Column
বাংলাদেশকে খাদের কিনারায় এনেছে জামাত

05 Jan 2014

#

উনিশশো একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যে সব যুদ্ধাপরাধ হয়েছিল,

 তার জন্য প্রথম মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির মধ্যে দিয়ে, গত ডিসেম্বরের ১২ তারিখে। সেই রা্তেই যে জামাত-এ-ইসলামির শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন মোল্লা, সেই দলের সারা দেশ জোড়া তান্ডবে নিহত হন বেশ কিছু মানুষ। 

 
জামাতের এই হিংসাত্মক অভিযান নতুন অথবা অপ্রত্যাশিত নয়। বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচার বন্ধ করার উদ্দেশ্যে এই দলটি গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। এদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য শাসক দলের রাজনীতিকরা, পুলিশ এবং ক্রমবর্দ্ধমান ভাবে, সাধারন নাগরিকরা। এদের ছোঁড়া পেট্রোল বোমায় নিহত এবং সাঙ্ঘাতিক আহত হয়েছেন বাস যাত্রীরা। 
 
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই জামাতকে নিষিদ্ধ  ঘোষণা করা হয়, কিন্তু ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর পরবর্তী শাসকরা দলটিকে আবার তাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু করার অনুমতি দেন। এই দলের উপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা প্রত্যাহার করে নেন বাংলাদেশের বিরোধী দল, বিএনপি-র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান।  
 
বাংলাদেশে ১৯৯০-য়ের দশকের প্রথম দিকে গণতন্ত্র ফিরে আসার সময় থেকেই বিএনপি এবং জামাত ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসাবে কাজ করে এসেছে। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল, আওয়ামি লিগ ২০০৯ সালে বিশেষ  ্যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এবং দেখা যায়, প্রায় সব অভিযুক্তরাই জামাতের নেতা।উনিশশো একাত্তরে জামাতের যে ভূমিকা ছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের এটাই যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক অভিসন্ধির অভিযোগ তুলে বসল বিএনপি। 
 
এই ঘটনাকে কোনও  দূর দেশের গোষ্ঠী সংঘর্ষের অনুপুঙ্খ বলে যেন তুচ্ছ না করেন বিদেশের পর্যবেক্ষকরা। যখন দেশজোড়া হিংসায় জামাতের কর্মীদের হাতে শত শত মানুষ নিহত হচ্ছেন, তখন বিপর্যস্ত হচ্ছে দেশের উন্নয়নের সাফল্য। সামাজিক এবং মানবিক উন্নয়ন সূচকের নিরিখে বাংলাদেশ এখন পিছনে ফেলে দিয়েছে ভারত এবং পাকিস্তানকে। এই সূচকগুলির মধ্যে আছে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু মৃত্যুর হার এবং নারী শিক্ষার প্রসার। বৈদেশিক সাহায্য এখন  দেশের বাজেটের দুই শতাংশেরও কমে এসে দাঁড়িয়েছে। 
 
এই সাফল্যের পিছনে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলিরই অবদান আছে। তবে জামাত যদি তার দাপট বজায় রাখতে পারে তাহলে সেই সাফল্য ধ্বংস হয়ে যাবে। সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি নির্বাচনেই দেখা গেছে যে জামাতের সমর্থন সর্বকালীন নিম্ন--মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। 
 
বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবিতে গণ আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছে বিএনপি গত দু বছর ধরে। এর আগে ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয় নিয়ে বিএনপি-র অবস্থান এবং আওয়ামি লিগের প্রতিবাদ আন্দোলনের জন্য কোনও নির্বাচনই হতে পারেনি।  
 
যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তার ফলে, তাতে শেষ পর্যন্ত দেশে জরুরি অবস্থা জারী হয়  এবং একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার তার মেয়াদেরও দু বছরের বেশি সময় ধরে থেকে যায়। এর পরে ক্ষমতায় এসে আওয়ামি লিগ ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথা উঠিয়ে দেয়। 
 
 প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপি নিতান্তই নারাজ হওয়ায় দুই দল থেকেই সম সংখ্যক প্রতিনিধিকে মন্ত্রী হিসাবে নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার করার প্রস্তাব দেয় আওয়ামি লিগ। বিএনপি-কে এমন কি তাদের পছন্দমত মন্ত্রীত্ব বেছে নিতেও বলা হয়। কিন্তু প্রধান মন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে অনড় থেকে বিএনপি কোনও আলোচনায় যেতে অস্বীকার করে। তারা অভিযোগ করে, অনেক দেরীতে এই প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে এবং যে সুবিধার কথা বলা হচ্ছে, তা নিতান্তই আংশিক। 
 
তাই এবার ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে বিএনপি বর্জন করেছে। তাই ১৫০ টি আসনে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হচ্ছেনা আর নির্বাচন হয়ে গেছে শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাপার। যদি প্রধান দুটি দল সমঝোতার পথে যেতে পারত, তাহলে নতুন সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন করে নির্বাচনের দিন ঘোষণা করা যেত।
 
এই \'যদি\' বাংলাদেশকে একটি খাদের কিনারায় নিয়ে এসেছে। গত মাসে রাষ্ট্র সংঘের উদ্যোগে দুই দলের মধ্যে আলোচনার ব্যবস্থা হয়, কিন্তু জামাতের অবিরাম হিংসাত্মক কার্যকলাপের ফলে, মূল্যবান জীবন হানি এবং অর্থনীতির সর্বনাশের কথা ছেড়ে দিলেও,  আলোচনার পরিবেশ আর থাকেনি। 
 
বিএনপি-র পক্ষের লোকেরা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথা উঠিয়ে না দিলে কোনও হিংসার ঘটনা ঘটতনা। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে যাই ঘটুক না কেন, যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিরুদ্ধে জামাত তার সন্ত্রাস চালাতই। 
 
এক সময় বিএনপি-কে মধ্য-দক্ষিনপন্থী একটি দল বলে মনে করা হত। কিন্তু ২০০১ সাল থেকেই দলটি একটি ভীতিকর মোড় নিয়েছে। দু হাজার এক থেকে ছয় পর্যন্ত এদের শাসনকালে সন্ত্রাসবাদী হানায় ভূতপূর্ব অর্থমন্ত্রী এস এ এম এস কিব্রিয়া সহ আওয়ামি লিগের বিভিন্ন নেতা নিহত হয়েছেন। দু হাজার চার সালে একটি গ্রেনেড আক্রমণে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হরকত-উল-জিহাদ এবং জামাতুল মুজাহিদিনের মত নিষিদ্ধ সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির সদস্যরা বিএনপি-র রাজনীতিকদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কথা স্বীকার করেছে। 
 
যতদিন পর্যন্ত একটি মূল ধারার রাজনৈতিক দল উগ্রপন্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, ততদিন পর্যন্ত নির্বাচন তত্ত্বাবধানের জন্য কোনও ব্যবস্থাই বাংলাদেশে গণতন্ত্র সুনিশ্চিত করতে পারবেনা। যাঁরা বাংলাদেশে শান্তি এবং গণতন্ত্র দেখতে চান, তাঁদের উচিৎ এই দুই দলকে আন্তরিক ভাবে আলোচনা চালাতে বলা সামনের বছরগুলিতে তারা ক্ষমতায় থাকুক আর না থাকুক। দীর্ঘস্থায়ী শান্তির স্বার্থে জোর দিয়ে তাঁরা বিএনপি-কে বলুন জামাতের সঙ্গ ছাড়তে।
 
ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত নিবন্ধটির লেখক কে আনিস আহমেদ। তিনি \'দ্য ওয়ার্লড ইন মাই হ্যান্ডস\' উপন্যাসের লেখক।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics