Column
জাল ভারতীয় নোট ছড়ানোয় বাংলাদেশকে ব্যবহার করছে পাকিস্তান

21 Mar 2015

#

পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস সম্প্রতি ১০ই মার্চ পর্যন্ত তাদের ঢাকাগামী সব ক'টি ফ্লাইট বন্ধ রেখেছিল।

 এ ব্যাপারে পাকিস্তানের হাই কমিশন থেকে বাংলাদেশের হাই কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেন বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলি পি আই এ-র ক্রু এবং যাত্রীদের "হয়রাণি" করছে, তা জানতে চাওয়া হয়।


গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি বনানীতে পি আই এ\'র কান্ট্রি ম্যানেজার  আলি আব্বাসের বাড়িতে পুলিশ হানা দেয়। ঢাকা এয়ারপোর্ট থানার অফিসার শাহ আলম জানিয়েছেন যে, এর আগে আলি আব্বাসের গাড়ির চালক আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং ঢাকার একটি আদালতে দাঁড়িয়ে জাল ভারতীয় নোট পাচারে  জড়িত থাকার কথা সে স্বীকার করেছিল।  আলমগীরের স্বীকারোক্তির উপর নির্ভর করেই তল্লাশি করা হয়েছিল পি আই এ\'র কান্ট্রি ম্যানেজারের বাড়িতে ।


 নিরাপত্তারক্ষীরা পি আই এ-র কান্ট্রি ম্যানেজারকে প্রথমে আটক করে  এবং তারপরে তাঁকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠায়। জাল নোট এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ বস্তু পাচারের সন্দেহে তল্লাশি চালানো হয় পি আই এ-র অন্য অফিসারদের বাড়িতেও । হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডিপার্চার লাউঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন ঢাকায় গত আট বছর ধরে স্টুয়ার্ড হিসেবে কর্মরত পি আই এ-র ইরাফানুল্লাহ শাহ। ২৫শে ফেব্রুয়ারি করাচি থেকে ঢাকায় পৌঁছন  পি আই এ-র একটি ফ্লাইটেও তিন ঘন্টা ধরে তল্লাশি চলে। সন্দেহ করা হয়েছিল যে, ভুয়ো ভারতীয় মুদ্রা বহন করে এনেছে ঐ ফ্লাইট।

এই সব কারনেই পাকিস্তান এখন বাংলাদেশকে প্রায় চোখ রাঙিয়েই পি আই এ-র ফ্লাইট আবার চালু হওয়ার আগে কী কারনে ধরপাকড় চালানো হয়েছিল, তা ব্যাখ্যা করতে বলছে। এ সব করা হয়েছিল সাম্প্রতিক কিছু খবর প্রকাশ হওয়ার পর, যাতে বলা হয়েছিল, পি আই এ-র ফ্লাইটগুলি  ভুয়ো ভারতীয় মুদ্রা সহ বেশ কিছু নিষিদ্ধ দ্রব্য নিয়মিত ভাবে ঢাকায় নিয়ে আসছে।


এত বছর ধরে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং পাকিস্তানে তৈরি জাল ভারতীয় নোট পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে বাংলাদেশ। ব্যবসায়ীদের একটি চক্র এই জাল নোটগুলি বাংলাদেশি এজেন্টদের কাছে হস্তান্তর করে এবং তারা আবার ভারতে মাল পাচারের দায়িত্ব নেয়।

জনৈক মোকলেসুর রহমান, যে ১.৫০ লাখ জাল ভারতীয় নোট নিয়ে ঢাকায় ২০১৪ সালের মার্চ মাসে ধরা পড়েছিল, জেরায় স্বীকার করেছিল যে সে জাল ভারতীয় মুদ্রার এক জন বাহক। সে জানায়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সক্রিয় অবৈধ পশু কারবারি,
চোরাচালানকারী, অস্ত্র ও মাদক পাচারকারীদের মধ্যে খুবই চাহিদা এই জাল নোটের।


জানা গেছে,  যে সব ইউরোপিয় দেশগুলি থেকে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাদি সহ ভারতীয় নোটের কাগজ সরবরাহ করা হয়  সেই সব দেশ এবং ছাপানোর কালি সরবরাহ করা সুইজারল্যান্ডের একটি কোম্পানি থেকে যাবতীয় গোপন খুঁটিনাটিগুলি জেনেছে পাকিস্তান। এই জাল ভারতীয় নোটগুলি করাচি, লাহোর, পেশোয়ার এবং কোয়েটার সরকারি প্রেসে অতি নিখুঁত ভাবে ছাপানো  হয়। ডিরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স জানতে পেরেছে যে, পাকিস্তানে তৈরি জাল ভারতীয় নোট চালানের পথ হিসেবে খুব দ্রুত ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলংকাকে।


স্থল, সমুদ্র, আকাশপথে এবং সেই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশের এবং নেপালের অরক্ষিত সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাচার করা হয় এই সব জাল নোট। বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলংকার মত ভারতকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন দেশে পি আই এর ফ্লাইটেও পৌঁছে দেওয়া হয় ভুয়ো নোট,  যা আবার  সমুদ্রপথে শ্রীলংকা থেকে তামিলনাড়ু অথবা গুজরাতে যায়। এমন সরাসরি পাকিস্তান থেকে নেপাল এবং বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য এমন কি কূটনীতিকদের ব্যাগও ব্যবহার করা হয়।


জাল ভারতীয় নোট বয়ে পাকিস্তান থেকে ঢাকায় নিয়মিত ভাবে আসা ব্যক্তিদের বিস্তৃত বিবরণ দিয়ে বাংলাদেশের   সংবাদমাধ্যমে বহু খবর প্রকাশিত হয়ে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখে ঢাকায় কাস্টমস অফিসারেরা রেহান আলি নামে জনৈক পাকিস্তানি নাগরিককে আটক করে তার থেকে এক কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকার জাল ভারতীয় মুদ্রা উদ্ধার করেছেন। এর আগে এই ব্যক্তি ভুয়ো ভারতীয় মুদ্রা নিয়ে ১২ই জানুয়ারিতেও এসেছিল এবং দশ দিন থাকার পর ফিরে গেছিল করাচিতে। আয়ুব নামে আর এক পাক নাগরিক (পাসপোর্ট নং ১১৩৬৬৫২) ১৩ই ফেব্রুয়ারি ৭০,৪১,৫০০ টাকার জাল ভারতীয় নোট নিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিল। জাল
বাংলাদেশি ভিসা নিয়ে সে ঢাকায় এসেছিল। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিমানবন্দর থেকে ৬৯.৯৭ লক্ষ টাকার জাল ভারতীয় নোট সহ মুহম্মদ আলি নামে এক জন বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হয়। ভুয়ো ট্রাভেল পারমিট নিয়ে সে পি আই এর একটি ফ্লাইটে করাচি থেকে ঢাকায় এসেছিল।


একই ভাবে গত বছরের ২৭শে অক্টোবর ঢাকা বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়েছিল পাক নাগরিক আশরফকে.৭৫ লক্ষ টাকার জাল ভারতীয় নোট উদ্ধার হয়েছিল তার থেকে। থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট ধরে ব্যাংকক থেকে এসেছিল সে। ২০১৪ সালের ১৮ই অক্টোবর আর এক জন পাক নাগরিক-মুহাম্মদ নুর উল আলম বাবা এক কোটি টাকার ভুয়ো ভারতীয় নোট নিয়ে ধরা পড়েছিল। দুবাই থেকে এমিরেটস ফ্লাইট ধরে সে এসেছিল।


৩০শে অগাস্ট, ২০১৪ ঢাকার শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে কাস্টমস অফিসারেরা বাংলাদেশি নাগরিক খলিল ব্যাপারিকে ১.৬৫ কোটি টাকার ভুয়ো ভারতীয় নোট সহ আটক করেন। করাচি থেকে দুবাই হয়ে সে ঢাকায় এসেছিল। কম্বলে ঢাকা একটি কার্টনের মধ্যে নোটগুলি ছিল ।

ভুয়ো ভারতীয় মুদ্রা পাচারে পাকিস্তানের জড়িত থাকার কথা সে দেশ থেকে কখনওই স্বীকার করা হয়নি অথবা সেখানকার বৃহৎ কোনও সংবাদমাধ্যমেও এ ব্যাপারে  খবর প্রকাশিত হয়নি। এমন কি গত মাসে   ঢাকায় পাকিস্তান হাই কমিশনের কনসুলার
সেকশনের অ্যাটাশে মহম্মদ মাজহার খানকে ভুয়ো ভারতীয় মুদ্রা-পাচার চক্র চালানোর জন্য ফেরত পাঠানোর পরেও তিনি যে এই ধরণের কাজে যুক্ত ছিলেন, তা অস্বীকার করেছে পাকিস্তানের বিদেশ অফিসে।  অনভিপ্রেত কাজে কূটনীতিকের যুক্ত থাকার ব্যাপারে পাকিস্তানের সংবাদপত্রও বিস্ময়জনক ভাবে নীরব।


খবরে প্রকাশ, অপরাধীদের হাত দিয়ে খোলা বাজারে জাল নোট ছড়িয়ে দিতে কূটনীতিকদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান বছরে দশ হাজার কোটি টাকার ভুয়ো ভারতীয় নোট ছাপাচ্ছে। বিস্ময়ের ব্যাপার,  পাকিস্তানে কোনও দিন কোনও ভুয়ো নোট ধরা পড়েনি, যদিও অন্য দেশে তা বারংবারই হয়েছে এবং তার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি বাহকদের জড়িত থাকার ব্যাপারটি পরিষ্কার ভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এটিও প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, বেশির ভাগ সময় পাকিস্তান এবং দুবাই-এর ফ্লাইটেই তারা আসত, যে দু\'টি জায়গায় আই এস আই-এর প্রবল উপস্থিতি আছে।  বাংলাদেশের মাটিকে ব্যবহার করে  এ ধরণের সমস্ত ভারতবিরোধী অপকর্ম আর ঘটতে না দেওয়ার ব্যাপারে  দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেছে শেখ হাসিনার সরকার। পরিষ্কার ভাবে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশকে ব্যবহার করে চালানো এই সব পাকিস্তানি অপকর্মকে আর ঘটতে দেবেনা বাংলাদেশ সরকার।




Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics