Column
অভিবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের ফেরত পাঠালো সিঙ্গাপুর

02 Feb 2016

#

সম্প্রতি, জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখে, সিঙ্গাপুর ২৬ জন অভিবাসী বাংলাদেশি মুসলমান শ্রমিককে ফেরত পাঠিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইসলামি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল কায়দা এবং ইসলামিক স্টেটের সমর্থক তারা। সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এরা মধ্যপ্রাচ্য এবং বাংলাদেশে সশস্ত্র জিহাদ করার পরিকল্পনা করছিল।

ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, "আমরা জানতে পেরেছি এই ব্যক্তিরা জঙ্গি ইসলামি যাজক এবং আনসারুল্লা বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানের অনুগামী। পুলিশ জানতে পেরেছে যে, এর সবাই উগ্রপন্থী সংগঠন আনসারুল্লা বাংলা টিমের সদস্য।"


সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে, তারা ২০১৩ সাল থেকে একটি সঙ্ঘবদ্ধ স্টাডি গ্রুপের সদস্য ছিল এবং আমেরিকা-জাত চরমপন্থী ইসলামি যাজক আনওয়ার আল-আওয়ালকির প্রচার-বাণীর সমর্থক ছিল এরা। সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের কাছে এরা স্বীকার করেছে যে, সাম্প্রতিক মাসগুলিতে শিয়াদের হত্যাকারী বাংলাদেশি জঙ্গি বাহিনীকে সমর্থন করে তারা, কারণ তাদের চোখে শিয়ারা 'বিপথগামী।'
সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে, তারা ২০১৩ সাল থেকে একটি সঙ্ঘবদ্ধ স্টাডি গ্রুপের সদস্য ছিল এবং আমেরিকা-জাত চরমপন্থী ইসলামি যাজক আনওয়ার আল-আওয়ালকির প্রচার-বাণীর সমর্থক ছিল এরা। সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের কাছে এরা স্বীকার করেছে যে, সাম্প্রতিক মাসগুলিতে শিয়াদের হত্যাকারী বাংলাদেশি জঙ্গি বাহিনীকে সমর্থন করে তারা, কারণ তাদের চোখে শিয়ারা 'বিপথগামী।'


এই আনসারুল্লা বাংলা টিম আল কায়দার মদতপুষ্ট একটি অতি চরমপন্থী জঙ্গি সংগঠন। ২০১৩ সালে্র ১৫ই ফেব্রুয়ারি নিরীশ্বরবাদী ব্লগার এবং শাহবাগ আন্দোলনের কর্মী আহমেদ রাজীব হায়দারকে নির্মম ভাবে হত্যা করে এরা প্রথম নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছিল।


তবে তারও আগে, ওই বছরেরই মার্চে, ঢাকার একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ জন ছাত্রকে পুলিশি জজ্ঞাসাবাদের সময় এবিটির অস্থিত্বের কথা জানা গিয়েছিল।রাজীব হায়দারের হত্যার সূত্রে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এদের। .

এর পরে পুলিশ আল কায়দার মদতে চলা ওয়েবসাইট, 'আনসার আল মুজাহিদিন ইংলিশ ফোরাম'(এ এ ম ই ফ)-য়ের থেকে আনসারুল্লা বাংলা টিম সম্পর্কে আবারও জানতে পারে। 'ফাইভ লায়নস অফ উম্‌মা', অর্থাৎ, ইসলামি দুনিয়ার পাঁচ সিংহ শিরোনামে গ্রেপ্তার হওয়া ওই পাঁচ ছাত্র সম্পর্কে খবর বেরিয়েছিল সেখানে। ওই ওয়েবসাইট ঘেঁটে গত বছর পাকিস্তানে চালু হওয়া বাব-উল-ইসলাম ডট নেট নামে অন্য একটি ওয়েবসাইটেরও সন্ধান পায় পুলিশ। এই ওয়েবসাইট  থেকে জানা যায় যে,আনসারুল বাংলা টিমের প্রতিষ্ঠা হয়েছে  ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ইরাকের আল কায়দার অধীনে কাজ করা সংগঠন, আনসার-উল-ইসলামের আদলে একে গড়ে তোলা হয়েছে। সদস্য করার জন্য আনসারুল বাংলার লক্ষ্য ইংরেজি মাধ্যম কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা।


বাংলা, ঊর্দূ ও আরবিতে এ এ এম ই এফ-য়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জিহাদ ঘোষণা করে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করা আনসারুল্লা বাংলা টিম  ২০১২ সালের শেষ দিক দিয়ে সক্রিয় হয় ওঠে। সম্প্রতি তাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এই সংগঠন সশস্ত্র জিহাদের সপক্ষে  প্রচার আরও জোরদার করে তুলেছে। এদের তাত্ত্বিক-আধ্যাত্মিক নেতা, চরমপন্থী ইসলামি মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানির শাস্ত্রবচন আহমেদ রাজীব হায়দারের হত্যাকারীদের হিংসাত্মক কাজ করতে গভীরভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল।

দেশের নিরাপত্তা, আর্থিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সম্মান যাতে ভূলুন্ঠিত না হয়, তার জন্য সন্ত্রাসবাদ গেড়ে বসার আগেই এই বিপদের মূলোচ্ছেদ করা দরকার বাংলাদেশ সরকারের। অর্থনীতি, পরিকাঠামো এবং কৃষির মত ক্ষেত্রগুলিতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পেরেছে, কিন্তু সব উন্নয়ন আটকে যাবে জঙ্গিপণার উত্থান আটকানো না গেলে।

 

রাজীবের হত্যার পরে পুলিশ এই জঙ্গি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা-প্রধান মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানিসহ তাঁর ৩০ জন অনুগামীকে বড়গুনা জেলার দক্ষিন খেজুরতলার একটি গোপন আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করে।

 

এই মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানি ২০১১ সালে আমেরিকার ড্রোন আক্রমনে নিহত আল কায়দা গোষ্ঠীভুক্ত ইয়েমেনি আধ্যাত্মিক নেতা আনোয়ার আল-আওলাকির  একজন অনুগামী। গত বছর দুয়েক ধরেই রহমানি বেপরোয়াভাবে বাংলাদেশে তাঁর কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই জঙ্গি দলের লোকজনের কাছ থেকে পুলিশ বারোজন ব্যক্তির নাম থাকা একটি 'হিট লিস্ট' উদ্ধার করেছিল।

 

তরুণদের সরাসরি জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে  উদ্দীপ্ত করার কী পরিমাণ ক্ষমতা মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানির আছে, তা বোঝা যায় তাঁর কাছে মগজ ধোলাই হওয়া ব্যক্তিদের নাম দেখলে, যাদের মধ্যে আছে ন্যু ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সামনে বোমা রাখার দায়ে সম্প্রতি ৩০ বছরের কারাদন্ড পাওয়া ২২-বছর বয়সী বাংলাদেশি রেজওয়ানুল আহসান নাফিস এবং ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের কম্প্যুটার বিশেষজ্ঞ রাজীব করিম, ইয়েমেনের আল কায়দা নেতা আনোয়ার আল-আওলাকির সঙ্গে যোগসাজসে ২০১১ সালের মার্চ মাসে  একটি ব্রিটিশ বিমানে বিস্ফোরন ঘটানর চক্রান্ত করার জন্য ইংল্যান্ডে যার ৩০ বছরের জেল হয়েছে। জামায়েতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশে (যে এম বি) এবং   অধুনা নিষিদ্ধ হরকত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামি(হুজি)-র মত আল কায়দা-পন্থী সংগঠনগুলি ে এখন বিভিন্ন নামের আড়ালে কাজকর্ম চালাচ্ছে এবং এই সংগঠনগুলির অনেকেই আনসারুল্লা বাংলা টিমে যোগ দিয়েছে। আনসারুল্লা বাংলা টিমের ঢাকা কেন্দ্র, মরকাজুল উলুম ইসলামিয়া এখন সমস্ত জঙ্গি ইসলামিদের মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সশস্ত্র জিহাদে বিশ্বাস করা চার হাজারের বেশি জঙ্গি এখন মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানির অধীনে।

 

সম্প্রতি তাদের ওয়েবসাইটে আনসারুল্লা বাংলা টিম একটি ডকুমেন্টারি ভিডিও পোস্ট করেছে, যার শিরোনাম 'ইরাডিকেট ডেমোক্রাসি' অর্থাৎ 'গণতন্ত্রকে উচ্ছেদ কর'। এখানে বলা হয়েছে গণতন্ত্র ইসলামের পথানুসারী নয় এবং তা একটি পশ্চিমী ভাবনা। জিহাদের নামে যারা নাশকতামূলক কাজে যুক্ত, তাদের 'আল্লার সৈনিক' আখ্যা দিয়ে ওই ডকুমেন্টারিতে সবাইকে 'আল্লার শাসন' প্রতিষ্ঠা করার জন্য 'খেলাফত' গড়ে তোলার কাজে যোগ দিতে বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, মুসলমান রাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য নয়  এবং গণতন্ত্র ও কম্যুনিজম ঈশ্বরে অবিশ্বাসীদের পথ। 

 

আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, আল কায়দা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি এবং সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা ওই সংগঠনের ২০ জন সক্রিয় সদস্যদের মধ্যে একটি 'কনফারেন্স কল'-য়ে হওয়া কথাবার্তা সেখানকার গোয়েন্দা বিভাগ শুনতে পেরেছিল। এর পরেই বড় রকম হানার আশঙ্কায় আমেরিকা এবং তার বেশ কয়েকটি মিত্র দেশ মুসলিম দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় তাদের নিজেদের দূতাবাস বন্ধ করে দেয়। ২০১৩ সালের  পয়লা অগাস্ট সম্ভাব্য আল কায়দা আক্রমণের বিরুদ্ধে আমেরিকা সারা বিশ্বজুড়ে একটি সতর্ক বার্তা জারী করে। হঠাৎ করে একদিনের জন্য বাংলাদেশ আমেরিকান দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া থেকেই বোঝা যায়, সন্ত্রাসবাদের বিপদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রান্তিক জায়গায় চলে গেছে বাংলাদেশ।

 

দেশের নিরাপত্তা, আর্থিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সম্মান যাতে ভূলুন্ঠিত না হয়, তার জন্য সন্ত্রাসবাদ গেড়ে বসার আগেই এই বিপদের মূলোচ্ছেদ করা দরকার বাংলাদেশ সরকারের। অর্থনীতি, পরিকাঠামো এবং কৃষির মত ক্ষেত্রগুলিতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পেরেছে, কিন্তু  সব উন্নয়ন আটকে যাবে জঙ্গিপণার উত্থান আটকানো না গেলে।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics