Column
নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগ ব্যবস্থা

06 Jun 2017

#

শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার সময় থেকেই বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে যোগাযোগের উন্নতির জন্য ক্রমান্বয় চেষ্টা চালানো হচ্ছে। যোগাযোগ-ব্যবস্থা সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি নতুন চুক্তি যেমন সম্পাদিত হয়েছে দু'দেশের মধ্যে, তেমনি প্রয়োজনমত কিছু পরিবর্তন করে নবীকরণ করা হয়েছে আগেকার চুক্তিগুলিরও ।

রেল যোগাযোগঃ ঢাকা এবং কলকাতার মধ্যে যাতায়াতকারী একমাত্র ট্রেন  মৈত্রী এক্সপ্রেসের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এই পরিষেবার আরও সম্প্রসারণের কথা চলছে। দীর্ঘ ৪৩ বছরের ব্যবধানে ঢাকা-কলকাতা রেল পরিষেবা আবার শুরু হয় ২০০৮ সালে। ২০১৫ সালে ঢাকা সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছিলেন, ঢাকা - কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষাকারী অন্য ট্রেনগুলির যাত্রীদের কাস্টমস এবং ইমিগ্রেশনের সুবিধার জন্য উপযুক্ত কোনও জায়গায় ভারত  আধুনিক এবং  আন্তর্জাতিক মানের  একটি প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল স্থাপন করবে। 

সীমান্ত সহযোগিতাঃ ২০১৬ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ এবং ভারত সরকার এমন একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, যার ফলে বেনাপোল-পেট্রাপোল চেক পোস্ট দিয়ে মানুষ এবং পণ্যের যাতায়াত সহজ হয়ে যায় এবং এর ফলে আরও এক পা এগিয়ে যায় দু'দেশের মধ্যে সম্পর্ক। নরেন্দ্র মোদী এবং শেখ হাসিনা পেট্রাপোল ইন্টিগ্রেটেড চেক পোষ্টের উদ্বোধন করেন। এই ইন্টিগ্রেটেড পোস্ট তৈরি করার উদ্দেশ্য বিভিন্ন জটিলতা দূর করে নিরাপত্তা, অভিবাসন, শুল্ক এবং কোয়ারেন্টাইনের ব্যাবস্থাপনাকে আরও কার্যকরী এবং দক্ষ করে তোলা।
২০১৮ সালের মধ্যে দু'দেশের মধ্যে দু'দফায় পাঁচটি নতুন রেল পথ গড়ে তোলা হবে। দিনাজপুরের বিরাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের  রাধিকাপুরের মধ্যে যেমন পণ্যবাহী রেল পরিষেবা চালু হবে, তেমনি যাত্রীবাহী ট্রেন চলবে বেনাপোল হয়ে খুলনা ও কলকাতার মধ্যে। অন্য তিনটি প্রস্তাবিত রেল রুট হল, শাহবাজপুর-মহিষাসন, আখাউড়া-আগরতলা এবং চিলাহাটি-হলদিবাড়ি। এই সব কটি রুটই  পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হবে। এ'ছাড়া  ফেনি-বেলোনিয়া, বুড়িমারি-চ্যাংড়াবান্ধা এবং বাংলাবান্ধা-শিলিগুড়ি রুটের কথাও ভাবা হচ্ছে। 

বর্তমানে তিনটি রেল্রুট চালু আছে।    চৌডাংগার দর্শনা থেকে পশ্চিমবঙ্গের গেদে পর্যন্ত রুটটি যাত্রী এবং পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হয়। অন্য দু'টি -বেনাপোল-পেট্রাপোল এবং রোহনপুর-সিংহবাদ রুট-শুধুই পণ্য পরিবহনের জন্য। 

বাস পরিষেবাঃ খুলনা এবং কলকাতাকে সংযুক্ত করে বাংলাদেশ এবং ভারত একটি নতুন বাস পরিষেবা চালু করেছে। এর ফলে দু'দেশের মধ্যে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়েছে। ঢাকা-কলকাতা এবং আগরতলা-ঢাকার পর  দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এটি তৃতীয় বাস পরিষেবা। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার প্রথম দফার শাসনকালেই ঢাকা এবং কলকাতার মধ্যে বাস পরিষেবা চালু করা হয়েছিল। এই কাজ সম্ভব হয়েছিল ১৯৯৯ সালে ভারতের তৎকালীন  প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সময় 'এগ্রিমেন্ট ফর রেগুলেশন অফ মোটর ভেহিকলস প্যাসেঞ্জার ট্রাফিক' চুক্তি স্বাক্ষর করার ফলে। 

শিলং হয়ে ঢাকা-গুয়াহাটি রুটে সরাসরি বাস পরিষেবার ট্রায়াল রান হয় ২০১৫ সালের মে মাসে। এই বাস পরিষেবা অচিরেই নিয়মিত হয়ে উঠবে। অন্য দিকে, ঢাকা এবং গুয়াহাটির মধ্যে আকাশ যোগাযোগ ব্যবস্থা শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। 

উপকূল এবং অন্তর্দেশীয় জলপথ পরিবহণঃ  নদীপথে যাতায়াতকারী যানগুলি যাতে সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করে দু'দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহণের কাজ করতে পারে, তার জন্য ২০১৬ সালের মে মাসে  ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের সময়  একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে 
বাংলাদেশ  এবং ভারত। এর ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাণিজ্যে গতির সঞ্চার হবে এবং দূরত্ব-হ্রাসের কারণে পরিবহণের খরচও অনেক  কমে যাবে। 

এই দুই দেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড  ট্রেড এগ্রিমেন্টের প্রোটোকলও সম্প্রসারিত করেছে। তার ফলে শুধু যে বাণিজ্যের বহর বাড়বে তাই নয়, পরিবহণ ক্ষেত্রে আরও বেশি পুঁজি আসার পথ সুগম হবে। এই চুক্তির ফলে নেপাল ও ভুটানের মত অন্য দেশগুলির সংগে বাণিজ্যের জন্য কিছু নির্দিষ্ট ট্রেড চ্যানেল ব্যবহার করতে পারবে বাংলাদেশ। 
২০১৭ সালের ১৭ই মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে সে দেশের মন্ত্রীসভার ক্যাবিনেট দিল্লির ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ এবং ঢাকার ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের মধ্যে স্বাক্ষরিত শিক্ষক বিনিময় চুক্তিতে 'এক্স পোস্ট ফ্যাক্টো' সম্মতি দিয়েছে। এই চুক্তির উদ্দেশ্য এই ধরণের বিনিময়কে নিয়মিত করে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা দেওয়া এবং জাতীয় সুরক্ষা, উন্নয়ন এবং কৌশলগত বিষয়ের পাঠের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এই দু'টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া গড়ে তোলা। এই দু'টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষক বিনিময়ের ফলে দু'দেশের সামরিক বাহিনীর কর্মদক্ষতায় একটি ভারসাম্য আসবে, ফলে যে সব বিপদ এবং চ্যালেঞ্জ দু'দেশেরই সমস্যা, সেগুলির মোকাবিলা করা যাবে আরও অনেক ভালভাবে।


সরাসরি জাহাজ পরিবহণঃ   মার্চ, ২০১৬- কৃষ্ণপত্তনম এবং চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রচিত হল এক নতুন অধ্যায়। একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই যাত্রার সূচনা হয় কৃষ্ণপত্তনম-এ।   কৃষ্ণপত্তনম-পানগাও উইকলি ডাইরেক্ট সার্ভিস নামের এই নতুন জাহাজ পরিষেবাকে স্বাগত জানিয়েছেন দু'দেশের বণিকেরাই, কারণ এর ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ কমবে, বাঁচবে সময়ও।


সীমান্ত সহযোগিতাঃ ২০১৬ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ এবং ভারত সরকার এমন একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, যার ফলে বেনাপোল-পেট্রাপোল চেক পোস্ট দিয়ে মানুষ এবং পণ্যের যাতায়াত সহজ হয়ে যায় এবং এর ফলে আরও এক পা এগিয়ে যায় দু'দেশের মধ্যে সম্পর্ক।  নরেন্দ্র মোদী এবং শেখ হাসিনা  পেট্রাপোল ইন্টিগ্রেটেড চেক পোষ্টের উদ্বোধন করেন। এই ইন্টিগ্রেটেড পোস্ট তৈরি করার উদ্দেশ্য বিভিন্ন জটিলতা দূর করে নিরাপত্তা, অভিবাসন, শুল্ক এবং কোয়ারেন্টাইনের ব্যাবস্থাপনাকে আরও কার্যকরী এবং দক্ষ করে তোলা। 


আঞ্চলিক যোগাযোগঃ  বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে সহযোগিতা এবং যোগাযোগ জোরদার হয়েছে এবং আরও হতে থাকবে। এটা সম্ভব হয়েছে দক্ষিন এবং দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির ব্যাপারে বাংলাদেশের তৎপর ভূমিকার ফলে। বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মালটি সেকটোরাল টেকনিকাল অ্যান্ড ইকনমিক কোঅপারেশন (বিমস্টেক)-এ বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, নেপাল এবং ভুটানকে নিয়ে গড়া এই গোষ্ঠী আন্তর্দেশীয় সহযোগিতার উদ্দেশ্যে  গঠিত হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকেই এই গোষ্ঠীর সেক্রেটারিয়েট অধিবেশন ঢাকাতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।  ২০১৫ সালে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত এবং নেপাল (বিবি আই ইএন) তাদের সীমান্ত অঞ্চলগুলির মধ্যে অবাধ পরিবহণের জন্য একটি চুক্তি করে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আদলে তৈরি বি বি আই এন মোটর ভেহিকল এগ্রিমেন্টে 
 এই চারটি দেশের মধ্যে যাত্রী এবং পণ্যবাহী গাড়ির নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াতের কথা বলা হয়েছে। 


২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের সময় একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। তাতে পরিবহনের জন্য বাংলাদেশ এবং ভারত-উভয়ের এলাকাই ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, নেপালে পন্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের গাড়ি ভারতের এলাকার মধ্য দিয়ে যেতে পারবে, যেমন ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে সে দেশের গাড়ি যেতে পারবে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের উত্তর - পুর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে পণ্য নিয়ে যাওয়ার জন্য।  এর ফলে আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হতে চলেছে। এনার্জি কোঅপারেশন অথবা শক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে সার্ক দেশগুলির মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, তাতে বৃহৎ ভূমিকা রয়েছে বাংলাদেশের। এর আগে, ২০১৪ সালে আটটি দক্ষিণ এশিয় দেশ নেপালে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট অন কোঅপারেশ ইন পাওয়ার সেক্টর- এ স্বাক্ষর করেছিল। 


২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত এবং নেপাল একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যার ফলে ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এবং নেপালের পণ্যবাহী গাড়ি যাতায়াত করতে পারবে। ভারত এবং নেপালের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে স্বাক্ষরিত 'লেটার অফ এক্সচেঞ্জ' অনুযায়ী, বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের বাণিজ্যের সুবিধার্থে ভারতের  সিঙ্গাবাদের  ভিতর দিয়ে রেল ট্রানজিট চালু হবে।  নেপালের কাকরাভিটা থেকে বাংলাদেশের বাংলাবান্ধা পর্যন্ত একটি করিডোর দিয়ে পণ্য যাওয়া আসা করবে। এর মাঝে পড়বে ভারতের সিঙ্গাবাদ। এই ব্যবস্থার ফলে বংলাদেশ এবং নেপালের মধ্যে পণ্য পরিবহণ অনেক সহজ হবে। 

ভারত এবং মায়ানমারের সংগে উপকূল  অধিকার সম্পর্কিত বিতর্কে  আন্তর্জাতিক আদালতের 'মেরিটাইম ভার্ডিক্ট' বাংলাদেশের পক্ষে যাওয়ায় যে নতুন উপকূল অঞ্চল এখন বাংলাদেশের আয়ত্বে এসেছে, তাতে 'ব্লু ইকনমি'র মত পরিকল্পিত ধারনা রূপায়িত হলে বাংলাদেশ এবং তার প্রতিবেশীদের মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গোপসাগরে যৌথ গবেষণা চালাবার জন্য ভারতের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে  চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। 

২০১৭ সালের ১৭ই মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে সে দেশের মন্ত্রীসভার ক্যাবিনেট দিল্লির ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ এবং ঢাকার ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের মধ্যে স্বাক্ষরিত শিক্ষক বিনিময় চুক্তিতে 'এক্স পোস্ট ফ্যাক্টো' সম্মতি দিয়েছে।  এই চুক্তির উদ্দেশ্য এই ধরণের বিনিময়কে নিয়মিত করে  তাকে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা দেওয়া এবং জাতীয় সুরক্ষা, উন্নয়ন এবং  কৌশলগত বিষয়ের পাঠের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এই দু'টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া গড়ে তোলা। এই দু'টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষক বিনিময়ের ফলে দু'দেশের সামরিক বাহিনীর কর্মদক্ষতায় একটি ভারসাম্য আসবে, ফলে যে সব বিপদ এবং চ্যালেঞ্জ দু'দেশেরই সমস্যা, সেগুলির মোকাবিলা করা যাবে আরও অনেক ভালভাবে।



Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics