Column



ভয়াল একাত্তর - ফিরে দেখা
ভয়াল একাত্তর  - ফিরে দেখা
গত দু'বছর ধরে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালে উনিশশো একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার শুনানি চলছে। সেখানে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য জাগিয়ে তুলছে গণহত্যা, ধর্ষণের সেই ভয়াল স্মৃতি, যা ফিরিয়ে আনছে গণকবরে গাদা করা হাজার হাজার নিহত স্বাধীনতা সংগ্রামীর দেহ এবং অসহায় নারীদের যৌন নির্যাতন এবং হত্যার ছবি।

কী বীভৎসভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা অথবা বিকলাঙ্গ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যৌন নির্যাতনের পর অঙ্গচ্ছেদ করে মহিলাদের দেহগুলি  ঠেসে দেওয়া হয়েছিল নিকাশি নালা অথবা গণকবরে , কীভাবে পিছমোড়া করে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় হাজার হাজার মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল নদীতে, ধর্ষণ এবং ধর্ষিতাদের চরম কষ্টের কাহিনী--এ সবেরই বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া গেছে সাক্ষ্য থেকে।

 

কী বীভৎসভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা অথবা বিকলাঙ্গ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যৌন নির্যাতনের পর অঙ্গচ্ছেদ করে মহিলাদের দেহগুলি ঠেসে দেওয়া হয়েছিল নিকাশি নালা অথবা গণকবরে , কীভাবে পিছমোড়া করে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় হাজার হাজার মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল নদীতে, ধর্ষণ এবং ধর্ষিতাদের চরম কষ্টের কাহিনী--এ সবেরই বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া গেছে সাক্ষ্য থেকে।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসা জনৈক আব্বাসুদ্দিন আহমেদের জবানবন্দী থেকে জানা গেছে যে, তিনি নিজে অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের মৃতদেহ প্রকাশ্যে পড়ে থাকতে দেখেছেন। বিশদ  বর্ণনায় তিনি আরও জানিয়েছেন কীভাবে চট্টগ্রামের  গুডস হিল এলাকায় সালাউদ্দিন চৌধুরির  বাড়িটিকে বানান হয়েছিল একটি নির্যাতনের কারখানা, যেখানে  নারকীয় অত্যাচারের পর অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে খুন অথবা পঙ্গু করা হয়েছে এবং যৌন নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে মহিলাদের।

 

মহম্মদ সালিমুল্লা নামে আর একজন সাক্ষী জানিয়েছেন, প্রতি সকালে সালাউদ্দিন চৌধুরির গুডস হিলের বাড়ি থেকে একটি লাল রঙের জিপ বেরিয়ে যেত এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘোরার পর সন্ধ্যাবেলা আবার ফিরে আসত অল্পবয়সী এবং সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে। অল্পবয়সীদের নিকটবর্তী একটি বাড়ির ভিতর নিয়ে গিয়ে চলত সারা রাত ধরে যৌন অত্যাচার ও ধর্ষণ, আর সুন্দরী মহিলাদের তুলে দেওয়া হত পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের হাতে। " সেই মেয়েগুলির আর্ত চিৎকার আমি এখনও যেন শুনতে পাই," সাক্ষ্যদানকালে ভেঙ্গে পড়া সালিমুল্লা বলেছেন।

 

এর আগে, জামাতের উচ্চ পর্যায়ের তাত্ত্বিক নেতা দেলোয়ার হোসেন সাইদির বিচার চলাকালে একজন সাক্ষী জানিয়েছেন যে, সাইদি এবং পাকিস্তানি সেনাদের অন্যান্য স্থানীয় সহযোগীরা বাড়ি থেকে তাঁর তিন বোনকে তুলে নিয়ে পিরোজপুরে পাকিস্তানি শিবিরে দিয়ে আসে। সেখানে তিন বোনকে একাধিকবার ধর্ষণ করার পর তিন দিন বাদে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়া ওই সাক্ষী জানিয়েছেন। তিনি আদালতকে আরও বলেন যে, জোর করে তাঁকে, তাঁর বাবা-মাকে এবং ভাই-বোনদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়।

 

সাইদি মামলায় আর একজন সাক্ষী, মধুসূদন ঘরামি চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি, যখন তিনি জানান যে, একদিন ঘরে ফিরে তিনি দেখেন তাঁর স্ত্রীকে সাইদি ধর্ষণ করেছে। তাঁরা তখন সদ্য বিবাহিত দম্পতি। কাঁদতে কাঁদতে সাক্ষী জানিয়েছেন, "আমার স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। তার তখন প্রবল যন্ত্রণা হচ্ছিল। তবু সে আমাকে বলে তার জন্য চিন্তা না করে পালাতে, না হলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। এর পরে আমি পালাই।" যুদ্ধের পর ঘরামির স্ত্রী শেফালি একটি শিশু কন্যার জন্ম দেন। "সেই সময় গ্রামের লোকেরা ওর সম্পর্কে নানা কথা বলত," ঘরামি বলেছেন। ধর্ষণ এবং কলংকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত দম্পতি তখন সিদ্ধান্ত নেন যে, নিরাপত্তার জন্য শেফালি তাঁর মেয়েকে নিয়ে ভারতে চলে যাবেন। সেই তাঁদের শেষ দেখা। এর পরে ঘরামি আর কোনওদিনও শেফালি সম্পর্কে কিছু জানতে পারেননি।

আজ এই যুদ্ধাপরাধ বিচার চলার জন্যই বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত যাঁরা ১৯৭১-এর পরে জন্মেছেন, অনেক কিছু জানতে পারছেন। কী বর্বরতা, কী অত্যাচার চলেছিল তাঁদের পূর্বপুরুষদের উপর, আর কী চরম মূল্য দিতে হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য, বিচারচলাকালে খোলাখুলিভাবে তার অনেক কিছুই জানা যাচ্ছে। ধর্মের অপব্যবহার করে হত্যা, ধর্ষণ এবং অন্যান্য জঘন্য অপরাধের স্বপক্ষে যুক্তি খাড়া করার বিষময় ফল সম্পর্কেও সচেতন হচ্ছে আজকের প্রজন্ম।

 

কতজন মহিলা সেই সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগী, জামাত-সৃষ্ট আল-বদর, আল-শামস এবং রাজাকার সদস্যদের লালসার শিকার হয়েছিলেন, তার সঠিক হিসেব জানা যায়না। এ'সম্পর্কে নানা রকম সংখ্যার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু চল্লিশ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ননাগুলি আগের মতই ভয়াবহ, হৃদয়বিদারক।

 

মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতিতাদের সংখ্যা আনুমানিকভাবে দু'লক্ষ থেকে চার লক্ষ। ওয়ার্লড হেলথ অর্গানাইজেশনের হয়ে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে কাজ করতে আসা ডঃ জিওফ্রে ডেভিসের ধারনা সাধারনভাবে যে সংখ্যাগুলি বলা হয় সেগুলি আসল সংখ্যার তুলনায় 'অত্যন্ত রক্ষনশীল।'

 

ডেভিস বলেছেন যে, তিনি ধর্ষণের শিকার অসংখ্য মহিলার আত্মহত্যা এবং নবজাতককে হত্যা করার কথা শুনেছেন।তিনি জানান, আনুমানিক পাঁচ হাজার ধর্ষিতা মহিলা স্বেচ্ছায় গর্ভপাত করিয়েছিলেন। ঢাকায় একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে কাজ করা একজন চিকিৎসক সেই সময় এক লক্ষ সত্তর হাজার ধর্ষিতার গর্ভপাত এবং তিরিশ হাজার শিশুর জন্ম নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।  অত্যাচারের শিকার এইসব মহিলা্রা অনেকেরই যৌন সংক্রমণ ছাড়াও চরম লজ্জা এবং অবমাননায় ভুগেছেন। পরিবার এবং সমাজ পরিত্যক্তা হয়ে এঁরা অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

 

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এইসব ধর্ষিতারা দ্বিতীয়বারের মত অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হন। ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অফ জুরিস্টসের একটি রিপোর্ট জানাচ্ছে, "সঠিক সংখ্যা যা-ই হোক, ব্রিটিশ এবং আমেরিকান শল্য চিকিৎসকদের ক্রমাগত গর্ভপাত করিয়ে যাওয়া এবং সমাজে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য  লাঞ্ছিতা মহিলাদের  পরিবারগুলিকে বোঝাতে  সরকারের ব্যাপক প্রচেষ্টা থেকেই বোঝা যায় কী বিশাল আকারে এই ঘটনা ঘটেছিল।

 

আজ এই যুদ্ধাপরাধ বিচার চলার জন্যই বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত যাঁরা ১৯৭১-এর পরে জন্মেছেন, অনেক কিছু জানতে পারছেন। কী বর্বরতা, কী অত্যাচার চলেছিল তাঁদের পূর্বপুরুষদের উপর, আর কী চরম মূল্য দিতে হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য, বিচারচলাকালে খোলাখুলিভাবে তার অনেক কিছুই জানা যাচ্ছে। ধর্মের অপব্যবহার করে হত্যা, ধর্ষণ এবং অন্যান্য জঘন্য অপরাধের স্বপক্ষে যুক্তি খাড়া করার বিষময় ফল সম্পর্কেও সচেতন হচ্ছে আজকের  প্রজন্ম। 




Video of the day
NEWS24 NEWS 22 November 2017 Bangla latest News Today Bangla Breaking News BD News all Bangla
Recent Photos and Videos

Web Statistics