার জন্য আমেরিকা সরকারের আর্থিক সহায়তার যে উদ্দেশ্য, তা বিঘ্নিত হয়েছে," ওই কেবলে বলা হয়েছিল।
 
 "ঘুষ, আর্থিক তছরুপ এবং দূর্নীতির যে সংস্কৃতি  বিএনপি-র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার পুত্র বাংলাদেশে গড়ে তুলেছেন, তা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে  আমেরিকার ব্যবসায়িক সুযোগ নষ্ট করছে," মরিয়ারটি লিখেছিলেন। "জনগণের লক্ষ লক্ষ ডলার আত্মসাৎ  করে তিনি এই উদারপন্থী মুসলমান-গরিষ্ঠ রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের এবং এই গুরুত্বপূর্ন অঞ্চলে একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক সরকার স্থাপন করার যে উদ্দেশ্যে আমেরিকা চেষ্টা করছে, তার ক্ষতি করেছে," কেবলে বলা হয়েছে।     
 
বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিণ দূতাবাসের তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার আছে , তা হল গণতান্ত্রিকতা ও উন্নয়নের প্রতিষ্ঠা করা এবং সন্ত্রাসবাদকে জায়গা না দেওয়া । "তারিকের বেপরোয়া অসততা এবং দূর্নীতিমূলক কাজকর্ম এ সব কিছুই বাণচাল করে দিয়েছে, " কেবলটিতে বলা হয়েছিল।
 
 "অর্থ তছরুপ, জোর করে অর্থ আদায় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের যে নজির তারিক রেখেছেন, তার ফলে দেশের আইনের অবমাননা হয়েছে এবং স্থায়ী, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য আমেরিকার যে লক্ষ, তা বিঘ্নিত হয়েছে। দূর্নীতিমূলক ব্যবসায়িক লেনদেন এবং উৎকোচের যে আবহাওয়া তারিক  তৈরি করেছেন, তার ফলে এ দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসাহ কমে গেছে এবং তাতে অর্থনৈতিক অগ্রগতি আনার যে চেষ্টা আমেরিকা চালাচ্ছিল, তা ধাক্কা খেয়েছে," মরিয়ারটি লিখেছিলেন। 
 
এই তারিক রহমান প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে, যে খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬--এই দু\' দফায় দেশের দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময়, বিশেষত দ্বিতীয় দফায়,  তারিক হয়ে উঠেছিলেন দলের সর্বময় কর্তা এবং সব থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। 
 
সেই সময় বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক দপ্তর হাওয়া মহলে ক্ষমতার একটি বিকল্প কেন্দ্র খুলে বসেছিলেন তারিক। এ কথা প্রায় সকলেরই জানা যে, তারিক এবং তাঁর তাঁবেদাররা সরকারি কাজে নাক গলাতেন সমস্ত বড় ব্যবসায়িক লেনদেনের ব্যাপারগুলি তাঁদেরই নিয়ন্ত্রণে থাকত। মরিয়ারটির কেবলে বলা হয়েছে, সরকারি বরাত এবং রাজনৈতিক পদে নিয়োগের ব্যপারে নির্লজ্জ ভাবে  ঘুষ দাবি করায় তারিক রহমান ছিলেন কুখ্যাত। " আমাদের বিশ্বাস, তারিকের বেশ কয়েকটি পাসপোর্ট আছে। সেগুলির মধ্যে একটির ভিত্তিতে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ব্রিটেন তাঁর ভিসা মঞ্জুর করেছিল। তাঁর আর একটি পাসপোর্টের উপর পাঁচ বছরের মেয়াদের মাল্টিপ্‌ল এন্ট্রি বি১/বি২ ভিসা আছে। আমাদের সন্দেহ, ঐ পাসপোর্টটি দেশের সরকারের কাছে আছে।"  
 
বাংলাদেশের অ্যান্টি কোরাপশন কমিশন যে তারিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছে, সে কথা উল্লেখ করে মরিয়ারটির কেবলে বলা হয়েছে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, তারিক বহু কোটি ডলারের অবৈধ সম্পত্তির মালিক। তারিকের শিকার  বহু নামী ব্যবসায়ীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জোর করে অর্থ আদায়ের বহু মামলা ঝুলছে তাঁর নামে।
 
"এই রকম একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, দেড় লক্ষ ডলার না পেলে আল আমিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানিটি বন্ধ করে দেবেন বলে কোম্পানির মালিক আমিন আহমেদকে হুমকি দিয়েছিলেন তারিক। রেজা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মহম্মদ আফতাব উদ্দিন খান, মির আখতার হোসেন লিমিটেডের মির জাহির হোসেন এবং হারুণ ফেরদৌসির মত স্থানীয় আরও  বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরাও প্রত্যেকেই তাঁদের কাছ থেকে জোর করে লক্ষ লক্ষ ডলার আদায় করার অভিযোগ এনেছেন তারিকের বিরুদ্ধে।" এসিসি খালেদা পুত্রের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পত্তি গোপন রাখার অভিযোগও এনেছে, যেমন ন্যাশনাল বোর্ড অফ রেভিনিউ ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ করেছে তারিকের নামে। 
 
তবে  মরিয়ারটি লিখেছেন, তারিকের দূর্নীতি শুধুমাত্র কোম্পানিগুলির কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলনা। যে সব বিদেশি ও স্থানীয় কোম্পানিগুলি থেকে ঘুষ নেওয়ার প্রমান এসিসি পেয়েছে, মরিয়ারটি সেই সব সংস্থাগুলির একটি তালিকাও করেছেন। এর মধ্যে আছে সিমেন্স, হারবিন কোম্পানি, মোনেম কনস্ট্রাকসনের মত সংস্থাগুলি, যাদের থেকে কোনও ক্ষেত্রে সমস্ত ব্যবসায়িক লেনদেনের উপর দুই শতাংশ কমিশন(সিমেন্স), আবার কোনও ক্ষেত্রে সাড়ে সাত লক্ষ কিংবা সাড়ে চার লক্ষ ডলার (যথাক্রমে হারবিন এবং মোনেম) প্লান্ট খোলার জন্য অথবা কন্ট্রাক্ট পাইয়ে দেওয়ার জন্য আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়াও এসিসির কাছে প্রমান আছে যে, বসুন্ধরা গ্রুপের ডিরেক্টর হুমায়ুন কবিরকে হত্যার জন্য সেই গ্রুপের চেয়ারম্যানের ছেলে সনভির সোভানের বিচার বন্ধ করে দিতে ৩১ লক্ষ ডলার নিয়েছিলেন তারিক। মরিয়ারটি এ-ও লিখেছেন, "ঘুষ এবং তোলা তোলা নেওয়ার বাইরেও এসিসির তথ্য অনুযায়ী, টাকা তছরুপের নানা ছকের সঙ্গেও জড়িত  ছিলেন তারিক।কিছু সঙ্গীর সহায়তায় জিয়া অরফ্যানেজ ট্রাস্ট ফান্ড থেকে তিন লক্ষ ডলার সরিয়ে ছিলেন তিনি।
 
দু\'হাজার সাত সালের মার্চ মাসে সামরিক বাহিনীর সমর্থনে চলা তদারকি সরকারের  দূর্নীতি বিরোধী অভিযান চলার সময় তারিক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু পরের বছর সেপ্টেম্বর মাসে জামিনে মুক্তি পান তিনি। সেই মাসেই চিকিৎসার নাম করে ব্রিটেনে পালিয়ে যান তিনি।
 
দূর্নীতি, তোলা আদায়, ঘুষ নেওয়া, তহবিল তছরুপ এবং কর ফাঁকি দেওয়ার মত অনেকগুলি মামলা তাঁর বিরুদ্ধে থাকা সত্ত্বেও তারিক ছাড়া পেয়ে যান বলে মরিয়ারটি লিখেছেনঃ দেশের আদালতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা গভীর রাজনৈতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তারিক বিচার প্রক্রিয়াকে নিজের পক্ষে কাজে লাগিয়েছেন এবং তাঁর জামিন পাওয়ার বিরুদ্ধে তদারকি সরকারের সব রকমের বাধা অতিক্রম করেছেন।"
 
ছাড়া  পাওয়ার শর্ত হিসেবে তারিককে বিএনপি-র সিনিয়ার জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেলের পদ ছাড়তে হয়েছিল এবং কথা দিতে হয়েছিল যে, ভবিষ্যতে তিনি সব রকমের রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে সরে থাকবেন। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার যে, ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁকে বিএনপি-র সর্বশক্তিমান সিনিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয় এবং বলা হয়, তাঁর মায়ের অনুপস্থিতিতে তিনিই দলকে নেতৃত্ব দেবেন।



Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics