Column



শোকের মাস
শোকের মাস
বাংলাদেশে অগাস্ট মাস শোকের মাস। উনিশশো পঁচাত্তর সালের ১৫ অগাস্টের অভিশপ্ত রাতে এক দল সেনা অফিসার রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমান এবং দু'জন বাদে তাঁর পরিবারের সবাইকে বর্বর ভাবে হত্যা করেছিল। এই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানেরই বিশ্বস্ত সহকারী খোন্দকার মুস্তাক আহমেদের সঙ্গে যোগসাজশে । শেখ মুজিবের দুই কন্যা-শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা সেই সময় লন্ডনে ছিলেন। তাঁদের দেশে ফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, পুত্র, ভাই, ভাইপো এবং শ্যালক সহ পরিবারের ১৬ জন নিহত হন এই হত্যালীলায়।

টনার অব্যবহিত পরেই  খোন্দকার মুস্তাক আহমেদ ক্ষমতা লাভ করে নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। যে সেনা অফিসারেরা এই ঘৃণ্য হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলেন, তাঁদের রাতারাতি পদোন্নতি হল এবং সেনাপ্রধানের পদে নিযুক্ত হলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। এরপর খোন্দকার দেশে ইনডেমনিটি অর্ডিনান্স জারি করে শেখ মুজিব এবং চার জাতীয়তাবাদী নেতার হত্যার তদন্তের পথ বন্ধ করে দেন।

 

এ ব্যাপারে আদালত যে রায় দেয়, তা সাধারণ মানুষের অবরুদ্ধ আবেগকে মুক্তি দিয়েছিল। মানুষ বরাবরই এই মত পোষণ করতেন যে, ১৫ই অগাস্টের শোচনীয় ঘটনা মানুষের বিবেকে কলঙ্ক লেপনকারী এক ঘটনা। একই সঙ্গে তাঁরা সবসময়েই এই চেয়ে এসেছেন যে, স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্বলাভের জন্য যে মানুষটির কাছে বাংলাদেশ ঋণী, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণে এই দিনটি পালিত হোক।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবথেকে নারকীয় রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের পর খুনিদের একটি বিশেষ চার্টার্ড বিমানে করে ব্যাংককে চলে যেতে দেওয়া হল। সেখান থেকে তাঁরা চলে গেলেন লিবিয়ায়। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে চার জাতীয়তাবাদী নেতার হত্যার পরেই খোন্দকার 'খুনি মেজর'দের পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। অবশ্য এর পর অল্প কিছু দিনের মধ্যেই একটি সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন খোন্দকার মুস্তাক আহমেদ।

 

অতি অল্প সময়ের মধ্যে এই রকম কয়েকটি সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে  জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার এবং এসেই ইনডেমনিটি অর্ডিনান্সকে সংবিধিভুক্ত করে মুজিব হত্যাকারীদের নিরাপত্তার পাকাপাকি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দেয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের পর দেশের প্রথম সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ওই খুনে মেজরদের বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে কূটনীতিক হিসেবে নিযুক্ত করে 'পুরস্কৃত' করেন।

 

জেনারল এইচ এম এরশাদ, যিনি ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হন, তিনিও  তাঁর পূর্বসূরীদের পথ অনুসরণ করে মুজিব হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়া দূরের কথা, এই সব  ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দিয়ে যান এবং সেই সঙ্গে বিতরণ করেন পারিতোষিক। এর পরে ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার । গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত হলেও কার্যপদ্ধতিতে এই সরকার পূর্ববর্তী সামরিক সরকারগুলির থেকে কোনও অংশে আলাদা ছিলনা। একই ধারা অনুসরণ করে তারা। সরকারী উচ্চ পদ এবং পদোন্নতি ভোগ করতে থাকে খুনিরা।

তাই ১৫ই অগাস্ট জাতীয় শোক দিবস হিসেবে আবার প্রতিষ্ঠা পাওয়া মাণে বিএনপি এবং জামাতের কাছে এ এক এক মস্ত ধাক্কা। কিন্তু এই বিশ্বাস আবারও প্রতিষ্ঠিত হল যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই রাষ্ট্রের অবিসংবাদী জনক এবং যে ঘৃণ্য কান্ড ঘটানো হয়েছিল ১৯৭৫ এর ১৫ই অগাস্টে, তার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা হওয়া দরকার সর্বস্তর থেকে।

 

শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকান্ডের ২১ বছর পর তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি আইন খারিজ করে তাঁর পিতার হত্যাকারীদের শাস্তির পথ প্রশস্ত করেন।. রাষ্ট্রের জনকের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে ১৫ অগাস্ট তারিখটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

 

কিন্তু ২০০১ সালে আওয়ামি লিগ ক্ষমতা থেকে সরে গেলে এবং বিএনপি-জামাত সরকার ক্ষমতায় এলে সমস্তকিছুকেই লজ্জাজনক ভাবে পালটে দেওয়া হয়। খারিজ করে দেওয়া হয় জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ১৫ই অগাস্টের মর্যাদা। এতেও তৃপ্ত না হয়ে খালেদা জিয়া এমনকি ঘোষণনা করলেন যে, ১৫ই অগাস্ট নাকি তাঁর জন্মদিন, যদিও তাঁর স্কুলের নথিপত্র অন্য কথা বলে। তাঁর উদ্দেশ্য আর কিছুই না, এই দিনটি শোক দিবস হিসেবে পালন না করে আনন্দ-ফূর্তির দিন হিসেবে কাটানো। এর পর যে সব উদ্ভট কান্ডকারখানা ঘটতে লাগল, তার সঙ্গে কোনও সভ্য সরকারের থেকে মাফিয়া রাজত্বেরই মিল বেশি। 

 

১৫ই অগাস্টে জাতীয় শোক দিবস পালন করার প্রথা উঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বিএনপি-জামাত সরকারের রাজনৈতিক অদূরদৃষ্টি এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতার নিদর্শন। ইতিহাসের গতিপথ সঠিক জায়গায় ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয় রাজনীতিতে নৈতিকতার পুনর্জাগরনের জন্য যে উদ্যোগ শেখ হাসিনা নিয়েছিলেন, তাকে তুচ্ছ প্রতিপন্ন করার জন্যই বিএনপি-জামাতের এই প্রচেষ্টা।

 

পশ্চাদগামী রাজনীতির এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে জাতি সহসা সহর্ষে শুনল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (২০০৭-০৮) চালিকাশক্তি জেনারেল মইন ইউ আহমেদের বিবৃতি। জোরালো ভাষায় তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রের জনক এবং এ ব্যাপারে দ্বিতীয় কোনও মতের অবকাশ নেই। ১৫ অগাস্টের ব্যাপারে খালেদা জিয়া সরকারের সিদ্ধান্তের নিন্দা করে তাকে কুরুচিপূর্ন বলেন তিনি। অবশেষে সামরিক মদতে চলা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্যোগে বিষয়টি আদালতে যায়।

 

এ ব্যাপারে আদালত যে রায় দেয়, তা সাধারণ মানুষের অবরুদ্ধ আবেগকে মুক্তি দিয়েছিল। মানুষ বরাবরই এই মত পোষণ করতেন যে, ১৫ই অগাস্টের শোচনীয় ঘটনা মানুষের বিবেকে কলঙ্ক লেপনকারী এক ঘটনা। একই সঙ্গে তাঁরা সবসময়েই এই চেয়ে এসেছেন যে, স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্বলাভের জন্য যে মানুষটির কাছে বাংলাদেশ ঋণী, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণে এই দিনটি পালিত হোক।

 

১৫ই অগাস্টের হত্যাকান্ডকে জাতি সব সময়ই বাংলাদেশের অন্ধকারতম অধ্যায় বলে মনে করে এসেছে এবং  যাঁরা বিবেকবান মানুষ , তাঁরা সবসময় এ কথাই জোরের সঙ্গে বলে এসেছেন, যে সব ব্যক্তি এই ঘৃণ্যতম কর্ম করেছে, তাদের বিচার হওয়া দরকার। অবশেষে, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর দেশে নৈতিকতা এবং আইনের শাসন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। বিচারে মুজিবের হত্যাকারী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত ১২ জনের মধ্যে ৫ জনের শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালের ২৮শে জানুয়ারি তারিখে ফাঁসি হয়- অপরাধের ৩৫ বছর পরে সুপ্রিম কোর্টর আদেশানুসারে। ছ'জন অপরাধী এখনও পালিয়ে বেড়াচ্ছে, এক জন হত্যাকারী  মারা গিয়েছিল বিচারের আগেই।

 

বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের দুরভিসন্ধিমূলক সিদ্ধান্ত আদালত খারিজ করে দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই উল্লসিত পৃথিবীর সমস্ত স্তরের বিবেকবান মানুষ। এর বিভিন্ন কারন আছে। প্রথমতঃ, আদালতের এই পদক্ষেপ দেশের এবং বহির্বিশ্বের মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেবে সেই লজ্জা, গ্লানির কথা, যার মধ্যে দিয়ে তাদের যেতে হয়েছিল শেখ মুজিবের হত্যার সময়। দ্বিতীয়ত, মুজিব হত্যার পর থেকে অন্ধকার পথ ধরে   হেঁটে আসা মানুষজনের কাছে এটি একটি সুস্পষ্ট দিকচিহ্ন যে, বঙ্গবন্ধুর মূল্যবোধ এবং তার উত্তরাধিকার, যা বাঙালির সংস্কৃতি এবং প্রবাহমানতার উপর ক্রমান্বয়ে গুরুত্ব আরোপ করে, তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলতে হবে। বাংলাদেশের  সৃষ্টি এবং বাংলা ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপনের কৃতিত্বের দাবীদার আওয়ামি লিগকে এক অনন্য পরিচয় দান করেছে বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার।

 

তাই ১৫ই অগাস্ট জাতীয় শোক দিবস হিসেবে আবার প্রতিষ্ঠা পাওয়া মাণে বিএনপি এবং জামাতের কাছে এ এক এক মস্ত ধাক্কা। কিন্তু এই বিশ্বাস আবারও প্রতিষ্ঠিত হল যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই রাষ্ট্রের অবিসংবাদী জনক এবং যে ঘৃণ্য কান্ড ঘটানো হয়েছিল ১৯৭৫ এর ১৫ই অগাস্টে, তার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা  হওয়া দরকার সর্বস্তর থেকে।       




Video of the day
Today Bangla News
Recent Photos and Videos

Web Statistics