Column
তারিকের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার মামলা

09 Feb 2016

#

২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকার একটি ট্রায়াল কোর্টে বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারিক রহমান ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যবসায় সহযোগী গিয়াসুদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে ২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে দু'দফায় মোট ২০. ৪১ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার অভিযোগ আনে অ্যান্টি কোরাপশন কমিশন (এসিসি)।

এসিসি-র পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি মুদ্রায় ওই অর্থ তারিকের কাছে এসেছিল বিভিন্ন সংস্থা এবং কোম্পানির কাছ থেকে।  বিনিময়ে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পুত্র-এই ক্ষমতাবলে এই সব সংস্থা এবং কোম্পানিগুলিকে বিভিন্ন কন্ট্রাক্ট পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অর্থ নেবার সময় নিজের পরিচয় গোপন রাখতে তারিক তাঁর বন্ধু গিয়াসুদ্দিন আল মামুনের সিটি ব্যাংক, সিঙ্গাপুরের অ্যাকাউন্টের ডেবিট কার্ডটি ব্যবহার করতেন।

 

অসদুপায়ে অর্জন করা টাকার দৌলতে (প্রায় ১০০ কোটি ডলার) তারিক এক সময় পৃথিবীর প্রথম দশ জন ধনী ব্যক্তির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
২০১৩ সালের ১৭ই নভেম্বর ট্রায়াল কোর্ট তারিককে বেকসুর খালাস করে দিয়ে তাঁর বন্ধু গিয়াসুদ্দিনের বিরুদ্ধে সাত বছরের কারাবাস এবং ৪০ কোটি টাকার জরিমানার আদেশ দেয়। ট্রায়াল কোর্টের এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৩ সালের ৫ই ডিসেম্বর হাই কোর্টে আপীল করে এসিসি।


২০১৬ তারিখের ১২ই জানুয়ারি হাই কোর্ট আদালতের রেজিস্ট্রারকে এই অর্থ পাচার মামলার ব্যাপারে অধুনা লন্ডন নিবাসী তারিককে ১৪ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে ট্রায়াল কোর্টে আত্মসমর্পণ করার জন্য নোটিশ জারি করতে নির্দেশ দেয়। এর আগে, ২০১৪ দালের ১৯শে জানুয়ারি হাই কোর্টের অপর একটি বেঞ্চও তারিককে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিয়েছিল, কিন্তু তিনি গা ঢাকা দিয়ে পলাতক হয়েই রইলেন।

তারিকের অসুস্থতা এমন নয় যে তার চিকিৎসা বাংলাদেশে করা যাবেনা এবং তার জন্য তাঁকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বিদেশে থাকতে হবে। আর্থিক দূর্নীতি, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের দায় দেশে ফিরলেই জেল খাটতে হবে, এই ভয়ে তারিক ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই চিকিৎসার অজুহাতে লন্ডনে রয়েছেন।তাঁর পরিকল্পনা, বিএনপি কোনও দিন ক্ষমতায় ফিরে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করলে, তবেই তিনি দেশে ফিরবেন।


এসিসি জানতে পেরেছে যে, ট্রায়াল কোর্টের যে বিচারক, মোতাহার হোসেন, তারিককে মুক্তি দিয়েছিলেন, তিনি তাঁ বিচারবিভাগীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে  তাঁর আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ন বিপুল সম্পত্তি অর্জন করেছিলেন।  এসিসি এই বিচারকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে। কিন্তু তিনি ২০১৪ সালের ৯ই জানুয়ারি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন এবং বর্তমানে  মালয়েশিয়ায় বসবাস করছেন। ঢাকার ধানমন্ডিতে বেশ কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্ট এবং নাটোরে তাঁর গ্রামে প্রচুর জমির মালিক হওয়া ছাড়াও  তিনি  একটি বাড়ি কিনেছেন এবং সেখানে তাঁর পুত্র উচ্চ শিক্ষার্থে রত । তাঁর  দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধেও এসিসি হাই কোর্টে আবেদন করেছে।


সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তদন্ত চালিয়ে এসিসি তারিক এবং গিয়াসুদ্দিনের সিটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১.১৯ কোটি টাকার সমমূল্যের ইউরো, ১৯.০২ কোটি টাকার সমতুল ডলার এবং ১৯.৫১ কোটি টাকার সমমূল্যের পাউন্ডের হদিশ পেয়েছে। এসিসি জানতে পেরেছে যে, হোসাফ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন ২০০৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি তারিখে 'বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কনসালটেন্সি ফি' বাবদ সিঙ্গাপুর সিটি ব্যাংকে ১১.৬৭ লক্ষ ডলার (৮.২ কোটি টাকা) জমা করেছিলেন.২০০৩ সালের পয়লা অগাস্ট নির্মাণ কনস্ট্রাকশনের চেয়ারম্যান খাদিজা ইসলাম ওই অ্যাকাউন্টে সিঙ্গাপুরের ওসিসি ব্যাংক থেকে ৭.৫০ লক্ষ ডলার (৫.২৫ কোটি টাকা) পাঠিয়েছিলেন।নির্মাণ কনস্ট্রাকশন টঙ্গিতে প্রস্তাবিত ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বরাত পাওয়ার চেষ্টা করছিল।একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসের ২৬ তারিখে এ মেয়ার সি-রে সিঙ্গাপুর সিটি ব্যাংকের ওই অ্যাকাউন্টে ৩০,০০০ ডলার (২১ লক্ষ টাকা) জমা করেছিল। এ ছাড়াও বিভিন্ন অনামা  উৎস থেকে এসেছিল ৪. ১১ লক্ষ ডলার (২.৮৮ কোটি টাকা)।


খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন (২০০১-২০০৬) তারিক তাঁর কিছু বিশ্বস্ত অনুচর এবং গুন্ডার সাহায্যে হাওয়া মহল থেকে প্রকৃতপক্ষে এক সমান্তরাল প্রশাসন চালাতেন। তাঁর মা'র পদমর্যাদার সুযোগ নিয়ে তারিক দেশের মধ্যে সব থেকে ক্ষমতাবান এবং দূর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। তিনি যে চাল, চিনি, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য আবশ্যিক জিনিষপত্রের উপর অবৈধ ভাবে বসানো শুল্ক থেকে বিপুল মুনাফা করতেন, সে বিষয়ে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছ। এও জানা গেছে যে, তিনি মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং সৌদি আরবে টাকা খাটিয়েছেন। তারিক এবং তাঁকে ঘুষ দিয়ে রাষ্ট্রের আয়ের ক্ষতি করে অন্যায় সুবিধা নিতে চাওয়া লোকেদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন দেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুতফোজ্জামান বাবর।

 

. এসিসি এ তথ্যও পেয়েছে যে, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের ছেলে সানভির আহমেদের বিরুদ্ধে চলা একটি খুনের মামলা বন্ধ করে দিতে তারিক ৩১ লক্ষ ডলার (২.১৯ কোটি টাকা) ঘুষ নিয়েছিলেন। বসুন্ধরা গ্রুপেরই ডিরেক্টর হুমায়ুন কবিরকে খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন সনভির।


মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে যোগসাজশে জিয়া অরফ্যানেজ নামে একটি ভুয়ো সংস্থা গড়ে তারিকের ২.১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার একটি ঘটনা সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে। ওই আত্মসাতের ঘটনা ঘটার সামান্য কয়েক দিন আগেই-  ১৯৯১ সালের ৯ই জুন -ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সৃষ্টি করা প্রাইম মিনিস্টার'স অরফ্যানেজ ফান্ডে ১,২৫৫,০০০ ডলার (প্রায় ৪.৪৫ কোটি টাকা) জমা করা হয়েছিল। টাকা সরিয়ে নেওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগেই ওই ফান্ডটি তৈরি করা হয়েছিল।

অসদুপায়ে অর্জন করা টাকার দৌলতে (প্রায় ১০০ কোটি ডলার) তারিক এক সময় পৃথিবীর প্রথম দশ জন ধনী ব্যক্তির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

 

তারিকের অসুস্থতা এমন নয় যে তার চিকিৎসা বাংলাদেশে করা যাবেনা এবং তার জন্য তাঁকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বিদেশে থাকতে হবে। আর্থিক দূর্নীতি, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের দায় দেশে ফিরলেই জেল খাটতে হবে, এই ভয়ে তারিক ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই  চিকিৎসার অজুহাতে লন্ডনে রয়েছেন।তাঁর পরিকল্পনা, বিএনপি কোনও দিন ক্ষমতায় ফিরে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করলে, তবেই তিনি দেশে ফিরবেন।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics