Column
পাকিস্তানের অপরিণামদর্শী খেলা

11 Jan 2016

#

পাকিস্তান-রাজধানীর সন্নিকটে মুরি হিল রিজর্টে শীতের মরসুমে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কও এখন শৈত্যের কবলে। আজকের বাংলাদেশ চার দশকেরও বেশি সময় আগে এই পাকিস্তানেরই অঙ্গ ছিল, যার থেকে বেরিয়ে এসে প্রস্তর যুগের মানুষের মত জীবন কাটানো, অথচ প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী বালুচিস্তানের মানুষের কাছে আজ আদর্শ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের শীতলতা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, বাংলাদেশের কূটনীতিক মৌসুমি রহমানকে বহিষ্কার করা হলেও তা যেন আর বিস্ময়ের বিষয় নয়। তবে  মনে করা হচ্ছে যে,  ভূয়ো ভারতীয় নোট  এবং সন্ত্রাসবাদীদের টাকা যোগান দেওয়ার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য যে অবমাননা হয়েছে পাক কূটনীতিক ফারিনা আরশাদের, তাতে হাঁটু কেঁপে গেছে পাকিস্তানের।

বাংলাদেশের ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালে চলা যুদ্ধাপরাধ বিচারের ফলেও প্রকৃত সমস্যার সমাধান হয়নি। এই ট্রাইব্যুনাল আলি আহসান মহম্মদ মোহাজিদ, সালাহুদ্দিন কাদের চৌধুরি এবং মতিউর রহমান নিজামির প্রাণদন্ডের হুকুম দিয়েছে। কিন্তু এর ফলে একটি নতুন প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে।
যা করেছেন ফারিনা, তা কেন করলেন তিনি ? উত্তর খুব সোজা।  ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে তৎকালীন লেঃ জেনারেল এ এ কে নিয়াজি ভারতীয় সেনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের যে দলিলে সই করেছিলেন তা আর দ্বিতীয়বার খতিয়ে দেখেনি পাক সেনাবাহিনী।

 

পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, "তাতে কী ?" এবং সেই সঙ্গে এ কথাও বলতে পারেন যে, সেই সময়ের পর তো গঙ্গা-পদ্মা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। ঠিকই, তবে এ ক্ষেত্রে একটি বৃহত্তর বিষয় ভুলে যাওয়া হবে।  বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতা ওলটালে কী দেখা যাবে ? পাকিস্তানের আদি ও অকৃত্রিম গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই সময় সময় বাংলাদেশে সরকারের একাংশকে নিজেদের মত চালিত করেছে। আর এই কাজটি করা হয়েছে দুবাইয়ের মাটি থেকে, যে দুবাই কার্যত  পাকিস্তানের নেতা এবং ব্যবসায়ীদের কাছে দ্বিতীয় রাজধানী হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের প্রচেষ্টার ফল অনেক সময়েই তারা পেয়েছে, কারণ বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন অনেকেরই তাঁদের 'পুরনো বন্ধু'দের কাছে কিছু ঋণ রয়ে গেছে।

 

বাংলাদেশের ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালে চলা যুদ্ধাপরাধ বিচারের ফলেও প্রকৃত সমস্যার সমাধান হয়নি। এই ট্রাইব্যুনাল আলি আহসান মহম্মদ মোহাজিদ, সালাহুদ্দিন কাদের চৌধুরি এবং মতিউর রহমান নিজামির প্রাণদন্ডের হুকুম দিয়েছে। কিন্তু এর ফলে একটি নতুন প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে। এবার কি ১৯৭১-এর  সব অপরাধীদেরই জবাবদিহি করার কথা বলা হবে ? যে গণহত্যায় এরা অংশ নিয়েছিল, হামিদুর রহমান কমিশন তার নিষ্ঠুর চিত্র তুলে ধরলেও এই শয়তানেরা বেঁচে গিয়েছিল। শাস্তি হওয়া দূরের কথা, হাতে দেশের মানুষের রক্তের দাগ নিয়েও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আরামে জীবন যাপন করেছে এরা। 

 

ছোট করে বলতে হলে বলতে হয়, পাকিস্তানি শাসনযন্ত্র জে এম বি অথবা তাদের প্রতিভূ আল্লাহর দল, হিজব-এ-আমির আবু ওমর এবং আল ফিরদৌসের মত সংগঠনগুলির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে অবমাননা করার উপায় পেয়ে গিয়েছিল।  সৌদি আরব তাদের বিশ্বব্যাপী ওয়াহাবি প্রচারের অঙ্গ হিসেবে এই উদ্যোগকে সমর্থন যুগিয়ে গেছে। তার ফলঃ ইসলামি চরমপন্থার শক্তিশালী হয়ে ওঠা। পাকিস্তানি ব্লগার নর্মান আনসারি সম্প্রতি করাচির 'দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন'-এ লিখেছেনঃ "চরমপন্থা নামক পিৎজাটির রন্ধন হয়েছে সৌদি আরব থেকে আমদানি করা জিনিষ দিয়ে।" তিনি আরও বলেছেন, "আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং তার থেকেও দূরবর্তী জায়গায় পৌ*ছে দেওয়া সুটকেস ভর্তি টাকা দিয়ে এবং ইসলামের বিকৃত রূপ প্রচার করে সৌদি আরব মুসলমান তরুণদের মগজ ধোলাই করছে।"

 

ফারিনা আরশাদের ঘটনাটি থেকে পরিষ্কার, বাংলাদেশের জঙ্গি, চরমপন্থী সংগঠনগুলির জন্য অর্থ এবং অন্য অনেক কিছু সরবরাহ করছে আই এস আই। শেখ মুজিবুর রহমানের বংশধর, যাঁরা দেশবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন এবং প্রয়াত নেতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে উদ্যোগী,   তাঁদের সঙ্গে হিসেব চোকানোর পাকিস্তানি মতলব হাসিল করাই আই এস আই-এর উদ্দেশ্য।

 

যে ভাবে মৌসুমি রহমানকে বাংলাদেশ ফিরে যেতে বলা হল, তার থেকে বোঝা যায়, পাকিস্তান কোনও রকম কূটনৈতিক শিষ্টাচার শেখেনি। জানুয়ারি মাসের পাঁচ তারিখের অপরাহ্নে বাংলাদেশের হাই কমিশনার সুহরাব হোসেনকে পাকিস্তানের বিদেশ অফিসে ডেকে নিয়ে এসে খুব সংক্ষেপে বলা হয়, মৌসুমিকে পাকিস্তান ছাড়তে হবে। কোনও রকম কারণ না দর্শিয়েই এই কূটনীতিককে অবাঞ্ছিত হিসেবে ঘোষণা করে পাকিস্তান। বাংলাদেশ মিশনে কাউন্সেলর (রাজনৈতিক) এবং চ্যান্সেরি প্রধান ছিলেন মৌসুমি। কী অন্যায় করেছিলেন তিনি যে, এ রকম অগৌরবের সঙ্গে বহিষ্কার করা হল তাঁকে ? 

ফারিনা আরশাদের ঘটনাটি থেকে পরিষ্কার, বাংলাদেশের জঙ্গি, চরমপন্থী সংগঠনগুলির জন্য অর্থ এবং অন্য অনেক কিছু সরবরাহ করছে আই এস আই। শেখ মুজিবুর রহমানের বংশধর, যাঁরা দেশবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন এবং প্রয়াত নেতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে উদ্যোগী, তাঁদের সঙ্গে হিসেব চোকানোর পাকিস্তানি মতলব হাসিল করাই আই এস আই-এর উদ্দেশ্য।

 

ঠিক এর বিপরীত ব্যবহার করা হয়েছে 'অবাঞ্ছিত' পাকিস্তানি কূটনীতিক ফারিনার সঙ্গে। পাকিস্তান হাই কমিশনে ফারিনার পদ ছিল সেকেন্ড সেক্রেটারি (পলিটিকাল)। জঙ্গি দলের সঙ্গে তাঁর বৈঠক এবং আর্থিক দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারে নজরে ছিলেন এই কুটনীতিক। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর এক জে এম বি জঙ্গিও এই ব্যাপারে অনেক তথ্য দিয়েছে। ফারিনার কার্যকলাপ সম্পর্কে পাকিস্তানকে অবহিত করা হয়, জানানো হয় প্রতিবাদ এবং তারপর গত বছরের ২৩শে ডিসেম্বর তাঁকে ঢাকা থেকে সরিয়ে নিতে বলা হয়। কোনও নাটক করা হয়নি। সরকারি ভাবে কোনও ঘোষণাও করা হয়নি। এক জন অবাঞ্ছিত কূটনীতিকের ব্যাপার এ ভাবেই কাজ করে একটি সভ্য রাষ্ট্র।

 

মৌসুমি রহমানের বহিষ্কার আর সুপ্রিম কোর্টে জামাত-এ-ইসলামি প্রধান এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করা মতিউর রহমান নিজামির প্রাণদন্ডের আদেশ বহাল থাকার ঘটনা একই সঙ্গে ঘটেছে। যে সব অভিযোগ নিজামির বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে, তা যে কোনও সভ্য সমাজের মাথা লজ্জায় হেঁট করে দেবে। এই সব অভিযোগগুলির মধ্যে আছে ৪৫০ জন মানুষকে খুন করা, পাবনার বাউশগাড়ি এবং ডেমরায় ৩২ জন নারীকে ধর্ষণ করা, পাবনা ধুলাউড়াতে তিন জনকে হত্যা করা এবং বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা।

 

অতীতের মিত্রদের করা এই সব অপরাধগুলির কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়তো পাকিস্তানের পছন্দ নয়, কিন্তু নিজামির হয়ে লড়ার নৈতিক ক্ষমতা কি তারা রাখে, বিশেষত, যখন তার থেকে অনেক কম অপরাধ করা বহু পাকিস্তানি পবিত্রভূমি সৌদি আরবে প্রতি মাসে ফাসির দড়িতে ঝুলছে?




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics