Column
সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে লড়তে হলে

02 Jan 2014

#

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে জুম্মা প্রার্থনার পর চরমপন্থী সংগঠন হিজব-উত-তাহির রাস্তায় নেমে নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়।দেশে 'খেলাফত' প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ওই সংগঠনের নেতা ও কর্মীরা এখন গোপন বৈঠক করা এবং প্রচারপত্র বিলি করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সেদিন পুলিশ বাহিনী গুলি চালিয়ে এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটিয়ে দাঙ্গাকারীদের হটিয়ে দিয়েছিল। সেই ঘটনায়   অন্তত সাতজন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এই জঙ্গি ইসলামি সংগঠনটি সরকারকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানিয়েই ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য জায়গায় তাদের সাংগঠনিক কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। 
 
এইভাবেই অসংখ্য প্রচারপত্র ছাপিয়ে এইচ ইউ টি ঘোষনা করেছে, খেলাফতের দাবিতে তারা ঢাকা সহ সারা দেশে সমাবেশ ও মিছিল করবে। ঢাকা এবং শহরতলির গুরুত্বপূর্ন জায়গাগুলিতে সাঁটা তাদের পোস্টারে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বর্তমান সরকারকে উৎখাত করে খেলাফত প্রতিষ্ঠার ডাক দেওয়া হয়েছে। তাদের অন্য দাবিগুলির মধ্যে আছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেল রক্ষা করা, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলা এবং আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন ও ভারতের প্রভাবমুক্ত হওয়া। ২০০৯ সালে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসাবে ঘোষিত হওয়ার পরেও এখনও এইচ ইউ টির কার্যকলাপে ঘাটতি নেই। 
 
দেশের ইসলামি আইনের শাসনের দাবিতে এই মৌলবাদি সংগঠনটির কর্মীরা প্রকাশ্যে নাশকতামূলক এবং গণতন্ত্র বিরোধী কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। ২০০৯ সালের ২০শে অক্টোবর যখন এইচ ইউ টি নিষিদ্ধ হয়, তখন তাদের চিফ কোঅর্ডিনেটর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ম্যানেজমেন্টের  অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমেদ এবং গোলাম মওলা, কাজি মোরশেদুল হক এবং মাহমুদি বারির মত শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এইচ ইউ টি আসলে একটি       আন্তর্জাতিক  ইসলামি জঙ্গি সংগঠন, পৃথক প্যালেস্টাইনের জন্য লড়াই করতে ১৯৫৩ সালে জেরুজালেমে যার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। বাংলাদেশে ২০০০ সালে এরা সংগঠন গড়ে  তোলে।
 
চট্টগ্রাম থেকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া এইচ ইউ টি সদস্য নাজমুল হুদা দেশজুড়ে তাদের জঙ্গি কার্যকলাপের বিশদ প্রকাশ করেছে। তার কথা অনুসারে, চট্টগ্রামের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির আরবির অধ্যাপক মহিউদ্দিন ওই অঞ্চলে এইচ ইউ টি-র চিফ কোঅর্ডিনেটর ছিলেন। ওই বিশ্ববিদ্যালয়টি কার্যত সম্পূর্নভাবে জামাত-নিয়ন্ত্রণাধীন। সেখানকার প্রায় সব শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মচারীই হয় জামাতের নেতা, নয় কর্মী অথবা সমর্থক।  জামাতের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মির কাশিম আলি, যিনি সৌদি আরবের এন জি ও রাবেতা-আল-আলম-আল-ইসলামির বাংলাদেশস্থ ডিরেক্টর, তাঁর বেশ কয়েকটি বাড়ি আছে আই আই ইউ সংলগ্ন চকবাজার অঞ্চলে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষক-কর্মচারী সেইসব বাড়িতে থাকেন বলে জানা গেছে।
 
এইচ ইউ টি-র সাম্প্রতিক প্রচারপত্র এবং পোস্টারগুলিতে শেখ হাসিনাকে ভারত এবং আমেরিকা সহ ইসলাম বিরোধী শক্তিগুলির দালাল বলে অভিহিত করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের ২৫ তারিখে  বি ডি আর-বিদ্রোহের বার্ষিকীতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে প্রচারপত্র ছড়িয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দিয়ে দেশে খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক কর্মীদের ডাক দিয়েছিল এই সংগঠন। এই প্রচারপত্রগুলিতে বি ডি আর বিদ্রোহ ঘটিয়ে সামরিক অফিসারদের হত্যা করে \'ভারতীয় আগ্রাসনের সামনে বাংলাদেশের সামরিক শক্তিকে দূর্বল করা\'-র অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। এর উদ্দেশ্য ছিল সামরিক কর্মীদের মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগিয়ে তোলা।
 
নিরাপত্তা বাহিনীর ধরপাকড় চলা সত্ত্বেও এইচ ইউ টি নিজেদের পুনর্গঠিত করে চলেছে। বাংলাদেশে ২০০০ সালে সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকেই এদের একমাত্র লক্ষ্য ইসলামি ধর্মীয় আইন অথবা শরিয়া অনুযায়ী দেশ শাসনের জন্য খেলাফতের প্রতিষ্ঠা করা।
 
বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর এইচ ইউ টি-র ইউ কে-শাখা এখানকার সংগঠনকে কাজ কর্ম চালিয়ে যাওয়ার জন্য নানা গোপন উপায়ে তহবিল যুগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশে এইচ ইউ টি নিষিদ্ধ হওয়ার পর ব্রিটেনে তাদের শাখা সে দেশে বাংলাদেশ মিশনের সামনে বিক্ষোভও দেখিয়েছিল। আল কায়দার সাথে যোগাযোগ থাকার জন্য পৃথিবীর ২০টি দেশে এইচ ইউ টি নিষিদ্ধ। 
 
২০০৬ সালে বাংলাদেশের এন জি ও ব্যুরো-র করা একটি হিসাবে জানা গেছে, এইচ ইউ টি এবং অন্যান্য চরমপন্থী সংগঠনগুলিকে আন্তর্জাতিক ইসলামি এন জি ও-গুলি থেকে পাঠান অর্থের পরিমাণ বছরে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা। গোয়েন্দা দপ্তরের বিশ্বাস এই তহবিল লিবিয়া, সৌদি আরব, আবু ধাবি, পাকিস্তান, কুয়েত, মিশর এবং কাতারের মত দেশগুলি থেকে নিয়মিতভাবে পাঠান হয়। এ ছাড়াও হাওলার মাধ্যমে জঙ্গিরা টাকা পেয়ে থাকে। একটি খবর অনুযায়ী, সৌদি আরবের বার্ষিক বাজেটের চার শতাংশই সারা পৃথিবীতে ইসলামের স্বার্থে খরচ করা হয়। এর মধ্যে আবার দুই শতাংশ রাখা থাকে ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষত ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জন্য। এই অর্থ এইসব দেশের নানা জায়গায় থাকা  বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় পাকিস্তানের আই এস আই-য়ের মাধ্যমে ।
 
নেতারা জেলে গেলেও দেশে গোলমাল পাকাতে এইচ ইউ টি-র কর্মীরা হাত মিলিয়েছে জামাত ও  তার ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের সঙ্গে। নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি আরও শক্ত করতে জামাত দেশের অন্যান্য জঙ্গি ইসলামি সংগঠনগুলি এবং বিএনপি-র সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়াতে জোরদার চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য, যুদ্ধাপরাধ বিচার বানচাল করা, কারণ এই বিচার চললে দলের মেরুদন্ডই ভেঙ্গে যাবে।
 
এইচ ইউ টি এবং বাংলাদেশের অন্যান্য সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি আল কায়দা ও তালিবান জিহাদিদের হাতে তৈরি। তাদের সদস্যদের অস্ত্র শিক্ষা হয়েছে পাকিস্তানি আই এস আই এবং লস্কর-এ-তৈবার কাছে। সুতরাং এইসব সংগঠন বা সংস্থাগুলির সঙ্গে এদের আছে নাড়ির যোগ। তাই  কিছু বিক্ষিপ্ত হিংসাত্মক ঘটনায় জড়িত থাকার জন্য মাঝে মাঝে এদের নেতাদের গ্রেপ্তার করে এইচ ইউ টি-র জঙ্গিপনা দমন করা যাবেনা।দরকার এই সংগঠনের পরামর্শদাতা এবং পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা এবং অর্থের উৎসগুলিকে  বন্ধ করে দেওয়া। তা না হলে এই বিপদ থেকেই যাবে। 

 




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics