Column
জামাতের পথেই বিএনপিঃ যাতনায় বাংলাদেশ

27 Nov 2013

#

প্রায় প্রতিদিন হরতালে জর্জরিত বাংলাদেশ এখন অবশ্যম্ভাবী অর্থনৈতিক সংকটের কবলে।

 বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান একটি সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, প্রতিটি হরতালের দিনে  ৪।৯ লক্ষ (০।৪৯ মিলিয়ন) লিটার দুধ হয় নষ্ট হচ্ছে নয়তো জলের দরে বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। 

 
একটি সংবাদ সংস্থার হয়ে এই সম্পর্কে যিনি নিবন্ধ লিখেছেন, সেই সালিম হক জানিয়েছেন, যদিও তিনি  ক্ষতির সঠিক পরিমাণের ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন, তবু বলতেই হয়, এই ক্ষতি শুধু বিপুল নয়, অপরাধমূলকও।
 
"যে দেশে শিশু অপুষ্টি এত ব্যাপক, সেখানে একদিনের হরতালের জন্য ৪।৯ লক্ষ লিটার দুধ নষ্ট হওয়া অথবা সামান্য দামে বিক্রি হওয়া গুরুতর অপরাধ ছাড়া কিছু না। বিএনপি-র ডাকা শেষ হরতালটি ছিল ৮৪ ঘন্টার। সুতরাং ওই ক\'দিনে নষ্ট হয়েছে আনুমানিক ২০ লক্ষ লিটার দুধ," নিবন্ধটিতে হক বলেছেন। 
 
তিনি লিখছেন, " অক্টোবরের ২৭ থেকে নভেম্বরের ১৩ তারিখের মধ্যে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন বিরোধীরা মোট ন\'দিন হিংসাত্মক হরতাল পালন করেছে। এর  মধ্যে বেশ কয়েকটি হরতাল চলেছে টানা একাধিক দিন ধরে।"
 
এই ধর্মঘটগুলিতে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন দুধ উৎপাদন ক্ষেত্রে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা। এছাড়াও নির্মান ক্ষেত্রের শ্রমিক, ঠেলাওয়ালা,  কুলি এবং ছোট দোকানী প্রভৃতি দৈনিক আয়ের উপর নির্ভরশীল মানুষরা, যাঁরা দৈহিক শ্রমের বিনিময়ে দিনে মোটামুটিভাবে ২০০ টাকা রোজগার করে থাকেন, তাঁরাও চরম ক্ষতিগ্রস্তদের দলে। কারণ, হরতাল হলে সব কাজ বন্ধ থাকে, আর তাঁদের শ্রমেরও দরকার থাকেনা কারুর কাছে।বেঁচে থাকার জন্য সামান্য আয়ের উপর নির্ভরশীল এইসব মানুষদের পরিবারগুলির দুর্দশা সহজেই অনুমেয়। 
 
হিংসার ব্যাপারে বলতে গিয়ে হক লিখছেন, "সংবাদমাধ্যমে প্রচুর ভয়ংকর এবং মর্মান্তিক সব ঘটনার খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে আছে হরতালের সমর্থনকারীদের আগুন লাগানো বাসের ভিতর বাচ্চাদের জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হওয়া কিংবা রেলগাড়িকে উলটে ফেলার জন্য লাইন খুলে নেওয়ার কাহিনী। নিহতদের সংখ্যা এক এক জায়গায় এক এক রকম দেওয়া হয়। কিন্তু সংখ্যার থেকেও বেশি যে ব্যাপারটি ধাক্কা মারে, তা হল এই পাশবিক হত্যা, যা জামাত করছে। এদের আক্রমণে যাঁরা খুন অথবা গুরুতরভাবে আহত হন, অবধারিতভাবে তাঁদের কোপান হয় এবং পায়ের টেন্ডন কেটে নেওয়া হয়। এই কায়দা জামাত এবং তার ছাত্র সংগঠন,ইসলামি ছাত্র শিবিরের একেবারেই নিজস্ব।"
 
এইসব লাগাতার ধর্মঘট থেকে কি সুবিধা পাওয়ার আশা করেন বিএনপি সর্বাধিনায়িকা বেগম খালেদা জিয়া?, লেখক প্রশ্ন করেছেন। 
 
একটি উদ্দেশ্য অবশ্য পরিষ্কার। তা হল, দেশে এমন পর্যায়ের হিংসার এবং অস্থিরতার আবহ তৈরি করা, যার প্রতি সারা পৃথিবীর নজর পড়ে। তাই হচ্ছে। খালেদার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল, শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকার নয়, একটি অরাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন করানর দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করা।
 
হকের বক্তব্য অনুসারে, এই দুই রাজনৈতিক নেত্রী যে একে অন্যকে সহ্য করতে পারেননা, সে কথা বাদ দিলেও হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় নির্বাচন হোক, তা যে খালেদা চাইছেননা, তার একটি বড় কারণ তাঁর ভয় যে, তাহলে নির্বাচনে কারচুপি হবে। দেশের রাজনীতিতে যে মেরুকরণ দেখা দিয়েছে তাতে এই যুক্তি হয়তো মেনে নেওয়া যেত যদিনা নির্বাচন পরিচালনার জন্য তদারকী সরকারের প্রয়োজনীয়তা সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দিত। 
 
"সুতরাং আইনগত দিক দিয়ে হাসিনা শক্ত জমির উপর দাঁড়িয়ে আছেন। তার উপর, যখন সংসদে তদারকি সরকারের বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন খালেদার দল সেই উদ্দেশ্য গঠন করা কমিটিকে বয়কট করে এবং তাদের কোনও বক্তব্যও জানায়নি," হক লিখেছেন।
 
এখন যখন নির্বাচন দোড়গোড়ায় এসে পড়েছে, তখন সব গেলো বলে চিৎকার করে দেশকে ভয়াবহ হিংসার  আবর্তে ছুঁড়ে ফেলা কি খালেদার পক্ষে ন্যায্য কাজ হচ্ছে ? অবশ্যই না। কিন্তু জমানা পরিবর্তন করার একমাত্র চিন্তা তাঁকে এতটাই আচ্ছন্ন রেখেছে যে  একের পর এক চলতে থাকা হরতালের বিধ্বংসী পরিনতি নিয়ে তিনি ভাববেনই না বলে ঠিক করেছেন। 
 
দুঃখের ব্যাপার হল,খালেদা মনে করছেন  হরতাল ডেকে হাসিনাকে অরাজনৈতিক সরকারের দাবি ্মানতে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু তা করতে গিয়ে বাস্তবে তিনি জামাতের দেখানো পথে চলছেন। হক বলছেন, বিএনপি-র আড়ালে থেকে যাবতীয় সিদ্ধান্ত যারা নিচ্ছে, তারা জামাত। কারণ হরতালের পর হরতাল ডেকে ্যুদ্ধাপরাধ বিচার বিলম্বিত করাই সবথেকে বড় লক্ষ্য জামাতের। 
 
এবং এই কৌশল কাজ দিচ্ছে। ট্রাইব্যুনাল ১ এবং ট্রাইব্যুনাল ২-এ জামাত নেতা মতিউর রহমান নিজামি এবং এ কে এম ইউসুফের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলার শুনানি সময়মত হতে পারেনি। \'অনিবার্য পরিস্থিতি\'-র কারণ দর্শিয়ে আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন তাঁদের কৌঁসুলিরা, যদিও বিচারক, সরকারী আইনজীবী, সাক্ষী এবং অভিযুক্ত--সবাই সেখানে সেদিন উপস্থিত ছিলেন। 
 
এই ধরণের ঘটনা এই প্রথম নয়। হরতালের দিনে এর আগেও \'নিরাপত্তার অভাব\'-য়ের দোহাই দিয়ে ট্রাইব্যুনালে শুনানির দিন গরহাজির থেকেছেন অভিযুক্তদের আইনজীবীরা। 
 
বিচার বিলম্বিত করার এই কৌশল নেওয়া হয়েছে এই আশায় যে, সরকারের পরিবর্তন ঘটলে বিচারও পুরোপুরিভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। 
 
এই ব্যাপারে ডেইলি স্টার পত্রিকায়  জামাতের আইনজীবী তাজুল ইসলামকে উদ্ধৃত করা খবর দেখা যেতে পারে ঃ" আমরা হরতালের দিন হাজির থাকবনা (আদালতে)।" আদালত যে পুলিশি নিরাপত্তা দিয়ে পরিবহনের ব্যবস্থা করবে, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেন, পুলিশি নিরাপত্তার উপর তাঁদের আস্থা নেই।"
 
বিরোধীরা এইভাবে চালিয়ে গেলে যুদ্ধাপরাধ বিচার পিছিয়েই যেতে থাকবে, এবং তার ফলে ১৯৭১ সালের ভয়াবহ গণহত্যার বিচারের শেষও মানুষ দেখতে পারবেননা। 
 
চতুর জামাত বুঝে নিয়েছে ক্ষমতা দখলের জন্য খালেদা এবং তাঁর দল বিএনপি এতটাই মরীয়া যে, তদারকি সরকারের দাবি আদায়ের জন্য তারা জামাত-প্রচলিত লাগাতের ধর্মঘটের পথেই যাবে। 
 
কিন্তু বিএনপি-জামাতের যাবতীয় হিংসাত্মক ধর্মঘট এবং তার ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক দুর্দশার সমস্ত বোঝাই টানতে হবে দেশকে এবং দেশের সাধারণ মানুষকেই। 



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics