Column
বিএনপি-র সরকার হঠাও আন্দোলন

05 Jan 2015

#

'গণতন্ত্র হত্যা দিবস' নাম দিয়ে ৫ই জানুয়ারি আরও একটি সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করতে চাইছেন বিএনপি-নেত্রী খালেদা জিয়া।

 গত বছরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের বর্ষপূর্তির দিন এ হেন আন্দোলন শুরু করার কারণ সহজবোধ্য- আওয়ামি লিগ- নেতৃত্বাধীন শেখ হাসিনার সরকারকে অগণতান্ত্রিক এবং অবৈধ বলে প্রচার ও প্রতিপন্ন করে রাজনীতির লড়াইয়ে হারানো জমি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা। এই দিনটিকে আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামি লিগ পালন করতে চায় \'গণতন্ত্রের বিজয় দিবস\' হিসাবে। সুতরাং  এই দিনটিতে  দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল এবং তাদের মিত্র শক্তিগুলির নেতা-কর্মীদের যে  রাস্তায় রাজনৈতিক সাক্ষাৎ হতে চলেছে, তা এক রকম নিশ্চিত।


এই আন্দোলন শুরু করার আগে কর্মরত এবং প্রাক্তন এক দল আমলা- যাঁদের বিএনপি আমলে অফিসার-অন-স্পেশাল ডিউটি পদ দেওয়া হয়েছিল- তাঁদের সঙ্গে মধ্য রাতে বৈঠক করে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সাহায্য চেয়েছেন খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে   এক অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গড়ে তুলে শেখ হাসিনা সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য দলের নেতা-কর্মীদের ডাক দিয়েছেন তিনি। 

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দেশে যে সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তার আগে জামাতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশজুড়ে হিংসা আর হত্যার তান্ডব নামিয়ে এনে সেই নির্বাচনকে বানচাল করতে  আপ্রাণ  চেষ্টা করেছিল বিএনপি। যদিও এর ফলে বেশ কিছু যায়গায় ভোটার সমাগম কম হয়েছিল, তবুও হিংসা দিয়ে নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা যে শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল, এ কথা এখন সবারই জানা। নির্বাচনে জিতে উপর্যুপরি দ্বিতীয় বার সরকার গঠন করে আওয়ামি লিগ ও তার সহযোগী দলগুলি।

 কিছু পশ্চিমি দেশ এবং সংগঠন অবশ্য এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এবং তাতেই উৎসাহিত হয়ে একটি তদারকি সরকারের অধীনে নতুন করে নির্বাচন করার দাবি তোলে বিএনপি। কিন্তু অনেক আগে- ২০১১ সালেই- সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনের মাধ্যমে সংসদীয় নির্বাচনের তত্ত্বাবধান করার উদ্দেশ্যে তদারকি সরকারের ব্যবস্থা চালু করাকে বে-আইনি ঘোষণা করায় এই প্রথা বিলোপ করা হয়েছিল। 

আওয়ামি লিগ যে ২০১৫ সালের ৫ই জানুয়ারিকে \'গণতন্ত্রের বিজয় দিবস\' হিসাবে পালন করছে, তার কারন তারা মনে করছে এই দিনটি গণতন্ত্রের রক্ষা দিবস। আওয়ামি লিগের শীর্ষ নেতারা যথার্থই বলেছেন যে, যদি ঐ দিনটিতে নির্বাচন না হত, তাহলে এক গভীর সংকটের মুখে পড়ত দেশের গণতন্ত্র। 

নতুন করে নির্বাচন করার যে দাবি খালেদা জিয়া তুলছেন, তাকে নস্যাৎ করে শেখা হাসিনা বাংলাদেশে কোনও মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছেন। কারন ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনেই বাংলাদেশের মানুষ রায় দিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর নেতৃত্বাধীন দল পাঁচ বছরের জন্য দেশ চালাবে। আর তার পর থেকে এ পর্যন্ত এমন গুরুতর কিছু ঘটেনি, যার জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের দরকার হতে পারে। হাসিনা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, পরবর্তী নির্বাচন নির্ধারিত ২০১৯ সালেই হবে, তার আগে নয়। 

নির্বাচনের পর দায়িত্ব গ্রহন করেই শেখ হাসিনা তাঁর দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। দেশকে এগিয়ে নিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা হাসিনা নিয়েছেন, তাতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাঁর জনপ্রিয়তা এবং গ্রহনযোগ্যতা ক্রমাগত  উর্দ্ধমুখী। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা এবং হিংসা ও জঙ্গি কার্যকলাপ দমন করা এবং বিশ্বজোড়া মন্দার মধ্যেও দারিদ্র কমিয়ে দেশকে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশ্বের বৃহৎ  দেশগুলির নেতৃবৃন্দের প্রশংসা আদায় করেছেন তিনি।

 সারা বিশ্ব খুঁজে খুব কম তুলনা পাওয়া যাবে, এমন একটি উদার, আধুনিক এবং প্রগতিশীল মুসলিম সমাজ গড়ে তুলতে  অদম্য সাহস এবং বিচক্ষনতা দেখিয়েছেন হাসিনা। একই সাথে মৌলবাদী, সন্ত্রাসবাদী এবং জঙ্গি দলগুলির মোকাবিলা করে শুধু দেশে নয়, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত এবং সমগ্র উপ-অঞ্চলেই শান্তি এনেছেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে শিক্ষা, স্বাস্থ্য,কৃষি এবং গ্রাম উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটিয়েছে বাংলাদেশ।

১৯৪৯ সালে সংগঠনের জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ক্ষেত্রে সব থেকে বিশ্বাসযোগ্য অগ্রনী ভূমিকা পালন করে এসেছে আওয়ামি লিগ। বাংলাদেশ যে আজ আপেক্ষিক ভাবে উদার, মুসলমান-গরিষ্ঠ গণতান্ত্রিক দেশ হয়ে উঠতে পেরেছে, তার পিছেন অনেক সীমাবদ্ধতা এবং ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও  আওয়ামি লিগের অবদান আছে।
দেশে সব থেকে বড় সমর্থনভিত্তি আওয়ামি লিগেরই আছে, যদিও সেনাবাহিনী, সংবাদমাধ্যম এবং ব্যবসার মত বৃহৎ শক্তিকেন্দ্রগুলিতে এই দলের প্রভাব এখনও সীমিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকারের ফলে বাংলাদেশের জন্মগ্রহন এবং বাঙালি জাতীয়বাদের দ্যোতক রূপে এক অন্যন্য বিশিষ্টতা লাভ করেছে এই দলটি।

 কিন্তু তবুও এযাবৎ কাল পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সব সময়েই তথাকথিত ইসলামি জাতীয়তাবাদী শক্তির হিংসাত্মক আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয়েছে আওয়ামি লিগকে। বিএনপি এবং জামাত সহ এই শক্তি গণতন্ত্রের ধারনায় বিশ্বাসী নয়। ধর্মের নামে  হিংসা, বর্বরতা আর হত্যালীলা চালিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চায় এরা। আওয়ামি লিগ সরকারকে এই শক্তিগুলি পাকিস্তান প্রচারিত দ্বিজাতি তত্ত্বের শত্রু হিসাবে মনেকরে। আজ সবাই জানে যে, এই শক্তিগুলি অস্থিরতা তৈরি করে সরকারের পতন ঘটানোর উদ্দেশ্যে মাফিয়া এবং চরমপন্থী ইসলামি সংগঠনগুলির সাহায্য নিয়ে থাকে।
কিন্তু দেশের রাজনীতিতে সংঘর্ষের সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে, সন্ত্রাসের মূল উৎপাটিত করতে এবং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হাসিনা। অন্যদিকে এর আগের বিএনপি সরকার বরাবর সমস্ত চরমপন্থী এবং পাকিস্তানপন্থী শক্তিগুলির পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে,  যার ফলশ্রুতি ঢাকায় ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার একটি সমাবেশের উপর গ্রেনেড আক্রমন। হাসিনা যে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের  এবং২০৪১ সালের মধ্যে  উন্নত দেশে পরিণত করার চেষ্টা করছেন, তা দেশের মানুষের কাছে একটি বিরাট স্বস্তির বিষয়।




দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়েই তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে হাসিনা চিন ও জাপান সফর করেন, যেখানে তাঁর উন্নয়ন পরিকল্পনা সফল করতে ১১ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

 ক্ষমতায় আসার পর থেকে তার সাফল্য সম্পর্কে আওয়ামি লিগ সরকার আত্মবিশ্বাসী। এই সরকার চিন, জাপান, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করেছে এবং ভারতের সঙ্গে জলসীমানা নিয়ে যে মতবিরোধ ছিল, তারও ফয়সালা করেছে নিজের পক্ষে। অন্যদিকে,বাংলাদেশের ব্যাপারে  পশ্চিমি দেশগুলি  আগে যে অবস্থান নিয়েছিল, তার থেকে পিছিয়ে এসেছে। এই উন্নতি যে সত্যিই হয়েছে, তা আমেরিকার অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট ফর সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স নিশা দেশাই বিসোয়াল, ঢাকায় আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা এবং ব্রিটিশ হাই কমিশনার রবার্ট গিবসনের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলি থেকেই প্রমাণিত। সম্প্রতি আমেরিকায় একটি অনুষ্ঠানে দেশাই সাংবাদিকদের বলেছেন যে, তাঁর দেশ চায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ভারত ও বাংলাদেশের মধেয় স্বাস্থ্যকর সম্পর্কে গড়ে উঠুক। তিনি এ কথাও বলেন যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য আমেরিকা তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি, যুদ্ধাপরাধ বিচার এবং হিংসা ও জঙ্গি কার্যকলাপ দমনে তাঁর ভূমিকার জন্য যে গ্রহনযোগ্যতা হাসিনা ঘরে-বাইরে অর্জন করেছেন, তা কিন্তু যে কোনও মূল্যে এই সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টায় লিপ্ত বিএনপি-র ক্রোধের কারন।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, খুব  আদর্শ না হলেও নিশ্চিত ভাবে খালেদা জিয়ার শাসনকালের (২০০১-২০০৬) থেকে অনেক ভালো। সন্ত্রাসবাদীরা এখন আর বিরোধী দলের জনসভার উপর খোলাখুলি গ্রেনেড আক্রমণ চালিয়ে নিরীহ মানুষ খুন করতে পারছেনা, মূলস্রোতের বিরোধী নেতাদের আক্রান্ত হয়ে মরতে হচ্ছেনা, \'আল্লাহর শাসন\' দাবি করে যে আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদীরা এক সময় রাস্তায় নেমেছিল, তাদেরও এখন দেখা যাচ্ছেনা। রাজনৈতিক হয়রানি অথবা অনভিপ্রেত ঘটনা যেটুকু ঘটছে এখন, সেগুলিও ঘটছে সরকারকে অপদস্থ করে ফেলে দেবার মতলব ভাঁজা বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের কারসাজিতে।

এ কথা এখন আর গোপন নেই যে, খালেদা জিয়া এবং তাঁর পালিয়ে থাকা দুই পুত্র শতকোটিপতি। অবৈধ উপায়ে অর্জন করা বিপুল পরিমান অর্থ এঁরা বিদেশে পাচার করেছেন। দূর্নীতির রমরমা তৈরি করতে খালেদা জিয়ার ভূমিকাও ফাঁস করে দিয়েছে দেশের অ্যান্টি কোরাপশন কমিশন। আওয়ামি লিগ সরকারকে \'অবৈধ\' এবং \'অগণতান্ত্রিক\' আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে আর ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানো যাবেনা।  



Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics