Column
‘সব দেশ-ইজরায়েল ও পাকিস্তান ছাড়া’

26 Jan 2014

#

প্রত্যন্ত একটি গ্রামে এক জন প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং স্কুল শিক্ষকের সঙ্গে এক দিন কথা বলছিলাম।

 মুক্তি যুদ্ধ চলার সময় আহত হয়েছিলেন তিনি। স্বাধীনতার যুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ব্যক্ত করছিলেন স্বাধীন একটি দেশে তাঁর মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার বাসনা। তা করতে গিয়ে কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের পক্ষ নিয়ে তিনি কথা বলেননি। 

 
কথা  শুরু হয়েছিল  \'মেশিন রিডেবল\' পাসপোর্টের ব্যাপারে সংবাদপত্রের খবর নিয়ে, যাতে বলা হয়েছে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট পেতে গেলে নির্দিষ্ট মূল্যের উপরেও ১৮ ডলার বেশি দিতে হবে। একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে রূপায়িত হতে চলা এই প্রকল্পটি মনে হল তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য মনে  হয়েছে। কিন্তু পাসপোর্টের ব্যাপারে আলোচনা চলাকালে আমার কাছে তিনি জানতে চাইলেন যে, কখনও আমি বাংলাদেশি পাসপোর্ট মনো্যোগ দিয়ে দেখেছি কি না। এর পর হঠাতই প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়ে কোন দেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল, তা তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন। একটু ভেবে নিয়ে আমি বললাম সেই দেশটি ভুটান। 
 
আমি জানতাম প্রথম স্বীকৃতি ভারতের থেকে আসেনি, যদিও ভারতের হস্তক্ষেপ আর অকুন্ঠ সাহায্য প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বাধীনতা লাভের সুযোগ করে দিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষকে। হয় তার নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য, নয় নবজাতক রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ যাতে খর্ব না হয়, সেই ভেবেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে ভারত সম্ভবত ইচ্ছা করেই প্রথম দেশ হতে চায়নি।
 
তবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে ভুটানকে রাজি করিয়েছিল ভারত আর নিজে সেই স্বীকৃতি দানের ব্যাপারে যথাসময়ের অপেক্ষায় ছিল। এ বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই।
 
কিন্তু আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম যখন সেই প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী  সবাইকে অবাক করে দেওয়া একটি তথ্য দিলেন। তিনি জানালেন যে, বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দেওয়া দেশটির নাম ইজরায়েল এবং সেই স্বীকৃতি এসেছিল দু বার। প্রথম স্বীকৃতি আসে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে। সেই সময় একটি চিঠি পাঠিয়ে নির্বাসনে থাকা বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি জানায় ইজরায়েল এবং একই সাথে দখলদারি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্য করার প্রস্তাব দেয়। দ্বিতীয়বারের স্বীকৃতি আসে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।
 
কেন বাংলাদেশ ১৯৭১-এ ইজরায়েলের সহায়তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল, তা অনুমেয়। এর কারণ এই সময় মধ্য প্রাচ্যের মুসলমান দেশগুলির উপর পীড়নের জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেছিল ইজরায়েল। ইসলামি সৌভ্রাতৃত্ব রক্ষা করার একটা প্রশ্নও ছিল বাংলাদেশের সামনে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর কোনও মুসলমান-প্রধান রাষ্ট্র কিন্তু তাকে স্বীকৃতি দিতে এগিয়ে আসেনি। এই স্বাধীনতা অর্জন করতে ন মাস ধরে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে। এই সময় নিহত হয়েছিলেন দেশের তিরিশ লক্ষ মানুষ আর পাক বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের হাতে ধর্ষিতা হয়েছিলেন আড়াই লক্ষের বেশি মহিলা। সেই সময় মুসলিম দেশগুলি  ছিল পাকিস্তানের পক্ষে।
 
সেই সব মুসলিম দেশ এবং পাকিস্তান অবশ্য এখন অনেক বাংলাদেশির কাছে \'বন্ধু\'।
 
আজ যখন বাংলাদেশ পাকিস্তানি বাহিনীর সেই সব সহযোগীদের   বিচারের ব্যবস্থা করেছে, আর যুদ্ধাপরাধে অপরাধীদের শাস্তির রায় কার্যকর করছে, তখন সেই পাকিস্তান তাদের জন্য কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করে অভিযোগ করছে, বিচারের নাম করে নাকি ধর্মপ্রাণ ইসলামি পন্ডিতদের হত্যা করা হচ্ছে।
 
প্রসঙ্গান্তর থেকে সেই স্বাধীনতা সংগ্রামী আবার আগের বিষয়ে ফিরে এলেন। তাঁর জিজ্ঞাসা, কেন বাংলাদেশি পাসপোর্টে লেখা থাকবে, \'ইজরায়েল ছাড়া সব দেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হল\'? তিনি বললেন, ইজরায়েলের সাথে অনেক মধ্য প্রাচ্যের দেশই তো কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখে।
 
 বাংলাদেশের মাটিতে  চরমতম নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছিল পাকিস্তান। আজও নানা দেশ বিরোধী, নাশকতামূলক কাজের মধ্য দিয়ে জামাত এবং তাদের মত পাকিস্তানপন্থী উচ্ছিষ্ট শক্তিগুলি বাংলাদেশকে পাকিস্তানের একটি উপগ্রহে পরিণত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যপট যখন এই,  তখন এটাই কি ঠিক নয় যে, লেখা থাকুক বাংলাদেশের পাসপোর্টে \'ইজরায়েল এবং পাকিস্তান ছাড়া আর সব দেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হল\'?



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics