Column
হরতালের কারবারি জামাত ও তার লক্ষ্য

09 Nov 2013

#

দফায় দফায় হরতাল ডাকা হয়েই চলেছে বাংলাদেশে। গত ২৭শে অক্টোবর থেকে টানা ৬০ দিন ধরে হয়ে গেল প্রথম দফার হরতাল। প্রতিদিন গড়ে সাতজন করে মানুষ নিহত হয়েছেন এই সময়। এর পরে ডাকা হল দ্বিতীয় দফার হরতাল, এবং সেটিও চলল ৬০ দিন। বিরোধীরা আগে ঘোষণা করেছিলেন হরতাল শান্তিপূর্ন থাকবে। দেশের মানুষ জানেন কত শান্তিপূর্নভাবে পালিত হয়েছে সেই হরতাল। সকলেই জানেন দ্বিতীয় দফায় কত জন হতাহত হয়েছিলেন। অথচ এই হরতালকে কেন্দ্র করে হিংসা এবং মৃত্যুর দায় এসে পড়ল সরকারের উপর। খুবই আশ্চর্যের বিষয়!

 গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হরতাল ডাকা বিরোধীদের বৈধ অধিকার। কিন্তু যখন সব ধরণের প্রতিবাদই ব্যর্থ হয়, তখনই হরতাল হয়ে ওঠে সরকারের বিরুদ্ধে শেষ অস্ত্র, । তখন স্বতস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন  বিরোধীদের ডাকা হরতালের সমর্থনকারীরা । হরতাল সফল করতে তখন তাঁদের জোর খাটাতে হয়না, ভয় দেখাতেও হয়না। আর এই প্রতিবাদ প্রধানত অহিংস হওয়া উচিত। এই সময় ঘটবেনা কোনও রকম শারীরিক আক্রমণ, হিংসা, ভাঙচুর, আগুন লাগান অথবা হত্যার ঘটনা।  

 
কিন্তু বাংলাদেশে যারা জোর করে হরতাল পালন করছে, এইসব নীতি-নৈতিকতায় তাদের কোনও শ্রদ্ধা নেই। সরকারি বাড়ি আক্রমণ করা, জনগণের সম্পত্তির ক্ষতি করা, বাস এবং অন্যান্য যানবাহনে আগুন লাগান এবং যে ভাবে পারা যায়, জাতীয় সম্পত্তি ধ্বংস করাই হয়ে উঠেছে তাদের প্রধান লক্ষ্য। এই হিংসা এতই প্রবল হয়ে উঠেছে যে, অ্যাম্বুলেন্স এবং শববাহী গাড়িও আক্রমণ থেকে বাদ পড়ছেনা। রাজনৈতিক দাবি আদায়ের জন্য চরম বিপদের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিরোধীরা, যাঁরা হরতালের ডাক দিচ্ছেন, তাঁরা কি এই হিংসার নিন্দা করবেন ? যে আকারের হিংসা প্রথম দফার হরতালের সময় দেখেছেন দেশের মানুষ, এক কথায় তা নজিরবিহীন। 
 
আগে হরতালের সময় রেল যাত্রাকে নিরাপদ মনে করা হত। দূরপাল্লার বাস পরিষেবা হরতালের ফলে ব্যহত হলেও পণ্যবাহী গাড়িগুলিকে বাদ রাখা হত হরতালের আওতা থেকে। তার ফলে স্বাভাবিক থাকত বাজারে খাদ্যদ্রব্য, শাকসব্জি এবং অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের যোগান। কিন্তু এর ব্যাতিক্রম দেখা গেছে সাম্প্রতিক কালের ডাকা হরতালগুলিতে, যখন এমন কি আমদানি-রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোষাক রপ্তানি করে। আমদানিকারী ওই সব ইওরোপিয়ান দেশে ক্রিসমাস এবং ইংরাজি নব বর্ষ দু\'টি প্রধান উৎসব এবং এই সময় সেখানে বাংলাদেশে তৈরি পোষাকের চাহিদা বাড়ে।বাংলাদেশের পোষাক প্রস্তুতকারকরাও এই দু\'টি উৎসবের জন্য আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করে থাকেন। তাই পোষাক রপ্তানিকারীরা সরকার এবং বিরোধী--উভয় পক্ষের কাছেই রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করার পথ খুঁজে বের করার আবেদন জানিয়েছেন। জাতীয় স্বার্থেই তা করা দরকার।
 
ঘন ঘন হরতাল শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষাক্রমেরও চরম ক্ষতি করে চলেছে। যখন শিক্ষামন্ত্রী এই ধরণের হরতালের সমালোচনা করেন, তখন হরতালের স্বপক্ষে বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়ার যুক্তি, বিএনপি-জামাতের শাসনকালে আওয়ামি লিগও একই কাজ করেছে। তিনি হয়তো ঠিকই বলেছেন। কিন্তু সেই সব দিনগুলিতে এত হিংসা দেখেনি দেশ, নিহত হননি এত মানুষ। তা ছাড়াও আওয়ামি লিগ করেছে বলেই আজকের বিরোধীরাও তাই করবে, এমন যুক্তি অচল। 
 
যা অবস্থা বর্তমানে, হরতালের সময় মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেননা। এমন কি ঘরেও তাঁরা নিরাপদ নন, কারণ সেখানেও বোমা, গ্রেনেড ছোঁড়া হচ্ছে। 
 
বিএনপি-নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের জোট প্রকৃতপক্ষে বিএনপি এবং জামাতেরই মিলিত রূপ। কারণ অন্যান্য দলগুলি সব কার্যত এক জনের দল। আর এই অবস্থায় জামাত এবং তার ছাত্র সংগঠন, শিবির হয়ে উঠেছে হরতালের অপ্রতদ্বন্দ্বী কারবারি। জোটের অংশীদার হিসাবে জামাতের ক্ষমতায় আসার কোনও পরিকল্পনা নেই। যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তবে তারা তাদের ল্যাজ ধরে কড়ায় গণ্ডায় নিজদের পাই পয়সা  আদায় করে নেবে। কি সে পাওনা ? তা হল, জামাতের সমস্ত শীর্ষ নেতা, যাঁরা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং বিচারে যাঁরা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তাঁদের সবাইকে মুক্তি দিতে হবে। বস্তুতপক্ষে জামাত নেতৃত্বকে এই মর্মে আশ্বাস দিয়ে খালেদা জিয়া বেশ কয়েকবার বলেওছেন যে, ক্ষমতায় এলে তিনি যুদ্ধাপরাধ বিচার বন্ধ করে দেবেন। 
 
সামনের সংসদীয় নির্বাচনকে ঘিরে যে জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দেশে, মানুষ চান তার শান্তিপূর্ন সমাধান। হরতালের নামে হিংসা, দাঙ্গা আর হত্যার ঘটনায় তাঁরা চরম হতাশ।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics