Column
বাংলাদেশঃ বিএনপি-কে হাইজ্যাক করল জামাত

02 Nov 2013

#

সুরাবর্দী উদ্যান ঢাকা--১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান এখানেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা করে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণটি দিয়েছিলেন। আরও একটি কারণে এই জায়গাটি ঐতিহাসিক--এখানেই পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল।

 কিন্তু ২০১৩-র ২৫শে অক্টোবর অন্য এক ইতিহাস তৈরি হতে দেখলে সুরাবর্দী উদ্যান। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮-দলের জোটের জনসভায় ২৭শে অক্টোবরের সকাল ছটা থেকে ২৯শে অক্টোবর সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত ৬০ ঘন্টার হরতালের ডাক দিলেন বেগম খালেদা জিয়া। এই হরতাল তাঁদের \'প্রাথমিক কর্মসূচী\', জানিয়ে তিনি এই বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, নির্বাচন সময়কালীন অরাজনৈতিক সরকার গঠনের ব্যাপারে বর্তমান সরকার যদি বিএনপি-র সঙ্গে ২৯ শে অক্টোবরের মধ্যে আলোচনা শুরু না করে, তবে  আরও তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। 

 
এ পর্যন্ত না হয়   ঠিক আছে। বাংলাদেশে সংঘাতের রাজনীতি এবং ব্যালট পরিহার করে রাস্তার লড়াইয়ের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার রাজনীতির অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন হরতাল।
 
যা সবচেয়ে লক্ষ্যনীয়, তা হল যে,  নির্বাচন সময়কালীন অরাজনৈতিকসরকারের দাবিতে ডাকা সমাবেশ শেষ পর্যন্ত জামাত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবি তোলা একটি জনসভায় পরিণত হয়। শুধু আধিপত্য রাখা নয়, জামাত ও তাদের ছাত্র শাখা, ইসলামি ছাত্র শিবির  কার্যত এই সভা তাদেরই জনসভায় পরিণত করেছিল। বিএনপি ও তাদের ছাত্র-যুব নেতাদের সরিয়ে দিয়ে মঞ্চের প্রথম সারির আসনগুলিও দখল করে বসেছিল তারাই। জামাত-শিবির কর্মীদের হাতে ধরা ব্যানার-প্লাকার্ডে ছিল যুদ্ধাপরাধ বিচারে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত অথবা এখনও বিচারাধীন শীর্ষ দলীয় নেতাদের ছবি। গুলাম আজম, দিলওয়ার হুসেন সাইদি, মুজাহিদ, কাদের মোল্লার মত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবি করে শ্লোগান দিচ্ছিল তারা। 
বিশিষ্ট ইংরাজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ছাত্র শিবিরের কর্মীদের পার্টি হাই কমান্ড থেকে বলা হয়েছিল জনসভার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিতে। এই একই ব্যাপার ঘটেছে বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গার জনসভাতেও। জনসভায় যোগ দিতে আসা মিছিলে অংশগ্রহনকারীদের ষাট শতাংশের বেশি ছিল জামাত-শিবিরের কর্মী এবং এদের অনেকের হাতেই ছিল বাঁশের লাঠি। 
 
 সকলের কাছেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, বিএনপি-কে হটিয়ে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিয়েছে জামাত-শিবির এবং এ ব্যাপারটি জিয়াউর রহমানের সময় থেকে পার্টির অনুগামীদের কাছে, বলাই বাহুল্য, হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।  তাই দিনাজপুরের মত কয়েকটি জায়গায় বিএনপি কর্মীদের একাংশ তাদের দলীয় মঞ্চ থেকে জামাত নেতাদের ভাষণ দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন।
 
তাঁর দল, বিএনপি এবং তিনি নিজেও জামাতের দাপটের কাছে কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন বুঝেই সম্ভবত জামাতের একটি সমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে খালেদা জিয়ার কাছে জামাতের শ্লোগানকে অনুসরণ করা ছাড়া উপায় ছিলনা। তিনি বলেন, " বর্তমান সরকার বহু নেতাকে বেআইনিভাবে জেলে বন্দি করে রেখেছে। এই সরকারকে তাড়াতে পারলেই আমরা তাঁদের মুক্ত করে আনতে পারব।"
 
এর আগে একবার খালেদা জিয়া দাবি করেছিলেন যে, ২৫শে অক্টোবরের পর আওয়ামি লীগ সরকার আর কোনও বৈধতা নেই। এই সমাবেশে আরও এক ধাপ এগিয়ে এই সরকার ২৭শে অক্টোবর থেকেই  সম্পূর্নভাবে \'অবৈধ এবং অসাংবিধানিক\' হয়ে গেছে। আরও খারাপ ব্যাপার হল, সমস্ত সরকারি কর্মচারী, পুলিশ, র‍্যাব এবং বর্ডার গার্ড বাহিনীর সদস্যদের কোনও সরকারি আদেশ পালন না করার ডাক দিয়েছেন তিনি। এইভাবে অবাধ্যতায় উৎসাহ দিয়ে তিনি আবার এই বলে সরকারি কর্মচারিদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, একটি \'অবৈধ সরকার\'-য়ের সঙ্গে সহযোগিতা করাও অবৈধ কাজ করার সামিল।  
 
খালেদা যে কতটা মরীয়া হয়ে উঠেছেন, তা তাঁর সর্বোত মিথ্যা দাবি থেকেই বোঝা যায়। ২০০৯ সালের ৬ই জানুয়ারি নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামি লীগ সরকার এবং তার মেয়াদ শেষ হবে ৫ই জানুয়ারি, ২০১৪-তে। সুতরাং এই সরকার কখনওই অবৈধ নয়। সংবিধান অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৪শে জানুয়ারি পর্যন্ত বর্তমান সংসদের সময়সীমা আছে। সংবিধানে এ কথাও বলা আছে যে, নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠন হওয়া পর্যন্ত আগের সরকার কাজ চালিয়ে যেতে পারে। সুতরাং সম্পূর্ন আইনগতভাবেই বর্তমান সরকার ২০১৪ সালের ২৪শে জানুয়ারি পর্যন্ত থাকতে পারে।
 
আরও একটি ব্যাপার হল, একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমতুল মর্যাদা পাওয়া বিরোধী দল নেত্রী হিসেবেই, অর্থাৎ সেই পদে থাকার সুবাদে যে সরকারি নিরাপত্তা এবং মর্যাদাসূচক পতাকা দেওয়া হয়, তা নিয়েই তিনি ২৫শে অক্টোবরের সেই জনসভায় যোগ দিয়েছিলেন। সরকারই যদি অবৈধ হয়, তবে তো বিরোধী নেত্রী হিসেবে তাঁর মর্যাদা ভোগ করাও অবৈধ বলতে হয়!
 
বস্তুতপক্ষে, ইচ্ছে করেই খালেদা এ কথা ভুলে গেছেন যে, তাঁর নেতৃত্বাধীন পূর্বতন সরকার ২০০৬ সালের ৯ই অক্টোবর মেয়াদ শেষ করলেও, ২৭শে অক্টোবর, ২০০৬-এ সংসদের সময়সীমা শেষ হওয়া পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকেছিল। তাই  এটা পরিষ্কার, তাঁর দাবি যে ধোপে টেঁকেনা, শুধু তাই নয়, অসামরিক এবং নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে সরকারকে অমান্য করার প্ররোচনা ছড়িয়ে এক ভয়ানক রাজনীতির খেলা খেলছেন তিনি। 
 
বাংলাদেশে রাজনীতির মানের কথা মাথায় রাখলেও বলতেই হবে বিএনপির প্রচারের ভাষা দিনে দিনে বিপজ্জনক থেকে বিপজ্জনকতর হয়ে উঠছে, যাতে জামাতের গোপন প্রভাব সুস্পষ্ট। উদাহরণ, বিএনপি-র চট্টগ্রাম সভাপতি এ কে চৌধুরি বলেছেন, শেখ হাসিনার সরকার পড়েই গেছে, এবং নভেম্বরের সাত তারিখে তার কবরপ্রাপ্তি হবে।  দলীয় কর্মীদের দা-কুড়ুল নিয়ে যারাই তাদের আটকাতে আসবে, তাদের প্রতিরোধ করার ডাক দিয়েছেন ঢাকার প্রাক্তন মেয়র এস এইচ খোকা। তাঁর এই আহ্বানে কার্যত জামাতের কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করার কথাই বলা হয়েছে, কারণ প্রতিপক্ষের লোকদের আক্রমণ করে সাধারনত তাদের টেন্ডন, অর্থাৎ অস্থিরজ্জু ছিন্ন করে দেয় জামাতের কর্মীরা। বলা যেতে পারে, টেন্ডন কেটে দেওয়া এখন জামাতের ছাত্র সংগঠন, শিবিরের \'সিগনেচার অ্যাটাক\' হয়ে দাঁড়িয়েছে।
 
একই রকমভাবে সংখ্যালঘুদের জন্য কি ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে, ২৭শে অক্টোবরের রাতে লালমনিরহাটের প্রত্যন্ত শফিনগর গ্রামে জামাত-শিবির-বিএনপি কর্মীদের লুঠতরাজ, তান্ডব থেকেই তার আন্দাজ পাওয়া ্যায়। সেখানে শুধুমাত্র হিন্দুদের দোকানই লুঠ হয়েছে, মুসলমানদের ৩০টির মত দোকানে কোনও হাত পড়েনি। 
 
বাংলাদেশ এবং সংলগ্ন অঞ্চলের পক্ষে সৌভাগ্যের ব্যাপার, পাকিস্তানের জোয়াল ছুঁড়ে ফেলার যে প্রবল  উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে, তা এখনও সমান এই দেশে, এবং তা জামাত-বিএনপি জোটকে চরম অসুবিধায় ফেলেছে। সুতরাং এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, \'আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান\', এই ব্যানার নিয়ে একত্র হওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছেলেমেয়েরা অক্টোবর মাসের ২৮ তারিখে সুরাবর্দী উদ্যানে শিক্ষা চিরন্তন বেদী তাঁদের রক্তে ধুইয়ে যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে খালেদা জিয়ার মন্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন। তাঁদের কথায়, দোষী সাব্যস্ত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবি করে দেশের স্বাধীনতার প্রতীকস্বরূপ ওই বেদী অপবিত্র করেছেন খালেদা জিয়া। 
 
এই ধরণের ঘটনাবলী বিএনপি এবং খালেদা জিয়াকে এই হুঁশিয়ারি দেয়  ্যে, তাঁদের দলীয় কর্মসূচী জামাতরা হাইজ্যাক করে নিয়েছে। তাঁদের বোঝা উচিৎ স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি এবং সংগ্রামের নায়কদের অবমাননা, আর সেই সাথে দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য দেশবাসী তাঁদের ক্ষমা করবেননা। 
 
নিবন্ধটিতে প্রকাশিত মতামত সালিম আলির।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics