Column
আই এস আই মদতেই আলফার বাড়বাড়ন্ত

14 Mar 2014

#

চট্টগ্রাম অস্ত্র পাচার মামলা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের ভিতর বিএনপি-জামাত শাসনকালে আই এস আই-এর মদতে উত্তর-পূর্ব ভারতের জঙ্গি সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ অসমের বাড়বাড়ন্ত ঘটেছিল।

 এই সময়কালেবাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র আলফাকে সক্রিয় ভাবে সাহায্য করে ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপদ সৃষ্টি করে তুলেছিল, আর আই এস আই-এর প্রশ্রয় এবং পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের মাটিকে ব্যবহার করে বেপরোয়া ভাবে তাদের কাজকর্ম চালিয়ে গিয়েছিল আই এস আই। যে সব সাহায্য তখনকার বাংলাদেশ সরকার আলফাকে দিয়েছিল তা হল, জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়া, সীমান্ত পেরিয়ে অনুপ্রবেশ করা এবং আবার ফিরে যাওয়ার জন্য নিরাপদ পথের  ব্যবস্থা করে দেওয়া, বাংলাদেশের বাইরে কোথাও যাওয়ার জন্য জঙ্গি নেতাদের \'ট্রাভেল ডকুমেন্ট\' তৈরি করে দেওয়া, অস্ত্র প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা, অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে আসতে দেওয়া এবং সড়কপথে সেগুলির পরিবহণের ব্যবস্থা করা।   

 
এতে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, বিএনপি-জামাত সরকা্রের প্রশাসন আলফা জঙ্গিদের বাংলাদেশের নিরাপদ আশ্রয় থেকে শুধুমাত্র ভারতের বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কাজকর্ম চালাতেই সাহায্য করেনি, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে অস্ত্র চালান করতেও দিয়েছে। 
 
দশ গাড়ি অস্ত্র চালানের এই মামলা চলাকালীন ন্যাশনাল সিকিওরিটি ইনটেলিজেন্সের প্রাক্তন ডিরকটর জেনারেল ব্রিগেডিয়ার আবদুর রহিম (অবঃ) এবং ডিরেকটর জেনারেল উইং কম্যান্ডার (অবঃ) শাহাবুদ্দিনের  স্বীকারোক্তি, ভারতীয় জঙ্গিদের কাছে অস্ত্র পাচার করার ব্যপারে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের চক্রীরাও সমান ভাবে সক্রিয় ছিল। সেই সময় ঢাকায় কেন্দ্র করে থাকা আলফার মিলিটারি কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া চিন থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা সেই অস্ত্র সম্ভার নিজে দেখে গিয়েছিলেন। 
 
দু হাজার চার সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে ধরা পড়া ওই অস্ত্র পাচারের উদ্দেশ্য ছিল আলফার ক্ষীয়মান অস্ত্র ভান্ডার মজবুত করা এবং ভুটানে আগের বছর ভারতীয় সেনাদের অভিযানের পর ওই সংগঠনের কমে যাওয়া মনোবলকে উজ্জীবিত করে তোলা। 
 
বাংলাদেশের দুটি প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা--এন এস আই এবং ডিরেকটরেট জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের সহায়তায় ঐ দেশের মাধ্যমে ভারতীয় জঙ্গিদের সাহায্য পাঠাত পাকিস্তান। পাকিস্তান থেকে চলে যাওয়া সামরিক অফিসারদের মাধ্যমে বাংলাদেশ সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখত আই এস আই। এই সব অফিসারদের অনেকেই এক সময় পাকিস্তানের হয়ে পশ্চিম রনাঙ্গনে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। এই ভাবে আই এস আই এন এস আই এবং ডি জি এফ আই-এর সঙ্গে একটি দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছিল। উত্তর-পূর্ব ভারতে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে এই দুটি গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই-য়ের সঙ্গে সমস্ত রকম সহযোগিতা করেছে।                                                    
 
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার সময় থেকে ১৯৯৬ সালে আওয়ামি লিগের ক্ষমতায় ফেরা পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় ধরে, বিশেষত খালেদা জিয়ার বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় (১৯৯১-১৯৯৬) আই এস আই সারা বাংলাদেশ জুড়ে ব্যাপক ভাবে জাল বিস্তার করে ফেলেছিল। এই সময়  আই এস আই-য়ের কার্যকলাপের কেন্দ্রস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছিল ঢাকা। ভারতীয় জঙ্গিদের  রাষ্ট্রবিরোধী এবং নাশকতামূলক কার্যকলাপের প্রশিক্ষণ দিতেন পাকিস্তানি সেনা এবং গোয়েন্দা অফিসারেরা। বাংলাদেশে যখনই বিএনপি ক্ষমতায় থেকেছে (১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬) তখনই সক্রিয় হয়ে উঠেছে আই এস আই। 
 
ইউনাইটেড আরব এমিরেটসের দৈনিক সংবাদপত্র খালিজ টাইমসের একটি খবর অনুযায়ী, ২০১২ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের সামনে আই এস আই-য়ের প্রাক্তন প্রধান জেনারেল আসাদ দুরানি প্রকাশ করেছেন যে, আই এস আই উত্তর-পূর্ব ভারতে জঙ্গি কার্যকলাপে মদত দিয়ে আসছে এবং বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে সংসদীয় নির্বাচনের আগে তারা দক্ষিনপন্থি বিএনপি-কে ৫০ কোটি টাকা দিয়েছিল। দুরানি পরে তাঁর বিবৃতি ফিরিয়ে নিলেও ঘটনা হল, ভারতে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে আলফার নাশকতামূলক কাজের সঙ্গে আই এস আই জড়িত। একই সঙ্গে এই ব্যাপারেও সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই যে, কাশমিরে জঙ্গি কাজকর্মে পাকিস্তানের প্ররোচনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে  হৈচৈ হওয়ার পর থেকে আই এস আই বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে তাদের ভারত বিরোধী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।
 
আই এস আই এবং বাংলাদেশের দুটি গোয়েন্দা সংস্থার থেকে গোপন সাহায্য এবং পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আলফা তাদের কার্যকলাপের এলাকা বাড়ায় এবং খালেদা জিয়া দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় (২০০১-২০০৬) বাংলাদেশে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করে ফেলে। 
 
বাংলাদেশ প্রসাশনের উঁচু মহল থেকে প্রকাশ, এন এস আই-য়ের প্রাক্তন ডিজি ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) আবদুর রহিম (চট্টগ্রাম অস্ত্র পাচার মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত) ২০০৪ সালের ৭ই মার্চ তারিখে ভুটানের রাষ্ট্রদূতের কাছে একান্তে জানিয়েছিলেন যে, নিরাপত্তার ব্যাপারে বাংলাদেশে থাকা আলফা জঙ্গিদের কাছ থেকে তাঁর ভয়ের কিছু নেই। ভুটানের রাষ্ট্রদূত তাঁর বাংলাদেশি দোভাষীর মাধ্যমে বলেছিলেন যে, ২০০৩ সালের প্রথম দিকে আলফা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানের পর থেকে তিনি আক্রমণের আশঙ্কা করছেন। 
 
আলফার কোনও নেতার নাম না করেও এন এস আই-য়ের ডিজি ভুটানের রাষ্ট্রদূতকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, বাংলাদেশের ভিতর বিদেশি অথবা স্থানীয় কারুর উপরেই কোনও আক্রমণ বরদাস্ত করা হবেনা বলে বাংলাদেশে শিবির করে থাকা আলফা নেতাদের পরিষ্কার ভাষায় বলা আছে। তাঁর এই আশ্বাসবানীতে ভুটানের রাষ্ট্রদূত নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন নিশ্চয়ই, কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন যে, এন এস আই-য়ের ডিজি নিজে বাংলাদেশে থাকা আলফা নেতাদের কার্যকলাপ সমন্বয়ের কাজ করেন। 
 
বিএনপি-জামাত শাসনকালে ভারতীয় জঙ্গিরা বাংলাদেশে শুধুমাত্র আশ্রয়ই পায়নি, সেখান থেকে ব্যবসায়িক কাজকর্ম শুরু করার মত পরিস্থিতিও পেয়েছিল। \'উষা ইন্টারন্যাশনাল ঢাকা\', \'অনির্বান গারমেন্টস লিমিটেড, চট্টগ্রাম\' এবং করাচি গারমেন্টস, চট্টগ্রাম\', প্রভৃতি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান শুরু করে আলফা। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা না পেলে এই ভাবে রমরমিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব ছিলনা। আমেরিকার \'থিংক ট্যাংক গ্রুপ\' স্ট্র্যাটেজিক ফোরসাইট আই এন সি-র ২০০৬ সালের করা একটি প্রতিবেদন অনুসারে, আলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া একজন অতীব ধনী ব্যক্তি। তাঁর ১১০ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা সাম্রাজ্যের মধ্যে ছিল হোটেল, কাপড় কল, কনসালটেন্সি সংস্থা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, চিংড়ি ধরার ট্রলার এবং পানীয় প্রস্তুতকারক কারখানা।
 
পরেশ বড়ুয়া প্রথম করাচি যান ১৯৮৮ সালে। সেই সময় থেকেই আলফাকে দেওয়া পাকিস্তানের আর্থিক এবং পরিকাঠামোগত সাহায্য যায়  ঢাকা হয়ে। আলফা জঙ্গিদের শুধুমাত্র শিবিরে রেখে অথবা নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হতনা, নিয়ে যাওয়া হত আফগানিস্তানেও। বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বেশ কয়েক বার পাকিস্তান গেছেন পরেশ বড়ুয়া। 
 
এ কথা এখন সুবিদিত যে, ২০০২ সালের ২১শে অগাস্ট আসামের গোয়ালপাড়া জেলায় আলফা হামলা চালানোর পর পরেশ বড়ুয়াকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছিল আলফা। আলফার ভারত বিরোধী ধ্বংসাত্মক কাজকর্মে পাকিস্তানের জড়িত থাকার হাজার হাজার উদাহরণ আছে। ২০০২ সালে পাকিস্তানের প্রাক্তন সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মুশারফের বাংলাদেশ সফরের আগে পাকিস্তানের টেলিভিশন চ্যানেল পিটিভি ওয়ার্ল্ডে ২০০২ সালের ৩০শে জুলাই \'ব্রেভারি অ্যান্ড গ্লোরি অফ আলফা\' নামে একটি আলোচনাচক্রে ভারতে আলফার নাশকতামূলক কাজকর্মের সাফল্য এবং সেই হিংসাত্মক কার্যকলাপ দমনে ভারত সরকারের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরা হয়। 
 
ঢাকায় তাঁর সফরকালে জেনারেল মুশারফ আলফার প্রতিষ্ঠাতা অনুপ চেটিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। এর জন্য চেটিয়াকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে বের করেচ মুশারফ যেখানে ছিলেন, সেই শেরাটন হোটেলে নিয়ে আসা হয়েছিল। ২০১০ সালের ৯ই জানুয়ারি এ তথ্য প্রকাশ করেন বাংলাদেশের গ্রামীন উন্নয়ন মন্ত্রী সইয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিন আরও জানান যে, ভারতে নাশকতামূলক এবং সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম চালানোর জন্য ইসলামাবাদ বাংলাদেশকে ব্যবহার করে।  এ ব্যাপারে কোনও প্রতিক্রিয়া আসেনি পাকিস্তান থেকে। 
 
ভুটানে ২০০৩ সালে আলফার বিরুদ্ধে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর অভিযানের পর ধরা পড়া কিছু জঙ্গি নেতা স্বীকার করেছিলেন গেরিলা যুদ্ধ এবং বিস্ফোরকের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ নিতে অশান্ত বাগফুকন সহ দলের অনেক নেতাই পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সীমান্তে বাতরাসি নামে একটি জায়গায় গিয়েছিলেন। এ কথা সবার জানা যে, পাকিস্তানকে খুশি রাখার জন্য বিএনপি এবং ইসলামি সংগঠনগুলি, বিশেষ করে জামাত আলফা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনগুলিকে  গোপন সাহায্য এবং আশ্রয় দিয়ে থাকে। 
 
ভারতের বিরুদ্ধে পুরোমাত্রায় যুদ্ধ চালানোর প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত উপযুক্ত জায়গা বলে মনে করে আই এস আই। আই এস আই চায় উত্তর-পূর্ব ভারতে সবসময়ের জন্য অস্থিরতা থাকুক, কারণ তা হলে এই অঞ্চলটিকে ভারতের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পাকিস্তানের সুবিধা হবে। আর এ ভাবেই ১৯৭১ সালের পরাজয় এবং দেশের পূর্বাঞ্চল হারানোর প্রতিশোধ নিতে চায় পাকিস্তান।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics