Column
আইএসআইএস, আল কায়দা এবং বাংলাদেশ

24 Mar 2015

#

একটি সাধারণ ধারনা বেশির ভাগ মানুষের মধ্যেই চালু আছে যে, বাঙলাদেশের জঙ্গি ইসলামিরা স্থানীয় ভাবে সংগঠিত,

 ইসলামি ঝাঁঝ এবং জিহাদি উদ্দীপনার দিক দিয়ে তারা আরব এবং পাকিস্তানের জঙ্গিদের মত নয়, বাইরের সাহায্য তারা অনেক কম পেয়ে থাকে এবং অতটা দায়বদ্ধ নয় তারা। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলী, বিশেষত মানবতাবাদী ব্লগার অভিজিত রায়ের নৃশংস হত্যা এই ধারনাকে ভুল প্রমাণ করে। 

জানুয়ারি ১৯, ২০১৫ তারিখে আতঙ্ক জাগানো সংগঠন, ইসলামিক স্টেট অফ ইরান অ্যান্ড সিরিয়া(আই এস আই এস)-র বাংলাদেশ কোঅর্ডিনেটার মহম্মদ সাখাওয়াতুল কবীর এবং আরও তিন জন সন্দেহভাজন আইএসআইএস  সদস্যকে ঢাকার যাত্রাবাড়ি এবং খিলখেত অঞ্চল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিটেক্টিভ বিভাগের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেছেন, ইসলামি জঙ্গি আন্দোলন সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণের প্রচারপত্র পাওয়া গেছে ধৃতদের কাছ থেকে। এ ছাড়াও তাদের সঙ্গে থাকা ল্যাপটপ, জঙ্গি প্রশিক্ষণের ব্যাপারে  বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট, পাকিস্তানি দূতাবাসের  ভিসা-আবেদন পত্র এবং অন্যান্য আপত্তিকর জিনিষ আটক করা হয়েছে। এ খবর বহুল প্রচারিত পাকিস্তানি দৈনিক ডনের।


 আলম আরও বলেছেন, জেরায় কবীর কবুল করেছে, ঢাকা থেকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের যে সেলটি সে চালাত, সেটি বাংলাদেশে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর উপর বড় রকমের আক্রমণ হানার জন্য প্রয়োজনী অর্থ এবং অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনা করছিল। সে এ কথাও জানিয়েছে যে, দলের জঙ্গিরা সবাই পাকিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বেশ কয়েক বার পাকিস্তানে যাওয়া কবীর নিজে সেখান থেকে অস্ত্রশিক্ষা এবং উৎসাহ পেয়েছে। শুধু তাই নয়, সেখানে জাভেদ আখতার ইজাজের অধীনে আল কায়দার হয়ে কাজও করেছে সে। আরও জানা গেছে যে, এই জাভেদ আখতার ইজাজ ২০০৯ সালে বাংলাদেশে জঙ্গিদের উপর ধরপাকড় চলার সময় পাকিস্তানে পালিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে দক্ষিন এশিয়ায় আল কায়দার করাচি কমান্ডার হয় সে। 

কবীর এবং তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া অন্য তিন জন এর আগে বাংলাদেশের  উগ্রপন্থী ইসলামি  সংগঠন জামায়েতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। আইএসআইএস-এর আবির্ভাবের পর জে এম বি-র সব সদস্যই এখন এই সংগঠনের ছাতার তলায় যাচ্ছে। 
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতায় দু\'জন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র সহ চার জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। আইএসআই-তে যোগ দিতে এরা সবাই যাচ্ছিল বাংলাদেশে। তাদের দেওয়া বিবৃতি থেকে পরিষ্কার  যে, বাংলাদেশ ঘাঁটি গেড়ে বসে ভারতীয় উপমহাদেশে তরুণ কর্মী নিয়োগ করছে আইএসআইএস-এর কিছু লোক। ধৃতরা জানিয়েছিল যে তাদের সঙ্গে আই এস আই-এর যোগ আছে এবং বাংলাদেশে আই এস আই এস-এর সেল ও সেগুলি কোথায় কোথায় সক্রিয় সে বিষয়ে তাদের কাছে নির্দিষ্ট খবর আছে। 

বাংলাদেশের গোয়েন্দারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, জামাত এবং হিফাজত-এ-ইসলাম, হরকত-উল-জিহাদ-আল ইসলামি, হিজবুত-তাহির, আনসারুল্লা বাংলা টিম, জে এম বি-র মত আরও কিছু চরমপন্থি ইসলামি সংগঠনের সহায়তায় সে দেশে তাদের কাজকর্ম চালাচ্ছে আই এসআইএস সেল। এই সব সংগঠনই বাংলাদেশে খলিফার শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। 

ভারতীয় উপমহাদেশে শাখা খোলার কথা বলে যখন আল কায়দা সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সেই সময় দিয়েই আইএসআইএস-এর জঙ্গিরাও এই অঞ্চলে তাদের চক্র সংগঠিত করতে তৎপর কাজকর্ম চালাচ্ছে। খবরের সূত্র অনুযায়ী মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশের কিছু চরমপন্থি দল আইএসআইএস-এর চাঁইদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে তাদের সমর্থন জানিয়েছে। এর আগে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি আল কায়দা-প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরির একটি অডিও টেপে বাংলাদেশ সরকারকে এই বলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল যে, \'ইসলামি শাস্ত্রজ্ঞদের নির্বিচার হত্যা\' এবং \'অন্যান্য ইসলাম  বিরোধী কাজ\' বন্ধ না করা হলে তার পরিণাম হবে সাংঘাতিক। এই অডিও টেপ প্রকাশ পাওয়ার পর বাংলাদেশে আল কায়দা এবং তার অনুগত দলগুলির কতটা উপস্থিতি আছে, তা নিয়ে বিরাট বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। "বাংলাদেশঃ ম্যাসাকার বিহাইন্ড আ ওয়াল অফ সাইলেন্স\' নাম দেওয়া এই অডিওটিতে \'শাহবাগের ইসলাম বিরোধী নিরীশ্বরবাদী আন্দোলন এবং ইসলামি প্রতিবাদকারীদের উপর নিরাপত্তাবাহিনীর অত্যাচার\'-এর কথা বলা হয়েছিল। তাঁর বিবৃতিতে বাংলাদেশে শরিয়া-নির্ভর খলিফা অথবা ঈশ্বরের শাসন চালু করার কথাও বলেছেন জাওয়াহিরি। 

এখন আল কায়দার মতই আইএসআইএস-ও কোনও অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা বিশ্বে ইসলামের স্বার্থ রক্ষার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে কর্মী নিয়োগের দিকে ঝুঁকছে। এই দু\'টি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী দলেরই এক আদর্শ-খলিফা রাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করা। বাংলাদেশের বর্তমান উত্তপ্ত ধর্মীয় পরিবেশ তাই এই দেশের দিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীদের নজর টেনেছে। এই \'আল্লার শাসন\'-এর জন্য প্রচার-আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে জেএম বিকে যে আল কায়দা আর্থিক সাহায্য দিয়েছিল, সেই তথ্যপ্রমাণ বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলির কাছে আছে। বাংলাদেশে তালিবান ধাঁচের ইসলামি বিপ্লব ঘটানোর উদ্দেশ্য নিয়ে ২০০২ সালে জেএমবি গঠন করা হয়। ২০০৫ সালে দেশজুড়ে একই সঙ্গে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো এবং এর পরে আত্মঘাতী মানব বোমা-আক্রমণে ৭০ জন মানুষের মৃত্যুর পিছনে ছিল  এই জেএমবির জঙ্গিরা । এরাই এখন আবার তাদের গোপন  আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে, জাওয়াহিরির বার্তায় এবং আইএসআই-এর কাজকর্মে উৎসাহিত হয়ে। নিজেদের পুনর্গঠিত করে সংগঠনকে আবার চাঙ্গা করে তোলার কাজে লেগেছে এরা। 

সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হুজিও আল কায়দার ধাঁচেই গঠিত হয়েছিল। এদেরও লক্ষ্য ইসলামি বিপ্লব ঘটানো। আফগানিস্তানে গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের হিজব-এ-ইসলামিকে সাহায্য করতে বাংলাদেশ থেকে ৫০০০ মুজাহিদিনকে পাঠিয়েছিল এরা। পরে, ১৯৯৫ সালে গুলবুদ্দিনকে ত্যাগ করে তালিবান শিবিরে যোগ দেয় এরা।

আমেরিকার বিরুদ্ধে \'পবিত্র যুদ্ধ\' ঘোষণা করে \'ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফ্রন্ট ফর জেহাদ এগেনস্ট জু\'স অ্যান্ড ক্রুসেডার্স\'-এর জারি করা ১৯৯৮ সালের ফতোয়ায় হুজি নেতা ফজলুল রহমানের স্বাক্ষর থাকাই আল কায়দার সঙ্গে বাংলাদেশ-ভিত্তিক এই সন্ত্রাসবাদী দলের যোগাযোগের কথা প্রমাণ করে। ঐ ফতোয়ায় অন্যান্য স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন আল কায়দার তৎকালীন শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেন স্বয়ং এবং জাওয়াহিরি এবং সেই সঙ্গে ইজিপশিয়ান ইসলামি গ্রুপের রিফাত আহমেদ তাহা আবু ইয়াসির এবং জামায়েতুল উলেমা-এ-পাকিস্তানের সেক্রেটারি শেখ মির হাম্মা। ২০০৮ সালের ৫ই মার্চ আমেরিকার স্বরাষ্ট্র দপ্তর একটি আদেশনামায় হুজিকে একটি বিদেশি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন এবং বিশেষ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত করে।

আল কায়দার অনুগামী আর একটি সংগঠন-আনসারুল্লা বাংলা টিমের কাজকর্মও সম্প্রতি সবার নজরে এসেছে। ২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি শাহবাগ আন্দোলনের কর্মী রাজীব হায়দারকে নৃশংস ভাবে খুন করে খবরের    শিরোনামে আসে এই চরম জঙ্গি সংগঠনটি। হায়দার হত্যার চক্রীদের মধ্য থাকা সালমান ইয়াসের মাহমুদ আগে জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের কর্মী ছিল। আনসারুল্লা বাংলা টিমের কর্মীরা তাদের দলের প্রধান এবং আধ্যাত্মিক নেতা মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানির ভাষণে প্রবল উদ্দীপনা বোধ করে। রাজীব হত্যার পর পুলিশ এই রহমানি এবং তাঁর ৩০ জন অনুগামীকে  বরগুনা জেলার দক্ষিন খেজুরতলার একটি গোপন আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল। রহমানি নিজে আল কায়দার ইয়েমেনি আধ্যাত্মিক নেতা আনোয়ার আল-আওলাকির অনুগামী। এই আওলাকি ২০১১ সালে আমেরিকান ড্রোন আক্রমণে নিহত হন। দলের তরুণ কর্মীদের উদ্দীপ্ত করতে রহমানির জুড়ি নেই। তাঁর ভাবশিষ্যদের মধ্যে রয়েছে কাজি মহম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নফিস, যে ২২ বছর বয়সী বাংলাদেশিকে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সামনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর চক্রান্ত করার জন্য সম্প্রতি ৩০ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে  এবং তার বাইরেও রহমানির অধীনে ৪০০০ জন জঙ্গি রয়েছে, যারা সকলেই সশস্ত্র। 

২০১৩ সালে জাওয়াহিরি এবং আল কায়দার আন্তর্জাতিক চক্রে থাকা ২০ জন সদস্যের মধ্যে হওয়া একটি কনফারেন্স কল ধরে ফেলে। এর পরেই ব্যাপক হানার আশঙ্কা করে মুসলিম রাষ্ট্রগুলিতে থাকা তাদের দূতাবাসগুলি বন্ধ রাখে আমেরিকা এবং তাদের মিত্র দেশগুলি। ঢাকার আমেরিকান দূতাবাসও ২০১৩ সালের ১লা অগাস্ট বন্ধ রাখা হয়েছিল সেই একই কারনে।

হঠাত করে বাংলাদেশে তাদের দূতাবাস এক দিনের জন্য বন্ধ রাখা থেকেই বোঝা  যায় যে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এক ঘরে হয়ে পড়ার সম্ভাবনাই এখন বাংলাদেশের সামনে প্রকৃত বিপদ।  বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার সম্মানের ক্ষেত্রে যে বিপদ এখন দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে, শিকড় গাড়ার আগেই তার মূলোচ্ছেদ করুক দেশের সরকার।



Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics