Column
ছেলেদের দেশে ফেরার দরজা বন্ধঃ হতাশ খালেদা জিয়া

03 May 2014

#

১৯৮১ সালের মে মাস। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং দেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হলেন আততায়ীদের হাতে এবং তার ফলে অকস্মাৎ শুণ্যতার সৃষ্টি হল বিএনপি-র সংগঠনে।

 এর পর জনগন এবং সেই সঙ্গে দলীয় কর্মীদের দাবি অনুযায়ী জিয়াউর রহমানের পত্নী বেগম জিয়া দলের দায়িত্বভার নিলেন এবং সংগঠনকে পুনর্গঠিত করে নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন নিজেকে। পরবর্তীকালে  দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রশাসন চালিয়েছেন তিনি, কিন্তু সেই প্রশাসনের কাজে বারে বারেই হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। যিনি এই হস্তক্ষেপ করতেন, তিনি আর কেউ নন, বেগম জিয়ারই জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। এই হস্তক্ষেপ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিলনা, তবে এর ফলে তারেকই হয়ে বসলেন অঘোষিত প্রশাসক এবং যাবতীয় ক্ষমতার কেন্দ্রভূমি হয়ে দাঁড়াল বিএনপি-র সদর দপ্তর \'হাওয়া মহল\', যেখান থেকে তাঁর কাজকর্ম চালাতেন তারেক। অচিরেই দুর্নীতির একটি চক্র গড়ে তুললেন তিনি, দেশকে পরিণত করলেন সন্ত্রাসবাদীদের ক্রীড়াক্ষেত্রে  এবং দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা জামাতের সঙ্গে আঁতাত করে ধর্মীয় মৌলবাদীদের প্রকাশ্য সমর্থন দিলেন। সেই সঙ্গে নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত  করলেন \'প্রিন্স অফ কোরাপশন\'--এই অভিধা।

 
দুর্নীতির এই বিশাল পাহাড় অবশ্য এক দিন ভেঙ্গে পড়ল। পরবর্তীকালে শাসন ক্ষমতায় আসা জেনারেল মইন এবং ফকরুদ্দিনের সরকার হত্যা, দুর্নীতি এবং সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মে সমর্থন যোগানোর দায়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। জেলে থাকার সময় তারেককে এই বলে মুচলেকা দিতে হয় যে, যতদিন বিচার চলবে ততদিন রাজনীতি করবেননা তিনি। অতীত কৃতকর্মের জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমাও চান তিনি। পরে চিকিৎসা করানোর জন্য জামিন নিয়ে তারকে লন্ডনে যান এবং এখনও সেখানেই আছেন তিনি। বলা হয়, এখনও অসুস্থ থাকায় তাঁর চিকিৎসা চলছে এবং তিনি নাকি ভালো করে হাঁটতেও পারেননা। সত্যিই কি তিনি এখনও চিকিৎসাধীন ? না। এ কথা সত্যি নয়। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, রাজনৈতিক কাজে তিনি সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, রিয়াধে যাতায়াত করে থাকেন। তবে পাকিস্তানে যান কি না, তা এখনও জানা যায়নি। বিদেশের মাটিতে রাজনীতি নিয়ে, দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করার কাজে এখন তিনি বড়ই ব্যস্ত। তবুও বলা হয়, সেখানে তিনি নাকি চিকিৎসার কারণেই রয়েছেন। কেউ বিশ্বাস করবেন এ কথা ?
 
 যে রাজকীয় বিলাসিতায় জীবন যাপন করেন তারেক বিদেশে, তা বোধ হয় মিশরের ক্ষমতাচ্যুত রাজা ফারুকও কোনওদিন করেননি। কোথা থেকে আসে এই বিলাসিতার অর্থ, তা দেশের মানুষ জানেন। অন্যদিকে তাঁর মা, যিনি দশ বছর দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তিনি নাকি অর্থাভাবের জন্য গত তিন বছর ধরে বাড়ি ভাড়া দিতে পারছেননা।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছেন তথ্য যাচাই করে বাড়ি ভাড়া মকুব করার ব্যবস্থা করতে। বাড়ি ভাড়া না দিয়ে কী প্রমাণ করতে চাইছেন বেগম জিয়া, তা তিনিই জানেন। হতে পারে, কৃত্রিম  আর্থিক দুরবস্থা দেখিয়ে মানুষের সহানুভূতি কুড়োতে চাইছেন তিনি। কেন এই আর্থিক দুরবস্থার ছবি আঁকার চেষ্টা ? কী সহানুভূতি পেতে পারেন তিনি ? রাজধানী এবং দেশের বিভিন্ন শহতের তাঁর নিজেরই কতগুলি বাড়ি আছে এবং কত ভাড়া তার থেকে কত ভাড়া তিনি পেয়ে থাকেন, তা দেশের প্রতিটি নাগরিকই বিলক্ষণ জানেন, কারণ ভাড়া থেকে পাওয়া তাঁর ঘোষিত আয়ের বিস্তৃত বিবরণ সংবাদমাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। 
 
সহানুভূতি আদায় করার এই যে প্রচেষ্টা, তার প্রধান কারণ, বেগম জিয়া বুঝতে পেরেছেন যে, অদূর ভবিষ্যতে, অন্ততঃ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তাঁর দুই পুত্রের কারুরই দেশে ফিরে আসার সুযোগ নেই।   আদালত তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র কোকোকে দোষী সাব্যস্ত করে পলাতক ঘোষণা করেছে। যার জন্য দেশে ফিরলেই কোকোর জন্য অপেক্ষা করছে ছ\' বছরের সশ্রম কারাবাস এবং পঞ্চাশ লক্ষ টাকার জরিমানা।
 
এর মধ্যেই সিঙ্গাপুরে কোকোর পাচার করা বিপুল অর্থের খানিকটা ফিরিয়ে আনতে পেরেছে দেশের সরকার। কর না দেওয়া, জোর করে অর্থ আদায় এবং দুর্নীতির দায়ে মোট সাতটি মামলা ঝুলছে কোকোর নামে। ওদিকে জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে যে ২৬ টি মামলা চলছে, তার মধ্যে ১৭টিই বেগম জিয়ার বড় ছেলে তারেকের নামে। এর মধ্যে দু\'টি মামলা (হত্যা এবং বিস্ফোরণ সংক্রান্ত আইন) ২০০৪ সালে তখনকার বিরোধী নেত্রী এবং আওয়ামি লিগ-প্রধান শেখ হাসিনার জনসভা চলার সময় যে গ্রেনেড আক্রমণের ফলে ২২ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছিলেন, সেই ঘটনা সংক্রান্ত।  তারেক রহমান ছাড়াও তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লুতফুজ্জামান বাবর, জামাত নেতা আলি আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ এবং হ্যারিস চৌধুরি এবং আরও ৩০ জন এই মামলায় অভিযুক্ত। এ দিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের তরফ থেকে তারেক এবং তাঁর ব্যবসার অংশীদার গিয়সুদ্দিন আল মামুনের নামে অর্থ পাচারের আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ছারাও রয়েছে ঋণ শোধ না করা এবং তোলা আদায় করার মামলা। তদারকী সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে ১২ টি মামলা করা ছিল, যেগুলি উচ্চ আদালতের আদেশে মুলতুবি থাকে। দেখাই যাচ্ছে কতগুলি মামলায় জড়িয়ে আছেন তারেক, কোকো দুই ভাই । এমন কি তারেকের স্ত্রী ডঃ জু
 
বেইদা রহমানের নামেও ঝুলছে বিভিন্ন মামলা। অনাথ আশ্রম ট্রাস্ট মামলায় বেগম জিয়ার বিরুদ্ধেও চার্জ গঠন করা হয়েছে এবং বিচার শুরু হয়ে গেছে। সুতরাং এটাই স্বাভাবিক যে, এই রকম পরিস্থিতিতে কিছুটা বিচলিত হবেন বেগম জিয়া। নীতি নির্ধারক এবং উপদেষ্টারা জানাচ্ছেন, তারেক এবং কোকোর দেশে ফেরার অনুকুল পরিস্থিতি এখন মোটেই নেই। ছেলেদের দেশে ফেরার সব দরজা বন্ধ। মা তাই হতাশ।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics