Column
আরও এক জন ব্লগারকে খুন করল জঙ্গি ইসলামিরা

22 Apr 2015

#

মার্চ মাসের ৩০ তারিখে ঢাকার রাজপথে দিনদুপুরে ইসলামি উগ্রপন্থীদের হাতে খুন হয়ে গেলেন ২৬ বছর বয়সী ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু।

 মাংস কাটার দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় তাঁকে। ইসলামের নামে হিংসাত্মক কার্যকলাপের সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন এই তরুণ ব্লগার।  তিন জন আততায়ীর মধ্যে দু\'জনকে এই নৃশংস হত্যাকান্ডের পরেই স্থানীয় মানুষজন ধরে ফেলে  পুলিশের হাতে তুলে দেয়, আর এক জন পালিয়ে গেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে বাবুকে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। 


ঠিক একই ভাবে আমেরিকায় বসবাসকারী ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশি ব্লগার অভিজিত রায় খুন হওয়ার এক মাসের মধ্যেই ঘটল বাবুর হত্যাকান্ড। অভিজিতের হত্যা সারা পৃথিবীতে ক্ষোভ আর নিন্দার ঝড় তুলেছিল। ২৬শে ফেব্রুয়ারি  ঢাকার একটি বই মেলা থেকে বেরিয়ে আসার  সময় আক্রমণ করা হয় তাঁকে। অভিজিতের সঙ্গে থাকা তাঁর স্ত্রী রফিদা বন্যা আহমেদও আক্রমণকারীদের বাধা দিতে গিয়ে মাথায় আঘাত পান এবং একটি আঙুল কাটা যায় তাঁর।


বাবুর হত্যাকারীদের মধ্যে অন্যতম একজন, ২০ বছর-বয়সী জিকরুল্লাহ, চট্টগ্রামের সুপরিচিত কোয়ামি মাদ্রাসা পরিচালিত হাথাজারি মাদ্রাসার এক জন ছাত্র। জিকরুল্লাহ জানিয়েছে, বাবু ইসলাম ধর্মের সব থেকে শ্রদ্ধেয় পুরুষ পয়গম্বর মহম্মদের অবমাননা করেছিল বলেই তারা তার উপর আক্রমণ চালিয়েছে। "ও আমাদের পয়গম্বরকে অবমাননা করেছিল, তাই মেরেছি ওকে," সে বলেছে। জিকরুল্লাহ জানিয়েছে বাবুকে খুন করার জন্যই সে চট্টগ্রাম থেকে এতটা পথ এসে ঢাকার একটি মসজিদে এক রাত কাটিয়েছিল। 


আরিফুল ইসলাম নামের ধৃত অপর আততায়ীও ২০ বছরের এবং সেও কোয়ামি মাদ্রাস-অধীনস্থ মিরিপুরের দারুল উলুম মাদ্রাসার পড়ুয়া। এরা দু\'জনে তৃতীয় আক্রমণকারীর নাম জানিয়েছে, যদিও সে ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমের কাছে কিছু জানানো হয়নি। একের পর এক এই আক্রমণের ঘটনা বাংলাদেশে হিংস্র উগ্রপন্থার বাড়বাড়ন্তের শংকা জাগিয়ে তুলেছে। 


সুপরিচিত শাহবাগ আন্দোলন-কর্মী এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তা ইমরান এইচ সরকার বলেছেন, "বাবু শুধুমাত্র ফেসবুকেই লিখত। ইসলামি উগ্রপন্থার সমালোচনা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের সমর্থনে লিখত সে।" সরকার, যিনি \'ব্লগার অ্যান্ড  অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্ক\'-এর প্রধান, বলেন, বাবু \'কুৎসিত হাঁসের ছানা\' ছদ্মনামে তার লেখাগুলি লিখত। "সে ছিল এক জন মুক্ত চিন্তার মানুষ, যার একটি প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এবং যে ছিল ধর্মীয় মৌলবাদের বিরোধী।"


সাম্প্রতিক কালে দেখা যাচ্ছে, ইসলামি উগ্রপন্থীরা বেছে বেছে ধর্মনিরপেক্ষ এবং প্রগতিশীল লেখকদের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে, যদিও বাংলাদেশকে একটি শরিয়া-ভিত্তিক ঈশ্বর-প্রতিভূ শাসিত রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাওয়া ইসলামি চরমপন্থীদের উপর ধরপাকড় চালাচ্ছে দেশের সরকার। 

 

২০১৩ সালে ঢাকায় খুন হয়েছিলেন ব্লগার রাজীব আহমেদ হায়দার। উনিশশো একাত্তরের প্রমাণিত ঘাতকদের চরম শাস্তির দাবিতে একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এর আগে, ২০০৪ সালে প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনার জন্য সুপরিচিত অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের উপরেও ইসলামি চরমপন্থীরা আক্রমণ চালিয়েছিল। ঢাকার একটি বই মেলা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। আজাদ পরে জার্মানিতে মারা যান।


দেখা গেছে যে, প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার মানুষ এবং ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের উপর সব কটি আক্রমণই করেছে কোয়ামি মাদ্রাসার ছাত্ররা। 


কোয়ামি মাদ্রাসা গোঁড়া ইসলামি পথ অনুসরণ করে ছাত্রদের শিক্ষা দেয়। তাদের মাদ্রাসাগুলিতে শুধুই হাদিস এবং তফসির-এ-কোরান পড়ানো হয়। শুধুই গোঁড়া ধর্মীয় শিক্ষায় আবদ্ধ থাকা এখানকার ছাত্ররা তাই ধর্মান্ধ হয়ে ওঠে। 


এই মাদ্রাসাগুলিতে \'স্বাধীনতা দিবস\', \'বিজয় দিবস\', \'ভাষা শহিদ দিবস\' এবং \'শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস\'-এর মত জাতীয় দিবসগুলি পালন করা হয়না। বস্তুতপক্ষে এ সব জায়গায় এমন কি স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করা এবং একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়ার মত কাজকে গৌরবান্বিত করে সেগুলিকে জিহাদের অঙ্গ হিসেবে দেখানো হয়। এই সব প্রতিষ্ঠানগুলিতে কোনও দিনই জাতীয় দিবস অথবা অন্যান্য বিশেষ দিনে জাতীয় পতাকা তোলা হয়না, মাদ্রাসা চত্বরের মধ্যে  ছাত্রদের ছাত্রদের গাইতে দেওয়া হয়না জাতীয় সংগীত। 


এই সব মাদ্রাসাগুলির উপর সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ অথবা নজরদারি নেই। সরকার থেকে এরা কোনও টাকা পায়না। যাদের আর্থিক সাহায্যের উপর এই মাদ্রাসগুলি সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল, তারা স্থানীয় ও অনাবাসী বাংলাদেশি ব্যক্তি গোষ্ঠী এবং স্থানীয়/আন্তর্জাতিক ইসলামি এনজিও। বিএনপি-জামাতের শেস শাসনকালে গোয়েন্দা সংস্থাগুলি দশটি বিদেশি ইসলামি সংগঠনকে চিহ্নিত করেছিল, যাদের থেকে  নিয়মিত ভাবে অর্থ সাহায্য আসত এইসব মাদ্রাসায়। 


পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব এবং মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলি থেকে জঙ্গি ইসলামি সংগঠনগুলির নেতারা কর্মী নিয়োগের জন্য প্রায়ই আসেন এই সব মাদ্রাসাগুলিতে। কিছু ছাত্রকে বেছে নিয়ে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলিতে। 


এই রকম বহু মাদ্রাসাতেই ছাত্রদের অস্ত্রশিক্ষা দেওয়া হয় এবং তা করা হয় রাতে, লোকের নজর এড়াতে। এর রকম কিছু অস্ত্রশিক্ষা শিবির পার্বত্য চট্টগ্রামের দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় অথবা গভীর জঙ্গলের ভিতর, নিরাপত্তা বাহিনী অথবা পুলিশের নাগাল এড়িয়ে।


কুয়েত-কেন্দ্রিক রিভাইভাল অফ ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটি সহ আন্তর্জাতিক ইসলামি এনজিওগুলি, আমেরকায় ৯/১১-এর আক্রমণের পর পাকিস্তানে যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, আল কায়দার সঙ্গে যোগ থাকার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র নিষিদ্ধ হওয়া সৌদি আরবের আল হারমেইন ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং আরও অনেক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন এই সব কোয়ামি মাদ্রাসগুলিকে অর্থের জোগান দিত। এই ব্যাপারে আরও যে সব ইসলামি এনজিও গোয়েন্দা সংস্থাগুলির নজরে এসেছে, সেগুলির মধ্যে আছে ইউ আ ই-র আল ফুজেইরা, সৌদির রাবেতা আল আলম আল ইসলামি (ওয়ার্ল্ড মুসলিম লিগ) এবং ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক রিলিফ অর্গানাইজেশন।


এই সব মাদ্রাসগুলিতে ছাত্রদের বিনা পয়সায় খাবার, থাকার জায়গা এবং শিক্ষা দেওয়া হয়। এই পড়ুয়াদের প্রায় সবার অভিভাবকরা দরিদ্র এবং একনিষ্ঠ মুসলমান। তাঁদের বোঝানো হয় যে এই সব মাদ্রাসায় ছেলেদের পাঠালে ইসলামি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জাতির পুনর্জাগরণ ঘটবে। 


ইসলামি শিক্ষার নামে ঠিক কী হয় এই সব কোয়ামি মাদ্রাসগুলির ভিতরে, তা খুব কঠোর ভাবে গোপন রাখা হয়। তবে ঢাকার কাছে কদমতলির তালিমুল কুরান মাদ্রাসার একটি ন\' বছরের ছাত্র, জান্নাতুল ফেরদৌসের বাবা-মা\'র কাছ থেকে জানা গেছে যে, ২০১২ সালের ১লা মে ঐ মাদ্রাসার একজন শিক্ষক অগ্নিতপ্ত একটি খন্তা দিয়ে জান্নাতুল এবং আরও ১৩ টি বাচ্চার পায়ে ছ্যাঁকা দিয়ে দিয়ছিলেন। কারন দিনে পাঁচ বার নমাজ না পড়া এবং সেই অপরাধের জন্য \'দোজখের আগুনের অভিজ্ঞতা\' লাভ করে।


এই সব মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ছাত্ররা মসজিদ/মাদ্রাসা ছাড়া  অন্য কোথাও চাকরি পায়না এবং শেষ পর্যন্ত জঙ্গি ইসলামি দলের সদস্য হয়ে ইসলামি পুনর্জাগরণের নামে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হিংসাত্মক, নাশকতামূলক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ে। এই সব মাদ্রাসগুলিকে সরকারী শাসনাধীনা আনার প্রচেষ্টা এখনও পর্যন্ত সফল হয়নি। 




Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics