Column
বাংলাদেশে ভূয়ো ভারতীয় নোট পাচার চক্র

10 Mar 2015

#

ঢাকায় পাকিস্তানি হাই কমিশনে কর্মরত জনৈক মহম্মদ মাজহার খানকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে ভূয়ো নোট পাচারের কাজকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১২ই জানুয়ারি আটক করা হয়েছে।

 ভূয়ো নোট পাচারের এই ধরণের কাজকর্মের উদ্দেশ্য ভারতের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করা এবং জঙ্গি সংগঠনগুলিকে তহবিল জোগানো। এই মাজহার খানকে ছাড়িয়ে নিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বনানী থানায় ছুটে গিয়েছিলেন ঢাকায় পাক হাই কমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি সামিনা মেহতাব । 


আই এস আই-এর সঙ্গে যুক্ত থাকা মাজহারকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন তিনি বনানী অঞ্চলে একটি গোপন বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর সঙ্গী  বাংলাদেশি নাগরিক মুজিবুর রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রপ্তারের মুখে পড়ে এই পাকিস্তানি কূটনীতিক কিছু কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলেন। ছেঁড়া কাগজের সেই টুকরোগুলি থেকে কিছু বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর এবং জঙ্গি ইসলামি সংগঠন হিজব-উত-তাহির-এর সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত থাকা তিন জন ব্যক্তির নাম খুঁজে পায় পুলিশ।

 গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশের জেরার মুখে মুজিবুর স্বীকার করে যে, ঐ পাক কূটনীতিকের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেন তাঁরই পূর্বসূরী। মুজিবুরের কথায় আরও প্রকাশ পায় যে, সে নিজে এবং জালাল আখতার নামে আরও এক জন বাংলাদেশি ঐ পাক কূটনীতিকের থেকে ভূয়ো ভারতীয় মুদ্রা সংগ্রহ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং আসাম সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করার কাজে যুক্ত ছিল। ঐ পাক কূটনীতিক যে আরও বিভিন্ন ধরণের ভারত বিরোধী নাশকতার কাজে যুক্ত ছিলেন, সে কথাও জানিয়েছে সে। ঢাকায় দু\'বছর থাকার সময় আই এস আই-এর নানা ধরণের ভারত বিরোধী কাজেই ব্যস্ত ছিলেন মাজহার।

বাংলাদেশ ভিজিলান্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাজহার খানের সঙ্গে বেশ কিছু প্রাক্তন সেনা ও পুলিশ অফিসার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পাক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের অফিসার এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চলে বাস করা কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ  যোগাযোগ ছিল। মাজাহার খানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এই বাংলাদেশি নাগরিকরা আবার যুক্ত ছিল দেশের বিভিন্ন জঙ্গি দলের সঙ্গে ।  

ভূয়ো ভারতীয় মুদ্রা পাচারে পাকিস্তানি নাগরিকদের জড়িত থাকা নতুন কোনও ব্যাপার নয়। ২০১২ সালে বাংলাদেশে লসকর-এ-তৈবার কয়েকজন সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছিল, যাদের কাছ থেকে  উদ্ধার হয়েছিল ১০ কোটি টাকার সমান জাল ভারতীয় নোট। এই ধরণের কাজে আফতাব বাটকি এবং হাই আবদুল্লা সহ মাফিয়া দাউদ ইব্রাহিম গোষ্ঠীর কিছু সদস্যও জড়িত থেকেছে বিভিন্ন সময়।
পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত এবং তাদের সাহায্য ও অর্থানুকূল্যে চলা জাল নোট পাচারের এই কারবার শুধু যে বেড়েছে তা নয়, এক বিপজ্জনক আকার নিয়েছে। করাচি এবং লাহোরের সরকারি টাঁকশালে ছাপানো বস্তা বস্তা জাল ভারতীয় নোট টেম্পো, ট্রাক, বাস এবং এরোপ্লেনে প্রতিদিন ভারতে পাঠানো হচ্ছে। ভারতকে ঘিরে থাকা অন্য প্রতিবেশী দেশগুলিতে থাকা পাক হাই কমিশনে কর্মরত পাকিস্তানি অফিসারেরাও এই চক্রে যুক্ত। 

 থাইল্যান্ডে বসবাসকারী কিছু পাকিস্তানি নাগরিকও সে দেশে আসা ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং ক্যুরিয়ারের মাধ্যমে  জাল ভারতীয় নোট পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। এদের সকলের সাহায্য নিয়ে ভূয়ো নোট পাচারের একটি সুসংগঠিত চক্র গড়ে তুলেছে পাকিস্তানের আই এস আই।

আই এস আই তাদের ভারত বিরোধী কর্মসূচী রূপায়নের জন্য নেপাল, শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপ থেকে সক্রিয় ভাবে কাজ করে চলেছে। খবর পাওয়া গেছে  যে, পাচারের উৎসস্থলের খোঁজ যাতে না পাওয়া যায়, সেই উদ্দেশ্যে পাকিস্তান থেকে চিনের মধ্য দিয়ে ভারত এবং নেপালে জাল নোট পাঠানো হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলির কাছে খবর আছে যে, জাল নোট পাচার থেকে যে আয় হয়, তা লশকর-এ-তৈবা (এল ই টি), হিজব-উত-তাহির (এইচ ইউ টি), হরকত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামি (হুজি), জামায়েতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জে এম বি), আনসারুল্লা বাংলা এবং জামাতের মত চরমপন্থী সংগঠনগুলিকে দেওয়া হয় নাশকতামূলক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার জন্য। 

ভূয়ো নোট পাচারের একজন বাংলাদেশি চাঁই, সোলেমান ওরফে মজুমদার, পুলিশের জেরায় প্রকাশ করেছে যে, পাকিস্তানি আই এস আই-এর নির্দেশেই সে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদী দল জে এম বি এবং হুজিকে ভূয়ো নোট পাচারের দায়িত্ব দিয়েছিল। ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার এস এস রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন যে সোলেমানের সঙ্গে এল ই টি-র যোগ ছিল। ২০১০ সালে জাল নোট সহ কলকাতায় ধরা পড়া সরফরাজ নামে জনৈক পাকিস্তানি নাগরিক ঢাকার কাকরেল অঞ্চলের কর্নফুলি গার্ডেন সিটিতে  অনেক দিন ধরেই বাস করছিল। সেখানে নিজস্ব একটি অ্যাপার্টমেন্ট ছিল তার। সরফরাজের স্ত্রী, বাংলাদেশি নাগরিক লতিফার দাবি ছিল যে তার স্বামী এক জন পোষাক ব্যবসায়ী এবং সেই কাজে তাকে প্রায়ই করাচি এবং কলকাতায় যেতে হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার সময় সরফরাজের কাছে দশ লক্ষ টাকার সমান ভূয়ো নোট পাওয়া  যায়। সে এই সব নোট পাকিস্তান থেকে সংগ্রহ করে কলকাতায় পাচার করত। 

২০১৪ সালের ২৭শে এপ্রিল ঢাকার শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের কার্গো এরিয়া থেকে কাস্টমস  অফিসারেরা একটি কাঠের বাক্সের ভিতর থেকে তাড়া তাড়া এক হাজার টাকার কড়কড়ে জাল ভারতীয় নোট উদ্ধার করেন, সব মিলিয়ে যা ছিল ছ\' কোটি টাকার সমান। "ঐ কনসাইনমেন্ট কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিমানে পাকিস্তান থেকে এসেছিল। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে পাকিস্তানেই তৈরি হয়েছিল ঐ  নোটগুলি, যা সাদা চোখে দেখে প্রথমে আমরাও জাল বলে ধরতে পারিনি," কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর মনিরুল খান জানিয়েছেন। ২০১২ সালে ঢাকার পল্টন অঞ্চলের একটি শপিং মল থেকে দশ কোটি টাকার জাল নোট পাওয়ার পর এটাই বাংলাদেশে জাল নোট উদ্ধারের সব থেকে বড় ঘটনা। 

ভূয়ো নোট তৈরি এবং পাঠানোর কাজে যুক্ত সুসংগঠিত সংগঠনগুলির শক্ত ঘাঁটি হল করাচি, যেখানে থেকে প্রধানত শ্রীলংকা এবং বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়।

 সংবাদমাধ্যমের কাছে মনিরুল ইসলাম বলেছেন, এই চক্রের সাহায্যের জন্য পাকিস্তানে অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যবস্থা করা আছে, যা ছাড়া তাদের পক্ষে এত ব্যাপক ভাবে এবং এত দীর্ঘ সময় ধরে এই সব কাজ কারবার চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতনা। এই সব জাল নোট পাচারে বাংলাদেশের বেশ কিছু সন্ত্রাসবাদী সংগঠনও যুক্ত আছে বলে তিনি জানিয়েছেন। 

ঢাকায় গত বছর ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের গোয়েন্দাদের হাতে তিন জন পাকিস্তানি নাগরিক সহ ভূয়ো নোট চক্রের সাত জন সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছিল। পুলিশের ইনস্পেক্টর জেনারেল এ কে এম শাহিদুল হক জানিয়েছিলেন গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা স্বীকার করেছে যে, পাচার চক্রের কাজ কর্ম থেকে যে আয় হয়, তা জঙ্গি সংগঠনগুলিকে শক্তিশালী করতে এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্র জোগাড়ের কাজে ব্যয় করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছিল যে, ভূয়ো ভারতীয় নোট তৈরি হয় করাচিতে এবং তারপর মহিলা ক্যুরিয়ারদের মাধ্যমে আকাশপথে তা নিয়ে আসা হয় বাংলাদেশে। 

২০১০ সালের ১৮ই ডিসেম্বর ঢাকার এক অভিজাত অঞ্চলের একটি হোটেল থেকে ধরা পড়া পাকিস্তানি নাগরিক রুবিনা জেরায় স্বীকার করেছিল যে, যাতে কেউ বুঝতে না পারে, সেই জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি আবরণের ভিতর লুকিয়ে সে জাল নোটগুলি নিয়ে আসত। তার ভিসা, প্লেনের টিকিট, হোটেল বুকিং- সব কিছু করে দিত পাকিস্তানের একটি সিন্ডিকেটের এজেন্ট। ঢাকায় থাকাকালীন তার অন্যান্য খরচও তারাই বহন করত। সে আরও জানিয়েছিল যে, ঢাকায় যাওয়ার সময় তার সঙ্গে পাকিস্তান থেকে আনা দু\'কোটি টাকার ভূয়ো ভারতীয় নোট ছিল। কিছু ব্যক্তি ঢাকার হোটেলে তার সঙ্গে দেখা করে ঐ জাল নোটগুলি নেয় এবং এর পরে তার কী কাজ হবে তা-ও তাকে বুঝিয়ে দেয়। পুলিশ জানিয়েছে, একই কাজ করা আরও আট জন পাকিস্তানি মহিলার নাম জানতে পেরেছে তারা।

এই রুবিনার কাছ থেকে পাওয়া খবরের সূত্র ধরে গত বছরের ১৮ই জানুয়ারি ঢাকার মৌচাক অঞ্চল থেকে দশ লক্ষ ভূয়ো ভারতীয় মুদ্রা সহ ধরা হয় পাকিস্তানি নাগরিক মহম্মদ দানিশ ও সাব্বির এবং বাংলাদেশি ফাওতেমা আখতারকে। ঢাকার মধ্য দিয়ে সমস্ত জাল নোট পাচারের কাজে সমন্বয়কারীর কাজ করত মহম্মদ দানিশ। লাহোরের বাসিন্দা দানিশ বাংলাদেশি মহিলা ফতিমা আখতারকে বিয়ে করে ঢাকার রামপুরা বাজার অঞ্চলে বাস করত। এই বছরের জানুয়ারি মাসের ১৫ তারিখে শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে ৮০ লক্ষ টাকার জাল ভারতীয় নোট সহ গ্রেপ্তার হয় পাকিস্তানি নাগরিক মহম্মদ ইমরান। জাল পাসপোর্ট এবং ভিসা নিয়ে সে বাংলাদেশে এসেছিল।

তদন্ত করতে গিয়ে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট জানতে পেরেছে যে, ঢাকার গৌসিয়া মার্কেট অঞ্চলের বেশ কিছু পোষাক ব্যবসায়ীও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। আবদুল মান্নান নামে এক জন বস্ত্র ব্যবসায়ীকে সম্প্রতি গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তার ভাই, আর এক জন পোষাক ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান পাকিস্তানে ঘাঁটি থাকা এই জাল নোট চক্রের এক জন পান্ডা। পোষাক কেনার অছিলায় হান্নান প্রায়ই পাকিস্তানে গিয়ে এই চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। সে এখন পলাতক এবং পুলিশ তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। 

আর এক জন পাক নাগরিক, মোবাসসের শাহেদকে ২০১০ সালের ৬ই জানুয়ারি ঢাকার উত্তরা অঞ্চল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিপুল পরিমাণের জাল নোট পাওয়া গিয়েছিল তার কাছ থেকে। পাকিস্তানে থাকা তার নেতাদের নির্দেশে সে ঢাকা থেকেই কাজকর্ম চালাত। বাংলা দৈনিক প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামি জঙ্গি সংগঠন জে এম বি-র সদস্যদের খেপে খেপে পাকিস্তানে পাঠিয়ে অস্ত্র চালনা এবং জাল ভারতীয় নোট তৈরির প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। প্রশিক্ষনের শেষে এই ধরণের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং কারিগরি বিদ্যা নিয়ে দেশে ফেরে তারা। 

ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের কাছে খবর আছে , জে এম বি বহুদিন ধরেই ভূয়ো ভারতীয় নোট পাচারের কাজে যুক্ত। রফিকুল ইসলাম নামে জে এম বি-র সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারন কমিটি, সুরার এক সদস্যকে ২০০৮ সালের ২৪শে অক্টোবর নবাবগঞ্জের চাপাই থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তার থেকে খবর নিয়ে পুলিশ  ঢাকার মেরাদিয়া এবং পল্লবী এলাকা থেকে আরও দু\'জনকে গ্রেপ্তার করে তাদের থেকে জাল ভারতীয় নোট উদ্ধার করে। তারা জানিয়েছিল যে, জে এম বি-র বহু সদস্যই এই জাল নোট ভারতে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে যুক্ত। এই ভাবে আয় হওয়া অর্থ থেকে জে এম বি-তহবিলে প্রতিমাসে ৫০,০০০ টাকা করে জমা পড়ে। তারা বলেছিল যে \'শত্রু\'র ক্ষতি করে যে টাকায় পাওয়া  যায়, তা \'জেহাদ\' প্রসারে এবং তালিবান ধাঁচের ইসলামি বিপ্লব ঘটানোর মত মহৎ কাজেই লাগানো উচিৎ এবং এর মধ্যে কোনও অন্যায় নেই।



Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics