Column
বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ঃ অতীত অস্বীকার পাকিস্তানের

03 Jan 2014

#

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিস্তৃত খবর বাইরের পৃথিবীকে প্রথম যিনি জানিয়েছিলেন,

 তিনি একজন পাকিস্তানি সাংবাদিক-- অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করার কাজ শুরু হওয়ার অল্প পরেই ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে  মাসকারেনহাসকে এই সংঘর্ষের উপর প্রতিবেদন লিখতে আমন্ত্রন জানানো হয়। পাকিস্তান সরকার ভেবেছিল এর ফলে দেশের পূর্বাঞ্চলে নিছকই একটি যুদ্ধ চলছে বলে তারা যে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছিল, তা জোরদার হবে। মাসকারেনহাস, যিনি চোখে দেখা সত্যি ঘটনা লিখেছিলেন, জানতেন আর বেশিদিন পাকিস্তানে বাস করা যাবেনা। তাই খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রথমে নিজের পরিবারকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেন, পরে নিজেও সেখানে চলে যান। 

 
"কুমিল্লায় নবম ডিভিশনের সেনা অফিসারদের সঙ্গে আমি ছদিন ধরে ঘুরে বেড়িয়েছি, আর খুব কাছ থেকে হত্যার ব্যাপকতা দেখেছি," একটি দীর্ঘ, সাহসী প্রতিবেদনে মাসকারেনহাস লিখেছেন। সানডে টাইমসের ১৩ই জুন, ১৯৭১ সংখ্যায় \'জেনোসাইড\' শিরোনাম দিয়ে ওই প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছিল। 
 
"আমি দেখেছি গ্রাম থেকে গ্রামে, বাড়ি থেকে বাড়িতে হানা দিয়ে হিন্দুদের তুলে নেওয়া হয়েছে, তারপর শরীর হাতড়ে যখন দেখা গেছে তাদের সুন্নৎ করা নেই, সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে মারা হয়েছে। আমি শুনেছি কুমিল্লার সার্কিট হাউজের চত্বরে পিটিয়ে মারা মানুষদের আর্তনাদ। দেখেছি ট্রাক ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অন্য আরও মানুষকে শিকার হিসাবে।" 
 
চার দশক পরেও সেই মাসকারেনহাসের সরকার এখনও  অতীতকে অস্বীকার করে যাচ্ছে--অসামরিক ব্যক্তিদের গণহত্যা (সম্ভবত তিরিশ লক্ষ মানুষ), হিন্দুদের আক্রমণের লক্ষ্য করা, হাজার হাজার পরিকল্পিত ধর্ষণ--সবই।ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে বাংলাদেশের প্রধান ইসলামি দল, জামাত-এ-ইসলামি নেতা আবদুল কাদের মোল্লার সাম্প্রতিক ফাঁসির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি প্রস্তাব নেওয়া হয়। ১৯৭১ সালে সংগ্রামের সময় পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সহযোগিতা করা মোল্লাকে হত্যা এবং ধর্ষণের মামলায় বাংলাদেশের একটি আদালত দোষী সাব্যস্ত করে। মোল্লাকে পাকিস্তানের \'সহমর্মী\' বলে অভিহিত করে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভকে \'ঢাকার পতন\' বলে বর্ননা করে সংসদে সর্বদলীয় গরিষ্ঠ সংখ্যক সদস্য অভিযোগ করেন যে \'পাকিস্তান অনুগত\' হওয়ার জন্যেই মোল্লাকে মৃত্যু দন্ড দেওয়া হয়েছে। জামাত নেতাদের বিরুদ্ধে চলতে থাকা সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্যে তাঁরা বাংলাদেশের সরকারের কাছে আবেদন রাখেন।
 
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ করেছিল, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। তবু পাকিস্তানের ইতিহাস বই এবং শিক্ষা কেন্দ্রগুলিতে সেই অত্যাচারকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা।
 
পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর করা একটি সরকারি সমীক্ষার পরেও এই অস্বীকার করা চলছে। যুদ্ধের ঠিক পরেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো কেন সেনাবাহিনী পরাজিত হল তা বোঝার জন্য  পূর্ব পাকিস্তানে তাদের অত্যাচারের ব্যাপারে তদন্ত করতে একটি স্বাধীন বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠন করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টে লেখা আছে কিভাবে বিদ্রোহ দমন করার অছিলায় পাকিস্তানি সেনা বাহিনী পরিকল্পিত ভাবে বুদ্ধিজীবী, সৈন্য, অফিসার, ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিদের হত্যা করে গণ কবর দিয়েছিল।
 
সেনা বাহিনীর অত্যাচারের ব্যাপারে আরও তদন্ত করার জন্য একটি বিশেষ আদালত গঠন করার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করে এই কমিশন। তা আর কোনওদিন হয়নি এবং কমিশনের সেই রিপোর্ট প্রায় তিন দশক ধরে \'ক্লাসিফায়েড\' পর্যায়ভুক্ত করে অপ্রকাশ্য করে রাখা হয়েছিল। ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত পাঁচ জন পাকিস্তানি রাষ্ট্র প্রধান বাংলাদেশ সফরে এসেছেন কিন্তু ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। এঁদের মধ্যে একমাত্র পারভেজ মুশারফ পাকিস্তানের অন্যায় স্বীকার করার কাছাকাছি এসেছিলেন, যখন ২০০২ সালে ঢাকায় একটি যুদ্ধ স্মারক পরিদর্শনে এসে তিনি লিখেছিলেন, "পাকিস্তানে আপনাদের ভাই ও বোনেরা ১৯৭১-এর ঘটনার ব্যাপারে আপনাদের সমব্যথী। ওই দুর্ভাগ্যজনক সময়ে যে বাড়াবাড়ি হয়েছিল, তা দুঃখজনক।"
 
তার জন্মলগ্নের ঘটনাবলী নিয়ে তদন্তের ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা ২০০৮ সালে আওয়ামি লিগ ক্ষমতা আসার আগে পর্যন্ত অসফল থেকে গেছিল। জনাদেশ ছিল ১৯৭১ সালে যারা পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল, তাদের জন্য যুদ্ধাপরাধ বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।( একের পর এক সরকার এই সব অপরাধগুলির বিচারের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকায় তত দিনে বাংলাদেশের মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।) আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠিত হয় ২০০৯ সালে। এ পর্যন্ত ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, আর মোল্লা সহ দোষী সাব্যস্ত হয়েছে তিন জন।
 
প্রথম থেকেই সমালোচনা এই আদালতের পিছু নিয়েছিল। অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক বিধি লঙ্ঘন করার এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করার। বেশিরভাগ অভিযুক্তই জামাতের সদস্য। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে তুর্কির প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা গুল অভিযুক্তদের ক্ষমা করার অনুরোধ জানান এই বলে যে, তাঁরা বিচারের পক্ষে তাঁরা \'অত্যন্ত বয়স্ক\'। অন্য অন্যদিকে আমেরিকার স্বরাষ্ট্র সচিব জন কেরি প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই বলে সতর্ক করেন যে, মোল্লার ফাঁসি হলে ৫ই জানুয়ারি সাধারন নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে অস্থিরতার সৃষ্টি হবে। 
 
এইসব বিচার অথবা মৃত্যুদন্ড নিয়ে যে ্যাই ভাবুকনা কেন, মোল্লার শাস্তির হুকুম এসেছে একটি সার্বভৌম দেশের স্বাধীন আদালত থেকে। আর তা হয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীদের ব্যাপক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে। ১২ই ডিসেম্বর মোল্লার যে ফাঁসি হয়, তা ব্যাপক সংখ্যক মানুষের সমর্থন পেয়েছে। প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার দোষ ধরে লাভ নেই। তিনি অন্তত অতীতকে মুছে দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক সাহস দেখিয়েছেন, যেখানে এই ব্যাপারে নীরব থেকে বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া জামাতের সাথে  সম্পর্ক দৃঢ় করে চলেছেন।
 
মোল্লার ফাঁসির মাত্র কয়েক দিন পরেই--ঠিক যে দিন পাকিস্তানি সেনারা স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে আত্মসমর্পন করেছিল--পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ সব কিছু অস্বীকার করা একটি প্রস্তাব গ্রহণ করল। যে বর্বরতার মধ্যে বাংলাদেশের   জন্ম, তার প্রতিকারের চেষ্টা যখন করা হচ্ছে,  তখন তাকে সমর্থন করা বদলে পাকিস্তান সেই পুরনো ক্ষতে নুন ঘষে দিচ্ছে। পাকিস্তান, ক্ষমা প্রার্থনা করার এটাই সময়।
 
নিবন্ধটি তাহমিনা আনমের,  ২৭শে ডিসেম্বর, ২০১৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওপেড পাতায় প্রকাশিত।  তাহমিনা আনাম একজন লেখক ও নৃতত্ব্ববিদ।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics