Column
হেফাজতের অবস্থান কি বাংলাদেশের আদর্শের বিরোধী ?

02 Apr 2017

#

বাংলাদেশে হেফাজতের সংগঠন গঠিত হয়েছিল ২০১০ সালে, উত্তরাধিকারের ব্যাপারে নারীদের পুরুষের সমান অধিকার দানের বিরোধিতা করে। এরা নতুন করে সদস্য,সংগ্রহ করে ২০১৩ সালে ঢাকায় ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর। সেই সময় শাহবাগ স্কোয়ারে জড়ো হয়ে হাজার হাজার মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অপরাধকারীদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিলেন।

উগ্র ইসলামপন্থিরা সেই সময় বেশ কিছু ব্লগারের তথাকথিত ঈশ্বর অবমাননাকারী বিবৃতি ছেপে প্রকাশ করে শাহবাগ আন্দোলনকে হেয় করতে চেয়ে ১৩ দফা দাবি পেশ করেছিল।

 

হেফাজতের উত্থানে আসলে স্বাধীনতা সংগ্রাম-জাত ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের অবক্ষয়ই প্রতিফলিত হয়। ভাষা এবং সংস্কৃতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার সময় থেকেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে আত্মপরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল।
পত্তনের সময় থেকেই  প্রায় নীরবে, রাজনৈতিক ঝোঁক বর্জিত এবং স্বাধীনতা সমর্থকের অবস্থান  নিয়ে থেকেছে হেফাজত। গ্রামবাসী দরিদ্র এবং স্বল্প শিক্ষিত মানুষ, যাদের শহরবাসী মধ্যবিত্তরা সব সময়ই ঘৃণা করে এসেছে, প্রধানত তাদেরই প্রতিনিধি হিসেবে থেকেছে এরা। এদের কাজকর্মের মধ্যে কোনও আন্তর্জাতিকতা অথবা সন্ত্রাসবাদ না থাকলেও কালক্রমে চরমপন্থি হয়ে উঠেছে এরা। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এক ছাতার তলায় আসা প্রায় বারোটি ইসলামি সংগঠনকে নিয়ে হেফাজত এখন একটি দৃঢ়বদ্ধ জোট। হেফাজতের সঙ্গে জামাতের ধর্মীয় আদর্শগত বিরোধ আছে, যদিও হেফাজতের আন্দোলনকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছে জামাত।

 

হেফাজতের উত্থানে  আসলে স্বাধীনতা সংগ্রাম-জাত ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের অবক্ষয়ই প্রতিফলিত হয়। ভাষা এবং সংস্কৃতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার সময় থেকেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে আত্মপরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল।

 

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির পাঠ্যপুস্তকের বিষয় বদল করা শুরু হয়ক এবং এরপরে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ  ক্ষমতায় এসে একটি শিক্ষা নীতি চালু করে। এই নীতির উপর ভিত্তি করে ২০১২ সালে নতুন বই ছেপে পরের বছর চালু করা হয় সেগুলিকে। উগ্র ইসলামীদের অভিযোগ, বাংলা ভাষার পুষ্টির উদ্দেশ্যে ইসলামি ভাবধারা সমন্বিত বহু বিষয় বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে নতুন শিক্ষা নীতিতে এবং তালিকায় ঢোকানো হয়েছে হিন্দুত্বকে এবং হিন্দুর লেখকদের। ২০১৩ সালে ইসলামি ছাত্র শিবির তাদের ফেসবুক পেজ "বাঁশের কেল্লা"য় পাঠ্যপুস্তকগুলিতে হিন্দুত্ব এবং হিন্দু লেখকের তথাকথিত অন্তর্ভুক্তির বিশদ বিবরণ দেয়।  এ ব্যাপারে হেফাজত তীব্র প্রতিবাদ করে এবং তাদের সঙ্গ দেয় আরও কিছু ইসলামি সংগঠন। এদের দাবি ছিল পাঠ্যপুস্তকগুলির সংশোধন। সংবাদমাধ্যমের একাংশের খবর অনুযায়ী, মূলত হেফাজত-এ-ইসলামের চাপেই এই দাবি ওঠানো হয়েছিল। এর ফলে কিছু 'হিন্দু' এবং  'নাস্তিকের' কিছু লেখা পাঠ্যবইগুলি থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়, ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ টেক্সট বুকের চেয়ারম্যান, যাঁর নাম এই সব বইতে ছাপা থাকত, তাও বাদ দিতে হয়েছিল। এর কারণ তৎকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন হিন্দু।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাঙালির সংস্কৃতির উপর নির্ভর করা যে আদর্শের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল, হেফাজত-এ-ইসলাম কি তাকে অনুসরণ করে ?

 

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সামনে  সুবিচারের প্রতীক হিসেবে তুলাদণ্ড এবং তরবারি হাতে এক নারীর মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। ভাষা এবং সংস্কৃতির ভিত্তিতে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্র বাংলাদেশে এ কোনও গর্হিত কাজ নয়।  চোখ বাঁধা এবং গাউন পরিহিত গ্রীক দেবী থেমিসের আদলে গড়া এই মূর্তির নারী শাড়ি পরিহিতা।  কিন্তু মূর্তি পূজার বিরোধী ইসলামিরা এই মূর্তিকে ইসলাম-বিরোধী আখ্যা দিয়ে এর অপসারণ দাবি করেছে। সংস্কৃতিবিরোধী এবং ইসলামবিরোধী এই মানসিকতা ছড়িয়ে গেছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও, যেখানে  বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করা রাজনৈতিক সমর্থনপুষ্ট একটি ছাত্র সংগঠন সরকার পরিচালিত বেকার ছাত্রাবাসের সামনে স্থাপিত শেখ মুজিবুর রহমানের মূর্তির অপসারণ চেয়েছে।

 

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাঙালির সংস্কৃতির উপর নির্ভর করা যে আদর্শের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল, হেফাজত-এ-ইসলাম কি তাকে অনুসরণ করে ?

 

হেফাজত-এ-ইসলাম অথবা তার অনুগামীদের অথবা সরকারের দোষ খুঁজে বের করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু সরকার এবার ভেবে দেখুক, ৪৬ বছর আগে যে আদর্শের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল, তার বিরোধিতা করা দলগুলির কথায় তারা আদৌ চলবে কি না। 




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics