Column
রক্তক্ষরণে মৃত্যুপথযাত্রী অর্থনীতি

13 Mar 2015

#

রক্তক্ষরণ হয়ে মরতে বসেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। জানুয়ারি মাসের ছ' তারিখ থেকে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের অনির্দিষ্ট কালের জন্য চালিয়ে যাওয়া অবরোধ যে আঘাত হেনে চলেছে প্রতি দিন,

 তাতে সেই সময় হয়তো  আর বেশি দূরে নেই, যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে দেশের গত চার দশকের সমীহ জাগানো  অগ্রগতি। এই অগ্রগতির বেশিটাই হয়েছিল দ্রারিদ্র এবং বেকারি সময়সা সমাধান এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে। যা চলছে এই মূহুর্তে, তাতে ১৯৭১ এর যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের মত অবস্থায় পিছিয়ে যাওয়া এই দেশের ভবিতব্য। সব থেকে দুর্ভাগ্যের এবং দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, অতিদ্রুত এই পশ্চাদ্‌গমন ঘটছে এমন একটি সময়, যার মাত্রই কয়েক মাস আগেই বিভিন্ন সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ অর্থনীতির ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি শুরু করার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছিল।


গত চার বছর ধরে বর্তমান সরকারের আমলে একটি স্থিতিশীল জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ। খুব আদর্শ না হলেও এবং আরও অনেক কিছু হওয়ার থাকলেও বাংলাদেশের যেটুকু অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছিল, তা দারিদ্র হার কমিয়ে আনতে প্রভূত সাহায্য করেছিল। বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর করা সাম্প্রতিক সমীক্ষাগুলি জানাচ্ছে যে, অর্থনৈতিক উড়ান শুরু করার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছিল এই দেশ। 

কিন্তু যে অগ্রগতি হয়েছিল তা এখন বিএনপি-র যে কোনও উপায়ে সরকারকে উৎখাত করার হিংস্র আন্দোলনের মুখে ধ্বংস হতে বসেছে। এই দলের  বেপরোয়া, শ্বাসরোধকারী গুন্ডামির একমাত্র ফলশ্রুতি- দেশের অর্থনীতি অতি দ্রুত নিম্নগামী 

বিএনপি-জামাতের দেশব্যাপী এই অনির্দিষ্টকালীন অবরোধ  জনসাধারণের জীবনে এনে দিয়েছে চরম অস্থিরতা। প্রবল পেশি ও অস্ত্রশক্তি থাকায় ধর্মান্ধ জামাত প্রায়ই অকস্মাৎ হিংসাত্মক আক্রমণ চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করেছে, ধ্বংস করেছে বহু জনের সম্পত্তি। জানুয়ারির ছ\' তারিখ থেকে যে অবরোধ চলছে, তাতে সরবরাহ বিপর্যস্ত হওয়ার কারনে এমন কি হাসপাতগুলির কর্তৃপক্ষ থেকেও রোগীদের জীবনদায়ী ওষুধ অথবা অক্সিজেন দেওয়ার ব্যাপারে অসহায়তা প্রকাশ করা হয়েছে। বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী অবরোধের ৪৮ দিনের মধ্যেই নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে এবং মারাত্মক ভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। এই সংখ্যা তার পরে আরও অনেক বেড়েছে।

 যে ক্ষতি হয়ে চলেছে, তার দু\'টি দিক আছে। এক দিকে একের পর এক নিরীহ সাধারণ মানুষের মৃত্যু অথবা পঙ্গু হয়ে যাবার মত হৃদয়বিদারী ঘটনা, অন্য দিকে সম্পত্তির ধ্বংস সাধন। মূলত পেট্রোল বোমা এবং অন্যান্য বিস্ফোরক ছুঁড়ে মারাতেই এই মৃত্যুগুলি ঘটছে। যাঁরা  সাংঘাতিক ভাবে পুড়ে এবং আহত হচ্ছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদেরও শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হবে বলে ধরে নেওয়া  যায়। 

এই নিরবচ্ছিন্ন তান্ডবের ফলে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে দেশে, তাতে পাইকারি এবং খুচরো ব্যবসা সমেত সমস্ত রকম ব্যবসার কাজকর্মই প্রবল ভাবে সংকুচিত হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে দেশের অর্থনীতির এবং তা মুমূর্ষূ  প্রায়।  ফেডারেশন অফ বাংলাদেশ চেম্বার্স অ্যান্ড কমার্সের হিসাব অনুযায়ী, এই অবরোধের ফলে দেশের গড় দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ১৫০০ থেকে ২০০০ কোটি টাকা।


দেশের যে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রটি সব থেকে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, সেই পোষাক রপ্তানি শিল্পের দৈনিক ক্ষতি ৮৪৩ কোটি টাকা, পরিবহণ ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ কোটি , কৃষিতে ২৮৮ কোটি টাকা, জমি-বাড়ির ব্যবসায়ে ২৫০ কোটি এবং পর্যটনে ২০০ কোটি।

এ কথা সুবিদিত যে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী বেশ কিছু সংগঠনের সঙ্গে জামাতের ঘনিষ্ঠ  যোগ রয়েছে। দেশে অস্থায়িত্ব এবং অনিশ্চয়তার পরিবেশ চালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সেই জামাতের উপর বিএনপি-র নির্ভরতা  বাংলাদেশ এবং  দক্ষিন এশিয়ার পক্ষে বিপদের কারন। শুধু তা-ই নয়, এই ধরণের জঙ্গি ইসলামি তান্ডব যদি বাধাহীন ভাবে চলতে থাকে, তাহলে তা পশ্চিমী গণতান্ত্রিক দেশগুলিরও বিপদ ডেকে আনবে। 

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উর্ধগামী এই ইসলামি জঙ্গিপনা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের জঙ্গিদের, বিশেষত আল কায়দা এবং আই এস আই এস-কে এই অঞ্চলে  আকর্ষণ করে নিয়ে আসতে পারে এবং তাহলে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এখনও যেটুকু আছে, তা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

২০০৮-০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমাগত এগিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়, যা ২০০৭ সালে  ছিল ৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার, ২০০৮ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫.৮ বিলিয়ন ডলারে। ব্যাংক অফ বাংলাদেশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ের পরিমাণ ২০১১ সালে ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

বর্তমান সরকারের আমলে বৈদেশিক সাহায্য এবং আমদানির উপর দেশের নির্ভরতা ক্রমাগত কমেছে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের শ্রমনিবিড় কৃষি ক্ষেত্রে খাদ্যশষ্য উৎপাদনের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েছে এবং তা সম্ভব হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সেচের উন্নত ব্যবস্থা, সারের সুষ্ঠু প্রয়োগ, উন্নত বন্টন  এবং ঋণদান ব্যবস্থা করার ফলে।

তৈরি পোষাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ ।  ২০১৪ সালে প্রতি মাসে এই রপ্তানির  অর্থমূল্য ছিল ৩.১২ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ থেকে মোট রপ্তানি, যার বাৎসরিক অর্থমূল্য ২৭ বিলিয়ন ডলার, তার ৮০ শতাংশই আসে বস্ত্রশিল্প থেকে (২১.৫ বিলিয়ন ডলার)। আওয়ামি লিগ সরকারের আমলে বস্ত্র উৎপাদনে বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্য দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে, চিনের পরেই। এই শিল্প ক্ষেত্রে কাজ করেন ৩৫ লক্ষ শ্রমিক।

গত সাত বছরের এই সমস্ত উল্লেখযোগ্য সাফল্য এখন বিপদের মুখে পড়ে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। সরকারের পতন ঘটানো এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য   মৌলবাদী শক্তির পক্ষে  নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে অবরোধ চালিয়ে যে খেলা খেলে যাচ্ছে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট, তাকে কি আমরা সফল হতে দেব? 

যে কোনও নিরপেক্ষ বিচারেই দেখা যাবে  বর্তমানের এই আন্দোলনের চালিকা শক্তি বিএনপির সংকীর্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য- যে কোনও ঊপায়ে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে সরকারকে বাধ্য করা। এই ভাবে ঘোলা জলে মাছ ধরে বিএনপি তাহলে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে।  যে কোনও মূল্যে  রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য বিএনপি-র এই সংকীর্ন রাজনীতি দেশের মানুষের প্রকৃত স্বার্থের পরিপন্থী। বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া খুব ভাল ভাবেই জানেন যে, অবরোধ এবং হরতাল দেশকে, তার অর্থনীতিকে এবং মানুষদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।  মানুষের অনুরোধ-অনুনয়ের প্রতি অনুভূতিহীন থেকে যদি তিনি অবরোধ চালিয়ে গিয়ে দেশের ধ্বংস সাধনের কারিগর হবার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন, তাহলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে দেশকে সর্বনাশ থেকে রক্ষা করার পূর্ন আইনি অধিকার আছে রাষ্ট্রের।



Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics