Column
বাংলাদেশ আর নয় অনুদান গ্রহণের দেশ

20 Feb 2016

#

বাংলাদেশকে 'এন্ডলেস বাস্কেট', অর্থাৎ অনন্ত আন্তর্জাতিক অনুদানের গন্তব্যভূমি বলে আমেরিকার ভূতপূর্ব স্বরাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঞ্জারের একদা করা মন্তব্যটি বর্তমানে আদ্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

'মানিগেম; নামে আমেরিকার একটি সংস্থা বাংলাদেশকে পৃথিবীর পাঁচটি দ্রুত- বৃদ্ধি অর্থনীতির মধ্যে রেখেছে। আমেরিকার আর একটি সংস্থা, ব্রুকিং ইন্সটিট্যুশন, বলেছে যে, আয়তনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি পৃথিবের মধ্যে ৩৪তম এবং আগামী ২৫ বছরের মধ্যে তা অনেক ইউরোপিয়ান দেশ, অস্ট্রেলিয়া এবং মালয়েশিয়াক ছাড়িয়ে ২৩ তম স্থানে উঠে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ এবং নিরলস প্রচেষ্টার ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি ঘটিয়ে বাংলাদেশ এখন নিজের জন্য একটি সম্মানের জায়গা অধিকার করেছে। অর্থনৈতিক অগ্রগমণের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করা পরিশ্রমী এবং প্রাণসম্পন্ন জাতির ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন এ দেশের মানুষ।


এই দেশ এখন তার বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার পঞ্চাশ শতাংশের খরচ নিজেই বহন করে। বেঁচে থাকা এবং উন্নয়নমূলক কাজের জন্য   বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসাবে এখন আর আগের মত  দেখা হয়না বাংলাদেশকে।

 

পৃথিবীর একটি অন্যতম জনবহুল দেশ হওয়া সত্ত্বেও খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বনির্ভর,  তৈরি পোষাক শিল্পে দেশ এখন পৃথিবীর দু' নম্বর-চিনের পরেই, জাহাজ নির্মাণ, ফার্মাসিউটিক্যাল এবং আই টি শিল্পগুলি দ্রুত আন্তর্জাতিক আঙ্গিনায়  বিকাশলাভ করছে। সুতরাং, আশা করা যায়, বর্তমানের রাজনৈতিক বিতর্ক এবং অনিশ্চয়তা সরে যাবে এবং সেখানে জায়গা করে নেবে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, দায়বদ্ধতা এবং সরকারের নীতির স্বচ্ছতা- সব মিলিয়ে যা নিয়ে আসবে এক খুশির সময় এবং দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ভবিষ্যৎকে করে তুলবে শক্তিশালী।

        

  দেশের উন্নয়নের সূচককে বুঝতে ১৯৭২-৭৩ এবং বর্তমান সময়ের তুলনামূলক চিত্রটি সাহায্য করবে। ১৯৭২-৭৩ সালে দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল মোটামুটিভাবে ৯৯,৩০,২৩৫ টন, কিন্তু এখন ৩৪৭,০০,০০০ টন। ১৯৭-৭৩ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ১২৯ ডলার, এখন ১,৩১৪ ডলার। ওই সময় রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ২৪২ কোটি টাকা, এখন যা বেড়ে হয়েছে ১,৩৬, ৩৭১ কোটি টাকা। একই ভাবে উন্নয়ন খাতে ব্যয় ৪৬২.৬৬ কোটি থেকে হয়েছ ১,০২,৫৫৯ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন বহির্ভূত খাতে ব্যয় ২২৫ কোটি টাকা থেকে হয়েছে ১,৮৪,১৫৯ কোটি টাকা।এ ছাড়া, অনাবাসীদের পাঠানো টাকা, অথবা রেমিটান্সের পরিমাণ ০.৮০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ১,৫৩০ কোটি ডলার, বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের পরিমান মাত্র দু'কোটি থেকে এখন হয়েছে ২,৭৩০ কোটি টাকা। জিডিপিও এই সময়ের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে ২.৭৫ শতাংশ থেকে ৬.৫১ শতাংশে।


বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট একে আজাদ বলেছেন, "গত চল্লিশ বছরে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এক সময় পাকিস্তানের অধীনে থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় সব ক্ষেত্রেই পাকিস্তানকে পিছনে ফেলে দিয়েছি আমরা।"

গত ডিসেম্বর মাসে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের চিফ ইকনমিস্ট কৌশিক বসু বলেছেন যে, বাংলাদেশের ব্যাপারে তিনি বেশি করে আশাবাদী। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ এখন উড়ানের মূহুর্তে এসে দাঁড়িয়েছে এবং একদিন এই দেশ অন্যতম 'এশিয়ান টাইগার' বলে পরিগনিত হবে। "বাংলাদেশের মানুষের এখন উচ্চাকাঙ্খী হওয়া দরকার। মানুষ যদি মনে করেন আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব, তাহলে উন্নয়ন আরও দ্রুত হবে," তিনি বলেছেন।


রাষ্ট্রসংঘের ঠিক করে দেওয়া মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলের দারিদ্র্য দূরীকরণ সহ অনেকগুলি লক্ষ্যমাত্রাই পূরণ করে ফেলেছে বাংলাদেশ, এবং তা করেছে ২০১৫ সালের সময়সীমার দু'বছর আগেই। "আফটার মাচ হার্টব্রেক, সাম গুড নিউজ অ্যাট লিস্ট ফর বাংলাদেশ" শিরোনামে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে নিউ ইয়র্কের টাইম ম্যাগাজিন বলছে যে, এখন বাংলাদেশ দারিদ্র্য হার কমিয়ে আনার পথে চলছে, যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দারিদ্যসীমার নীচে বাস করা মানুষের সংখ্যা ২৬ শতাংশে নামিয়ে আনায়।


অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির করা একটি সমীক্ষায় দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে 'স্টার পারফর্মার' বলে অভিহিত করা হয়েছে। ২০১১ সালে করা একটি গবেষণার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাটিসটিক্স যে তথ্য দিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ২০১০ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ৩১.৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, অর্থাৎ পাঁচ বছরের মধ্যে এই হার কমেছে ৮.৫ পারসেন্টেজ পয়েন্ট। কোনও কোনও বিশ্লেষণকারী এমন কথাও বলছেন যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে দারিদ্র্য অনতিকালের মধ্যে জাদুঘরের বস্তু হয়ে উঠবে।

 

রেমিট্যান্স এবং ক্রমবর্ধমান রফতানির উপর ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতি গত পাঁচ বছরে গড়ে ছ' শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রমে এই বৃদ্ধি মধ্যমেয়াদী সময়ের জন্য বেড়ে সাত শতাংশে চলে যাবে বলে অভিমত প্রকাশ করেছে ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড।গত বছরের জুলাই মাসে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হয়ে বাংলাদেশ এক উল্লেখযোগ্য মাইলস্টোনে পৌঁছল।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মিশন ২০২১ অনুযায়ী বাংলাদেশের এক বিস্তৃত উন্নয়ন পরিকল্পনা আছে্‌ যা সঠিকভাবে রূপায়িত হলে  মধ্য থেকে উচ্চ আয়ের  দেশ হিসেবে পরিগনিত হবে বাংলাদেশ। এই পরিকল্পনায় যে সব বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে, সেগুলির মধ্যে ব্রডব্যান্ড পরিষেবার প্রসার, পরিকাঠামো বৃদ্ধি, কার্যকরী প্রশাসন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, শহরায়ন এবং জ্ঞান-ভিত্তিক সমাজ নির্মানে উদ্ভাবনের কথা বলা হয়েছে। দেশ 'ব্লু ইকনমি' প্রবর্তন করার কথাও ভাবছে, যাতে জলপথ, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরকে ব্যবহার করে স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা যায়।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে রফতানি, রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বাংলাদেশের পক্ষে একটি উন্নয়নের ত্রিভূজ গড়ে তুলেছে, যার ফলে জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশকে দারিদ্র্যসীমার উপরে তুলে আনা এবং দু'বছরের আগেই রাষ্ট্রসংঘ নির্ধারিত মিলেনিয়াম গ্রোথ টারগেট পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রথম বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডারে অতিরিক্ত ২,৭৩০ কোটি ডলার রয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে এবং এর জন্যেই সম্পূর্ন নিজের ক্ষমতায় দেশে সর্বকালের মধ্যে সর্ববৃহৎ পরিকাঠামো পরিকল্পনা-২.৯ বিলিয়ন ডলারের পদ্মা ব্রিজ নির্মাণের কাজ করতে পেরেছে শেখ হাসিনার সরকার।

 

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ১৩১৪ ডলার। এই আয়কে ২০২১ সালের মধ্যে তিনগুণ বাড়িয়ে ৪০০০ ডলারে নিয়ে যেতে চায় সরকার। বাংলাদেশের এই দ্রুত সাফল্যের জন্যেই অনেকে এখন এই দেশের অতি উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছেন।


দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম দেশ যেখানে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে লিঙ্গগত সাম্য অর্জন করা গেছে। দেশে সাধারণভাবে প্রাথমিক শিক্ষা বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে শিক্ষা দ্বাদশ শ্রেনী পর্যন্ত   অবৈতনিক। স্কুলছুটের সংখ্যা কমাতে মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বৃত্তিরও ব্যস্থা আছে।


'মানিগেম; নামে আমেরিকার একটি সংস্থা বাংলাদেশকে পৃথিবীর পাঁচটি দ্রুত- বৃদ্ধি অর্থনীতির মধ্যে রেখেছে। আমেরিকার আর একটি সংস্থা, ব্রুকিং ইন্সটিট্যুশন, বলেছে যে, আয়তনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি পৃথিবের মধ্যে ৩৪তম এবং আগামী ২৫ বছরের মধ্যে তা অনেক ইউরোপিয়ান দেশ, অস্ট্রেলিয়া এবং মালয়েশিয়াক ছাড়িয়ে ২৩ তম স্থানে উঠে যাবে।

 

ম্যাক্রোইকনমির বিচক্ষণ ব্যবহার, অর্থনৈতিক সংস্থাগুলির সংস্কার, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে উদারীকরণ এবং সামাজিক ক্ষেত্রে সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি নীতি দেশে এখন পুঁজি লগ্নির পক্ষে এক অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জাহির হোসেন বলেছেন, "গড়ে ছ'শতাংশ আর্থিক বৃদ্ধিকে যদিও অনেকে একটি ফাঁদ হিসেবে দেখছেন, এর ফলে কিন্তু ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্রুততম বৃদ্ধি অর্জনকারী দেশগুলির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।"

 

গত ডিসেম্বর মাসে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের চিফ ইকনমিস্ট কৌশিক বসু বলেছেন যে, বাংলাদেশের ব্যাপারে তিনি বেশি করে আশাবাদী। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ এখন উড়ানের মূহুর্তে এসে দাঁড়িয়েছে এবং একদিন এই দেশ অন্যতম 'এশিয়ান টাইগার' বলে পরিগনিত হবে। "বাংলাদেশের মানুষের এখন উচ্চাকাঙ্খী হওয়া দরকার। মানুষ যদি মনে করেন আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব, তাহলে উন্নয়ন আরও দ্রুত হবে," তিনি বলেছেন।


যে সময় কৌশিক বসু ঢাকায় এসেছিলেন, সেই সময় পদ্মা ব্রিজ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই প্রকল্পের জন্য এক সময় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ১.২ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে দূর্নীতির অজুহাতে তা প্রত্যাহার করে। পদ্মা ব্রিজ প্রসঙ্গে বসু বলেছেন, "এখন থেকে দশ বছর আগেও বাংলাদেশে নিজের ক্ষমতায় এ রকম বড় কোনও প্রকল্প হাতে নিতে পারে, এ কথা অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু এখন তা করার ক্ষমতা এ দেশের আছে।"


বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্যাটেলাইট, 'বঙ্গবন্ধু', সামনের বছরের মধ্যেই উৎক্ষেপণ করতে চলেছে। এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের পরিকল্পনা সফল হতে পারে। ইন্টারনেট ব্যবহারে দেশ ইতিমধ্যেই অনেক এগিয়ে গেছে এবং দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট গোটা দেশকেই ইন্টারনেট পরিষেবার আওতায় নিয়ে আসবে। এর ফলে শিল্প এবং কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদন অনেক বেশি পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব হবে, পরিবর্তন আসবে শিক্ষাতেও। সরকারের ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে উন্নত এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে আর খুব বেশি দেরি নেই। 




Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics