Column



খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০
খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০
২০১৭ সালের ১০ই মে তারিখে বি এন পি'র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ঘোষিত 'ভিশন ২০৩০' -এর ধারনা প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার 'ভিশন ২০২১' এবং ভিশন ২০৪০'-এর সরাসরি নকল। এমন কি, 'ভিশন ২০৩০'-এই শিরোনামটিও শেখ হাসিনার থেকে নকল করা।
এই নকল করার কারণ শেখ হাসিনা তাঁর লক্ষ্য পূরণে অনেকটাই সফল হয়েছেন। তাই খালেদা ভাবলেন, তিনি জনগণকে এই বলে ধোঁকা দিতে পারবেন যে, তাঁর দল বি এন পি-ও তাঁর 'ভিশন' বা লক্ষ্য পূরণে সমর্থ।


১৯৭৫ সালে থেকে বেশিরভাগ সময় ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও বি এন পি কোনোদিনই ' ভিশন' নামক কোনও ব্যাপারের কথা বলেনি। যা তারা করে এসেছে, তা হল বাংলাদেশকে ধ্বংস করার কর্মসূচী রূপায়ণ করা, বিশেষত ব্যাপক গুপ্তহত্যা এবং দূর্নীতির একটি রাজনৈতিক ব্যাবস্থা কায়েম করার মাধ্যমে। কী ভাবে ইসলামি জাতীয়তাবাদকে নিকৃষ্টতম দূর্নীতির আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তার জাজ্বল্যমান প্রদর্শন হয়েছিল  বি এন পি-র শেষ দফা শাসনকালে (২০০১-২০০৬)।


বি এন পি-র ভিশন বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্ত হিসেবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা বলে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্মস্থলে এবং এখনও তা বাংলাদেশের সংবিধানেরা প্রাথমিক আদর্শ। এ কথা পরিষ্কার নয়, কেন সমাজের সর্ব স্তরে পৌঁছোতে বাঙালি জাতীয়াতাবাদকে সরিয়ে অন্য কিছু আনতে হবে। মনে করা হচ্ছে, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান আদর্শের অবল্পুতি ঘটাতে এই কাজ করতে চাওয়া হচ্ছে।
তাঁর 'ভিশনে' খালেদা জিয়া জানিয়েছেন যে, সংখ্যালঘু সহ সব শ্রেণীর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, মতামত যাতে রক্ষিত হয়, তাঁর দল তা সুনিশ্চিত করবে। তিনি আরও বলেছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধের সংস্কৃতির অবসান চায় তাঁর দল। বলা হয়েছে যে, তাঁর দল চায় সব ধর্মীয় বিশ্বাসের শান্তিপূর্ন সহাবস্থান। কিন্তু  এ' ব্যাপারে বি এন পি-র অতীত ইতিহাস  সম্পূর্ন অন্য কথা বলে। খালেদা জিয়ার শেষতম রাজত্বকালে ২৫,০০০-এর বেশি আওয়ামী লীগ  নেতা এবং কর্মী খুন হয়েছেন শুধুমাত্র বি এন পি- বিরোধী হওয়ার জন্য। আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী এবং সংখ্যালঘুদের উপর নেমে এসেছিল এক ব্যাপক প্রতিহিংসামূলক আক্রমণ। ব্যক্তিগত সম্পত্তি লুট হওয়া ছাড়াও আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু সপ্রদায়ের মহিলাদের ধর্ষণের অন্তত ১০০ টি ঘটনা ঘটেছিল।  ২০০৯ সালে একটি বিচারবিভাগীয় তদন্তে দেখা গিয়েছিল যে, এই সব অত্যাচারের ঘটনায় জড়িত ছিল বি এন পি এবং তার মিত্র দল জামাতের অন্তত ২৬,০০০ কর্মী। সর্বোচ্চ জামাত নেতাদের বিরুদ্ধে আদালতের   যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত  রায়ের পর মূলত হিন্দুদের উপর-তাদের বাড়ি এবং ব্যবসা, এবং এই সম্প্রদায়ের ধর্মস্থানের উপর  যে আক্রমণ নেমে এসেছিল, তা নিয়ে নিশ্চুপ ছিল বি এন পি। নির্বাচনের আগে এবং তার অব্যবহিত পরে শত শত নিরীহ মানুষ বি এন পি-জামাতের সন্ত্রাসের বলি হয়েছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে তার পর অনেকদিন ধরে বি এন পি-জামাত জোটের নামিয়ে আনা সন্ত্রাসের তাণ্ডবে অগ্নিসংযোগ এবং পেট্রোল বোমা ছোঁড়ার ঘটনায়  ২৩১ জন নিহত এবং ১,১৮০ জন আহত হয়েছিলেন।

এইসব আক্রমণে ২,৯০৩ টি গাড়ি, রেলের ১৮ টি কোচ এবং আটটি যাত্রীবাহি জলযান পুড়ে ছাই হয়েছে। এ ছাড়াও ভাঙচুর অথবা ধ্বংস হয়েছে ৭০ টি সরকারি অফিস  এবং আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে  ছ'টি ল্যান্ড অফিস। খালেদা জিয়ার 'ভিশনে' অবশ্য এই সব পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি, ক্ষমা প্রার্থনা করা তো দূরের কথা।    এই ভিশন চায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে সংকুচিত  করতে এবং প্রশাসনিক ক্ষমতাপ্রয়োগে ভারসাম্য আনতে। কিন্তু কী ভাবে তা করা হবে, তার কোনও দিশা এতে নেই। সংসদীয় গণতন্ত্রে সব সময়েই কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর হাতে অন্য যে কারুর থেকে বেশি ক্ষমতা থেকে থাকে। এ ছাড়াও   খালেদা জিয়ার ভিশন একটি গণতন্ত্রে সংসদকে ক্ষমতার কেন্দ্রস্থল করে তোলার কথা বলে। সরকারি এবং বিরোধী দল হিসেবে বি এন পি-র যে নথিবদ্ধ ভূমিকা সাম্প্রতিক কালে দেখা যায়, তা অন্য কথা বলে। নবম সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তারা  ৪১৮ টি সংসদীয় দিবসের মধ্যে ৩৪২ টি দিন বয়কট করেছিল। ২০১৪ সালে গঠিত হওয়া দশম সংসদ এরা সম্পূর্ন ভাবে বয়কট করেছিল। এ কথা ভাবার কোনও কারণ নেই যে, এই একই নেতৃত্ব এবং দলীয় কাঠামো বজায় রেখে এবং লন্ডনে পালিয়ে থাকা দলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারিক রহমান লন্ডনে বসে ক্ষমতার সুতো তাঁর নিজের হাতে রেখেও বি ইএন পি ভবিষ্যতে অন্যরকম কিছু করবে।  বি এন পি চায় আওয়ামী লীগ সংবিধানে যে সব সংস্কার সাধন করেছে, সেগুলির পরিবর্তন ঘটাতে, বিশেষ করে তদারকি সরকার প্রথা ফিরিয়ে আনতে। বি এন পি এ' কথা যেন মনে রাখে যে, এই পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল দেশের সর্বোচ্চ  ন্যায়ালয়, সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে, যে রায়ে তদারকি সরকার-প্রথা অবৈধ বলে ঘোষিত হয়েছিল।

সেই বি এন পি যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদদের একটি তালিকা করতে চায়, তখন তার মধ্যে বিপদের গন্ধ পাওয়া যায়। শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সাম্প্রতিক অতীতে খালেদ জিয়া এবং কিছু শীর্ষ বি এন পি নেতা অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। এদের মন্তব্য পাকিস্তান সরকার, আই এস আই এবং যুদ্ধাপরাধীদের সহযোগী জামাতের মতই। এই যখন তাদের চেহারা, তখন তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা কঠিন। শহীদ এবং তাদের পরিবারদের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু করতে সত্যিই কি চায় এই দলটি ? কল্পনা করাও ভারি মুশকিল।


এই ভিশন থেকে এ ব্যাপার পরিষ্কার যে, বি এন পি গণভোটকে অগ্রাধিকার দিতে চাইবে। এর আগে, বিশেষত দলের প্রতিষ্ঠাত জিয়া উর রহমান ক্ষমতায় থাকার সময় বি এন পি যথেচ্ছভাবে গণভোট করিয়েছিল, যেগুলিতে অত্যন্ত সন্দেহজনক ভোটারদের আগমন ঘটেছিল।


বি এন পি-র ভিশন বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্ত হিসেবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা বলে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্মস্থলে এবং এখনও তা বাংলাদেশের সংবিধানেরা প্রাথমিক আদর্শ। এ কথা পরিষ্কার নয়, কেন সমাজের সর্ব স্তরে পৌঁছোতে বাঙালি জাতীয়াতাবাদকে সরিয়ে অন্য কিছু আনতে হবে। মনে করা হচ্ছে, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান আদর্শের অবল্পুতি ঘটাতে এই কাজ করতে চাওয়া হচ্ছে।


১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর, যখন জিয়াউর রহমান 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ'-এর আমদানি করেন, তখন সমস্ত পাকিস্তানপন্থী এবং স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তি এবং সংগঠন হয়ে ওঠে এই ধরণের জাতীয়তাবাদের রক্ষক, আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলা স্বাধীনতাপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের 'ভারতের এজেন্ট' হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকেন।   যে 'জয় বাংলা' স্লোগান ছিল  জাতীয়তাবাদের চিহ্ন, যা ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে  লক্ষ লক্ষ স্বাধীনতাসংগ্রামীকে চরম আত্মত্যাগে উদ্দীপ্ত করেছিল, তাকে বাতিল করে দিলেন জিয়াউর রহমান। তার জায়গায় এল নতুন স্লোগান- 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ,' যা 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ'-এরই মত। 


বি এন পি-র  ভিশন অপরাধ থেকে মুক্তির কথা বলে, যা সত্যিই হাস্যকর। এই সেই দল, যারা 'কোলাবরেটর্স অ্যাক্ট'  বাতিল কে ১৯৭৫ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের আইন করে সুরক্ষা দেওয়া এবং সুপরিচিত যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সহযোগীদের মন্ত্রী পদ সহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন উচ্চ স্থানে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।


সেই বি এন পি যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদদের একটি তালিকা করতে চায়, তখন তার মধ্যে বিপদের গন্ধ পাওয়া যায়। শহীদদের সংখ্যা  নিয়ে সাম্প্রতিক অতীতে খালেদ জিয়া এবং কিছু শীর্ষ বি এন পি নেতা অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। এদের মন্তব্য পাকিস্তান সরকার, আই এস আই এবং যুদ্ধাপরাধীদের  সহযোগী জামাতের মতই। এই যখন তাদের চেহারা, তখন তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা কঠিন। শহীদ এবং তাদের পরিবারদের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু করতে সত্যিই কি চায় এই দলটি ? কল্পনা করাও ভারি মুশকিল।

 




Video of the day
তাজা খবর Bangla News Today on 24 July 2017 Bangladeshi Live Latest Online Today Update News
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics