Column
কে এই যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন চৌধুরি ?

18 Aug 2013

#

উনিশশো একাত্তর সালে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বি এন পি-র সাংসদ এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা সালাউদ্দিন চৌধুরির মামলার রায় যে কোনও দিন ঘোষণা হতে পারে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে। বি এন পি-র স্ট্যান্ডিং কমিটির এই সদস্যের বিরুদ্ধে বিচার শেষ হয়ে গিয়েছে এবং মামলাটি এখন রায়ের অপেক্ষায়।

 অভিযোগ, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় চট্টগ্রামের নূতনচন্দ্র সিংহ সহ দু\'শোর বেশি মানুষের হত্যায় জড়িত ছিলেন সালাউদ্দিন। আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আনা চার্জে বলা হয়েছে লোকহিতৈষী কর্মী, শিক্ষাবিদ এবং চট্টগ্রামের জগৎমল্ল পাড়ায় ভেষজ ওষুধ কারখানা,কুন্দেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতনচন্দ্র সিংহের হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিলেন সালাউদ্দিন। চট্টগ্রামের উনসত্তরপাড়ায় ৬৯ জন মানুষের হত্যাকান্ডেও তিনি জড়িত ছিলেন। 

 
নূতনচন্দ্র সিংহ ছিলেন সালাউদ্দিন এবং তাঁর দলবলের হাতে একই দিনে খুন হওয়া ১১১ জন হিন্দুর অন্যতম।একজন প্রকৃত মুসলিম লীগ কর্মীর মতই, চট্টগ্রামে স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিশেষত হিন্দু নিধন অভিযানের পুরোভাগে থাকতেন সালাউদ্দিন। হত্যার পর জ্বালিয়ে দেওয়া হত  নিহতদের বাড়িঘর ।
 
দীর্ঘদিন ধরে বিচার চলাকালীন এই সালাউদ্দিন ব্যঙ্গোক্তি এবং আপত্তিজনক মন্তব্য করে বার বার কৌঁসুলি এবং বিচারকদের ক্রুদ্ধ করেছেন।
 
সালাউদ্দিনের পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরি ছিলেন পাকিস্তান সরকারের একজন প্রাক্তন ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং ষাটের দশকে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের অধ্যক্ষ। তাঁদের পরিবার সবসময়ই মুসলিম লীগের সমর্থক ছিল এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ফজলুল কাদের চৌধুরি নিজে পরিচিত ছিলেন পাকিস্তানীদের সহযোগী হিসেবে । 
 
সালাউদ্দিন, যিনি লন্ডনে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতোকত্তর করছিলেন, স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হতে দেশে ফিরে এসে তাঁর বাবার মতই আল বদর, আল শামস্ত এবং রাজাকারদের সংগঠিত করে পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় নেমে পড়েন। তাঁর নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কাজ ছিল বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের পাশবিকভাবে হত্যা করে তাঁদের সম্পত্তি লুঠ করা।
 
সালাউদ্দিনের চট্টগ্রামের গুডস হিল অঞ্চলের বাড়িটিকে ১৯৭১ সালে একটি অত্যাচারের কারখানায় পরিণত করা হয়েছিল। চরম অত্যাচার চালিয়ে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল এই বাড়িটির ভিতরে সেই সময়। তাই সালাউদ্দিনের নাম বাদ দিয়ে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের যে কোনও তালিকা অসম্পূর্ন থেকে যায়। স্বাধীনতা সংগ্রামের ন মাস জুড়ে দখলদারি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, তাঁদের উপর নারকীয় অত্যাচার,লুটপাট এবং মহিলাদের ধর্ষণ কান্ডে অংশ নেওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঠিক আগেই লন্ডনে পালিয়ে যান সালাউদ্দিন।
 
তাঁর পিতাসহ সালাউদ্দিনের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ভূমিষ্ঠ হওয়ার ঠিক দুদিন আগে, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর তারিখে নৌকাতে মায়ানমারে পালানর সময় ভারতীয় নৌসেনাদের হাতে ধরা পড়েন এবং তাঁদের বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পাকিস্তানিদের সঙ্গে সহযোগিতা করার অপরাধে ফজলুল কাদের চৌধুরির জেল হয় এবং বন্দী অবস্থাতেই ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে ১৯৭৩ সালে তিনি মারা যান।
 
উনিশশো পঁচাত্তরের অগাষ্টে বাংলাদেশের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পরে বাংলাদেশ ফিরে আসা সালাউদ্দিন ১৯৭৭ সালে মুসলিম লীগকে পুনর্গঠিত করে আবার সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন।সেই সময়কার সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান দখলদারি পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং স্বাধীনতা-বিরোধী সমস্ত জঙ্গি ইসলামি দলগুলির উপরে জারী থাকা নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিয়েছিলেন।
 
সর্বশক্তি দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করা  একজন আপাদমস্তক পাকিস্তানি এজেন্ট হওয়া সত্ত্বেও সালাউদ্দিন কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের একটি সরকারের মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদে ছিলেন বহুদিন। আর এই উভয় পধাধিকারবলেই তিনি  সরকারি গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে ঘুরেছেন দেশের সর্বত্র।  যে জাতীয় পতাকার জন্য হাজার হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামী জীবন বিসর্জন দিয়েছেন,ভাগ্যের পরিহাস, সেই পতাকাই গাড়িতে লাগিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন একজন পাক সহযোগী। 
 
জেনারেল এরশাদের আমলে ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসেবে থাকা সালাউদ্দিন ১৯৯৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনের আগে বি এন পি-তে যোগ দেন। দু\'হাজার এক সালে বিন এন পি-নেতৃত্বাধীন চার দলের জোট সরকার গড়লে তিনি হন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা।মুসলিম লীগ এবং পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাঁর পুরনো পারিবারিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং আই এস আই-য়ের সঙ্গে এক ঘনিষ্ঠ আঁতাত গড়ে তোলেন সালাউদ্দিন। পুরস্কার হিসেবে বি এন পি-জামাত সরকার তাঁকে অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কনফারেন্সের সেক্রেটারি জেনারেল পদে বসানর চেষ্টা করেছিল, যদিও তা সফল হয়নি।
 
বর্তমানে চলতে থাকা দু\'হাজার চার সালের চট্টগ্রাম অস্ত্র পাচার মামলায় প্রকাশ পেয়েছে যে, ওই ঘটনায় জড়িত  সালাউদ্দিনের সঙ্গে ভারতীয় জঙ্গি সংগঠন, আলফার যোগাযোগ ছিল।ওই অস্ত্র সম্ভার আলফার জন্যই পাঠান হচ্ছিল। ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন পাকিস্তানি হাই কমিশনের আধিকারিকবৃন্দ এবং দুবাইয়ের এ আর ওয়াই গ্রুপের সঙ্গে যোগসাজসে অস্ত্র পাচারের পিছনে সালাউদ্দিনের ভূমিকা প্রমাণ করেছে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ আই এস আই চক্রের এক অপরিহার্য অংশ। ্যদি চট্টগ্রাম অস্ত্র পাচার মামলার সঠিক পরিণতি হয়, তবে নিশ্চিতভাবে সালাউদ্দিন দোষী সাব্যস্ত হবেন। এর কারন, যে দু\'টি জাহাজ--এম ভি ওরিয়েন্ট এবং কিউ সি অনার--বিপুল পরিমান অস্ত্র বহন করে বাংলাদেশে পৌঁছেছিল, তাদের মালিকের নাম সালাউদ্দিন।
 
এর আগে, ২২০৭ সালে সালাউদ্দিন \'এ আর ওয়াই বাংলাদেশে টিভি\' চ্যানেলের সম্প্রচার শুরু করেন। এই টেলিভিশন নেটওয়ার্কটি আসলে আল কায়দা এবং আই এস আই-য়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকা দুবাইয়ের এ আর ওয়াই গ্রুপের একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মে আল কায়দার সহযোগী হিসেবে এ আর ওয়াই গ্রুপের ভূমিকার ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে জানা যায় ১৯৯৮ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে আমেরিকান দূতাবাসে বিস্ফোরণের ঘটনার পর। সামরিক মদতে চলা তৎকালীন তদারকি সরকারের একটি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবশ্য এ আর ওয়াই বাংলাদেশ টিভি চ্যানেলটি ২০০৭ সালেরই সেপ্টেম্বর মাসে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
 
দু\'হাজার ন সালের জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনার দল ক্ষমতায় আসার পরে পরেই সরকারকে ফেলে দিতে বাংলাদেশ রাইফেলসের একাংশকে দিয়ে যে বিদ্রোহ ঘটান হয়েছিল, তার পিছনে ছিলেন এই সালাউদ্দিন এবং তাঁর বি এন পি, জামাতের সহযোগীরা, আর সেই সাথে পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী। বিভিন্ন অপরাধ চক্রে সালাউদ্দিনের জড়িয়ে থাকার কথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়ী মহলে সুবিদিত। 
 
সালাউদ্দিনের পোষা একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র দুষ্কৃতীদল রৌজান এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে যাবতীয় অপরাধমূলক কাজকর্ম করে থাকে।বিভিন্ন থানায় জমা পড়া অভিযোগের উপর ভিত্তি করে এদের বিরুদ্ধে ৭২টি মামলা এখন পর্যন্ত চলছে।কিন্তু এইসব অপরাধের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার ওভিযোগে সালাউদ্দিনকে কখনও গ্রেপ্তার হতে হয়নি অথবা আদালতে হাজিরাও দিতে হয়নি। প্রথমবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় তদারকি সরকারের শাসনকালে, অপরাধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চলাকালীন।
 
এর পরে ঢাকার উপর চাপ সৃষ্টি করে পাকিস্তান সালাউদ্দিনকে জেল থেকে  ছাড়িয়ে আনে। তদ্বিরের জন্য সালাউদ্দিনের স্ত্রী বেশ কয়েকবার পাকিস্তানে গিয়ে সেখানকার উচ্চপদস্থ কর্তাসহ আই এস আই-য়ের অফিসারদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবেনা যে, বাংলাদেশের তৎকালীন সেনা প্রধান জেনারেল মইনু আহমেদ, যিনি তদারকি সরকারের পিছনে প্রধান শক্তি ছিলেন, তিনিও ২০০৮ সালে পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁর নেতৃত্বাধীন আলোচনাকারী দল নির্দিষ্টভাবে সালাউদ্দিন সম্পর্কেই পাক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু একই সময় জেলে বন্দী থাকা আওয়ামি লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা অথবা বি এন পি-র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ব্যাপারে কোনও কথা হয়নি।
 
উনিশশো একাত্তরে যুদ্ধ চলাকালীন মোট ২৩টি অপরাধের চার্জ আনা হয়েছে সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে। ভয়ংকর সেইসব অপরাধের কথা মনে রাখলে, তাঁর বিরুদ্ধে চরমদন্ড ছাড়া অন্য কোনও শাস্তির আদেশ হলে, তা হবে ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics