Column
স্বাধীন বাংলাদেশ আজও মানতে পারেনি পাকিস্তান

21 Jan 2014

#

গত বছরটি ছিল এমন একটি বছর, যে সময় বিরাট দুটি প্রাপ্তি হয়েছে বাংলাদেশের।

 প্রথমটি হল ১৯৭১-এর খুনি ও ধর্ষকদের সহযোগীদের ব্যাপারে শাস্তি ঘোষণা এবং ইতিমধ্যেই তাদের মধ্যে এক জনের ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ডের রায় কার্যকর করা। দ্বিতীয় প্রাপ্তি একাত্তরের অপরাধীদের চরম দন্ডের দাবি তুলে ঢাকার শাহবাগে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর জমায়েতের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভের সময়কার উদ্দীপনা আবার জেগে ওঠা। স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ সমস্ত শ্রেণীর মানুষই শাহবাগে উপস্থিত হয়ে তাঁদের সমর্থন জানিয়েছেন এই সব তরুণ তরুণীদের। অবশ্য এই দুটি  জিনিষ ছাড়া লাগামহীন হিংসা, গুন্ডামি, রক্তপাত এবং হত্যালীলা্য জর্জরিত বাংলাদেশ আর বিশেষ কিছুই পায়নি গত বছর।

 
একাত্তরের সেই হত্যাকারী এবং ধর্ষণকারীদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানের পুরনো ক্ষতের মুখ খুলে গেছে। মোল্লার ফাঁসির পরেই \'গভীর উদ্বেগ\' প্রকাশ করে পাকিস্তান জানিয়েছে যে, সে কোনও মতেই এক জন অপরাধী ছিলনা, ছিল  অবিভক্ত পাকিস্তানের এক জন দেশপ্রেমী, অনুরক্ত নাগরিক। তবে পাকিস্তানের এই বোধোদয় হল অনেক দেরিতে, ৪২ বছর পরে। একাত্তরের খুনি, ধর্ষকদের সহযোগীরা যদি দেশপ্রেমিক এবং পাকিস্তানের অনুগত হয়, তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কেন তারা পাকিস্তানে ঠাঁই পেলনা ? রাষ্ট্রের জনকের হত্যার পরে কেন তাদের আবার ফিরিয়ে দেওয়া হল বাংলাদেশে ? কী অভিপ্রায় ছিল রাজাকার শিরোমণি এবং যুদ্ধাপরাধের মূল হোতা গুলাম আজমকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার পিছনে ? দখলদারি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের হাতে যে গণ হত্যা ঘটেছিল একাত্তরে, তার স্মৃতি তো এখনও আবছা হয়ে যায়নি মানুষের মন থেকে !  
 
পশ্চিম পাকিস্তানে সেই সময় আটকে থাকা চার লক্ষেরও বেশি বাংলাদেশিকে কার্যত পণবন্দী রেখে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর মুক্তি আদায় করেছিল পাকিস্তান। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই যুক্তিও দেওয়া হয়েছিল যে, পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের বিচার করার অধিকার  বাংলাদেশের নেই। আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, পাকিস্তানই যুদ্ধ বন্দীদের বিচারের ব্যবস্থা করবে। এর পরে প্রয়োজনীয় সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণের নথি সহ ওই ১৯৫ জন যুদ্ধ বন্দীকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছে ফেরত দেয় এই আশায় যে, পাকিস্তান সরকার তাদের বিচার করবে। কিন্তু যুদ্ধ বন্দীরা সে দেশের  মাটিতে পা দেওয়া মাত্র তাদের উষ্ণ সংবর্ধনা জানায় সরকার এবং তাদের ছেড়েও দেওয়া হয়। এই ভাবেই পাকিস্তান সরকার তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির খেলাপ করেছিল। 
 
স্বাধীনতার পর যখন ছত্রভঙ্গ বাংলাদেশি অপরাধীরা সব গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে ছিল, তখন এক জন সেনা প্রধান, যিনি অতীতে এক জন স্বাধীনতা সংগ্রামীও ছিলেন,একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মূল পান্ডা গুলাম আজমের নেতৃত্বাধীন জামাতের পুনর্বাসন এবং প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম পদক্ষেপ নেন। একই সাথে বাংলাদেশের সংবিধানের মূল নীতিগুলির পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক মানচিত্রে জামাত ও  তার ঝটিকা বাহিনী শিবিরের জায়গা করে নেওয়ার পথ সুগম করে দেন তিনি। আজ দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে প্রবল পরাক্রান্ত জামাত এবং তার ছাত্র সংগঠন,ইসলামি ছাত্র শিবির দেশের ভিতর বড় দুটি নাম। তথাকথিত \' বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ\' এবং বিভিন্ন বিষয়ে ভারত বিরোধী জিগির তুলে  বহু মানুষ তাদের সমর্থনও করছেন।
 
অনেক বছর ধরে জামাত দেশে একটি শক্ত ভিত গড়ে তোলায় এমন কি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল আজ এই ইসলামি সংগঠনটির সাহায্য প্রার্থী। তবে দলটি এ কথা বুঝতে পারেনি যে, জামাত আসলে একটি পরগাছা, যে তার আশ্রয়দাতাকেই এক সময় মেরে ফেলে এবং তারই রূপ নিয়ে নেয়। 
 
একাত্তর সালের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে  বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপক হত্যার পরেও কিন্তু পাকিস্তান এবং তার স্থানীয় সহযোগীরা স্বাধীনতা লাভের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে আটকে রাখতে পারেনি।
 
আর এখন আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পাকিস্তানের থেকে অনেক উন্নত। দেশের সীমান্তের সুরক্ষার জন্য এখন আর বাংলাদেশের আমেরিকা অথবা ভারতের সাহায্যও দরকার পড়েনা।
 
কূটনৈতিক কারণে এক সময় পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু দখলদারি পাকিস্তানি বাহিনীর স্থানীয় সহযোগীদের বিচারের যে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সরকার নিয়েছে, তা একটি বিচক্ষণ এবং যথাযথ পদক্ষেপ। সিদ্ধান্ত। পাকিস্তান কিন্তু ৪২ বছর পরেও বাস্তবকে মেনে নিতে অস্বীকার করছে। একাত্তরে যে গণ হত্যা এবং ধর্ষণ কান্ড চালিয়েছিল সে দেশের সৈন্যরা, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থী হওয়া দূরের কথা, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ মোল্লার ফাঁসির নিন্দা করে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ আক্রমণ করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে বিবৃতিও দেওয়া হচ্ছে পাকিস্তানে। এ ভাবে আসলে পাকিস্তানের অপরাধী চরিত্রই প্রকাশ পাচ্ছে। আর তার যে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার, তা সম্পূর্ন ভাবে বৈধ এবং যুক্তিযুক্ত।
 
ঢাকার শাহবাগ চত্বরে জাতীয়তাবাদী আবেগের যে বিস্ফোরণ দেখা গেছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, তা একাত্তরে পাকিস্তানের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করে আনার জন্য চরম আত্মোৎসর্গ যাঁরা করেছিলেন, সেই স্বাধীনতা সংগ্রামী পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে দেশের মানুষের মনে। যদি কোনও কারণে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়, তা হলে সেই ক্ষমতার দখল নেবে সেই শক্তিগুলি, যারা বাংলাদেশকে একটি আধা তালিবানি রাষ্ট্র বানিয়ে পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত করার সব রকম চেষ্টা চালাবে। ইতিহাসের চাকা এ ভাবেই যদি পেছনে ঘোরে, তা হলে কিসের জন্য  স্বাধীনতা সংগ্রামীরা চরম আত্মত্যাগ করেছিলেন একাত্তরে ?  এ কথা আজ মনে রাখতেই হবে যে যুদ্ধ আজ চলছে বাংলাদেশে, তা আসলে একাত্তরের জয়কে ধরে রাখারই যুদ্ধ। যে স্বপ্ন দেখছে পাকিস্তান, তাকে চূর্ন করতে হবে যে কোনও মূল্যেই। 



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics