Column
ফাঁসি হবে নিজামি, মির কাশেম আলির

04 Nov 2014

#

গত ৩০শে অক্টোবর ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আই সি টি-১) ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মানবতা বিরোধী অপরাধ করার দায়ে জামাতের প্রধান মতিউর রহমান নিজামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

এর ঠিক তিন দিন পরেই একই কারনে জামাতের কার্যকরী সমিতির সদস্য মির কাশেম আলিকেও চরম দন্ড দিয়েছে আইটিসি-১।

 

গণহত্যা, বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিত ভাবে হত্যা, খুন এবং ধর্ষণের চক্রান্তে জড়িতে থাকা-এই ধরণের কাজে জড়িত ছিলেন এই দু\'জনেই। নিজামি ছিলেন আল বদরের প্রধান (জামাতের গোপন হত্যা বাহিনী), আর মির কাশেম আলি ছিলেন চট্টগ্রামে আল বদরের কমান্ডার। মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতার পক্ষে থাকা মানুষ-জনকে খুন করা ছাড়াও সশস্ত্র আল বদর বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করা।এই লক্ষ্য নিয়েই হিন্দু ও মুসলমান নির্বিশেষে ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা বানিয়ে তাঁদের নিকেশ করেছিল তারা। নিজামি, মির কাশেম আলি এবং আল বদরের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে খুন হওয়ার ভয়ংকর বহু কাহিনীই স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এবং তার পরে দেশে-বিদেশে সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। এই দু\'জনেই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হত্যা করা,অত্যাচার করে তাঁদের পঙ্গু করে দেওয়া, তাঁদের সম্পত্তি লুঠ করা অথবা বাঙালি মেয়েদের ধর্ষণ করার কাজে সরাসরি ভাবে যুক্ত ছিলেন। জামাত এবং তাদের তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র সঙ্ঘ, যেটি আল বদরে পরিণত হয়, ঐতিহাসিক ভাবে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি হিসেবে পরিচিত। যে দখলদারি পাকিস্তানি বাহিনী ন\' মাস ধরে অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষের উপর তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ করার বিরুদ্ধে সব রকমের কাজ করেছিল এরা। " যে সব ভয়ংকর অপরাধে নিজামি অপরাধী, তার যোগ্য শাস্তি মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছু হতে পারেনা," দন্ড ঘোষণার সময় আই সি টি-১ এর চেয়ারম্যান, বিচারক এম এনায়েতুর রহমান বলেছেন। অপরাধী তার কৃতকর্মের জন্য মূল্য দেবে, তা নিশ্চিত করাই বিচারের উদ্দেশ্য। যে চরম অপরাধ করা হয়েছে, তা মনে রাখলে, যে সব বুদ্ধিজীবী, পেশাদার মানুষ এবং নিরস্ত্র নাগরিকদের নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তাঁদের আত্মজনকে সুবিচার দেওয়া একটি আবশ্যিক কর্তব্য," বিচারক বলেছেন।

 

 

নিজামি এক জন প্রথম সারির রাজাকারও ছিলেন, যে রাজাকার বাহিনী তৈরি করেছিল পাকিস্তানের আই এস আই। এই রাজাকাররা ছিল আজকের তালিবানের পূর্বসূরী। যদিও আরবি ভাষায় রাজাকার শব্দের অর্থ \'স্বেচ্ছাসেবী\', বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এর মানে যারা দেশদ্রোহী এবং যারা দখলদারী পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী।

 

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এই রাজাকারেরাই মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের সমর্থকদের সম্পর্কে পাকিস্তানি বাহিনীকে খবর সরবরাহ করা, তাদের অপহরণ করে আনা ছাড়াও বিভিন্ন সেনা ছাউনিতে তাদের হত্যা করেছিল। জ্বালিয়ে দিয়েছিল সেই সব হতভাগ্য মানুষদের বাড়ি ঘর, লুঠ করেছিল তাদের সম্পত্তি, বাঙালি মহিলাদের তুলে এনে পাচার করে দিয়েছিল সারা দেশের বিভিন্ন সেনা ছাউনিতে, আর ধর্ষণ করেছিল আড়াই লক্ষের বেশি নারীকে।

 

 

জামাতের তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে প্রকাশ্য জনসভায় ভাষণ দিয়ে অথবা সংবাদপত্রের নিবন্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর আক্রমণকারী দখলদারী পাক বাহিনীকে সমর্থন জানানোর দায়ে দায়ী নিজামি। জামাতের মুখপত্র দৈনিক ১৯৭১ সালের ১৪ই নভেম্বর সংখ্যায় নিজামিকে উদ্ধৃত করেছিল এই বলে, "সেই দিন আর বেশি দূরে নেই যখন দেশপ্রেমী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে আল বদর হিন্দু শক্তি এবং তার সহযোগীদের (স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সংগ্রামীদের উদ্দেশ্যে বলা পাকিস্তানপন্থীদের শব্দবন্ধ) পরাস্ত করে এবং ভারতকে ধ্বংস করে সারা পৃথিবীতে ইসলামের জয় পতাকা ওড়াবে।"

 

 

১৯৭১ সালে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত লেখাগুলি পড়লে বোঝা যায় যে, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং তাঁদের সহযোগী শক্তিগুলির মোকাবিলা করতে ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে যুব সম্প্রদায়কে প্ররোচিত করতেন নিজামি এবং অন্যা জামাত নেতারা। সেই সময়কার যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমাগত বলে চলা \'আল্লাহর বাসভূমি পাকিস্তান\', \'হিন্দুরা মুসলমানদের শত্রু\' এবং পাকিস্তান ও ইসলাম এক এবং অচ্ছেদ্য\'-- এই জাতীয় কথাগুলি সত্যি হিসেবে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল অনেক তরুণের মনে। ইসলামের আদর্শের নামে করা এই সব প্রচারে উদ্বুদ্ধ হয়ে এর পর তারা পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগীতায় আরও বেশি করে অত্যাচার চালিয়েছিল। অন্যদিকে, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় চট্টগ্রামে ঘটা গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট এবং আগুন লাগানোর ঘটনাবলীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে যার নাম, সেই মির কাশেম আলি ছিলেন সশস্ত্র আল বদরের তৃতীয় প্রধান ব্যক্তি। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গঠিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুসারে এ পর্যন্ত মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত জামাত নেতাদের মধ্যে তিনি অষ্টম। আই সি টি-২ মির কাশেম আলির মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করায় তাঁর লঘু দন্ড হবে কি না, এই জল্পনার অবসান হল। লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে মুরুব্বিদের ধরে আমেরিকাকে দিয়ে বাংলাদেশ প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করার যে চেষ্টা এই জামাত নেতা করেছিলেন, তার ফলেই এই জল্পনা তৈরি হয়েছিল।

 

 

জাহাজ এবং জমি-বাড়ি ব্যবসায়ী মির কাশেম আলিকে যুদ্ধাপরাধের ১৪ টি অভিযোগে ২০১২ সালে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জামাতপন্থী দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং টিভি চ্যানেল দিগন্ত টেলিভিশনের স্বত্বাধিকারী দিগন্ত মিডিয়া কর্পরেশনের প্রধান তিনি। ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িক বিভেদ তৈরি করার জন্য টেলিভিশন স্টেশনটিকে গত বছরেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

 

এ ছাড়াও ইসলামিক ব্যাংক ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি আলি। এই সংস্থাটি ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশের কাজকর্ম এবং তার মুনাফা- সব কিছুরই দেখভাল করে। আলি ইবন সিন ট্রাস্টের প্রধান এবং ইবন সিনা ফার্মাসিউটিকাল ইন্ডাস্ট্রিজেরও চেয়ারম্যান।

 

 

১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর, পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের ঠিক দু\'দিন আগে, নতুন রাষ্ট্রকে জন্ম থেকেই পঙ্গু করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী এবং পেশাদার বাঙালিদের ব্যাপক হারে হত্যা করেছিল আল বদর। এই গণহত্যার প্রধান কারিগর ছিলেন নিজামি এবং মির কাশেম আলি। এই হত্যাকান্ডে আর যারা এদের সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে সেক্রেটারি জেনারেল আলি আহসান মুহাম্মাদ মোজাহিদের মৃত্যুদন্ড ইতিমধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে।

 

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলি থেকে এই সব যুদ্ধাপরাধের বহু প্রমাণ পাওয়া যায় এবং তার ফলে বিচারের দাবিতে সরব হয়ে ওঠে জনগণ। ১৯৭১ সালের ১৯শে ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যানার হেডলাইন ছিল, "মানব ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যালীলা দেখল সোনার বাংলা।" বাংলাদেশ অবজার্ভারের ১৯৭২ সালের ১৫ই জানুয়ারি সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতি, "আজ হিটলার বেঁচে থাকলে সোনার বাংলায় যা হয়েছে, তাতে তিনিও লজ্জা পেতেন।"

 

 

যে একটি ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত সজাগ, সেটি হল, কোনও রকম বাধ্যবাধকতা অথবা চাপের জন্য যুদ্ধাপরাধ বিচার যদি অসমাপ্ত থেকে যায়, তবে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের \'স্বাধীনতাপন্থী\' রাজনীতি। এক সময় যারা দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে ধর্মের নাম নিয়ে চরম অত্যাচার চালিয়েছিল মানুষের উপর, তারা তাহলে নিজেদের আরও সংহত করে তুলবে। দেশে তা হলে আর প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির কাজ করার কোনও জায়গা অবশিষ্ট থাকবেনা। তাঁর কাজের তাৎপর্য এবং ঝুঁকির ব্যাপারে শেখ হাসিনা বিলক্ষণ জানেন। চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে যুদ্ধাপরাধ বিচার যাতে বানচাল না হয়ে যায়, সে ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক থাকতে বলেছেন তিনি। তিনি জানেন, তাঁর এই উদ্যোগকে সমাজের বৃহত্তর অংশের মানুষ সমর্থন করবে। শেখ হাসিনার এক জন ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলেছেন, "পরাজিত শক্তির কোনও চক্রান্তের ভয়ে আমরা ভীত নই।" শেখ হাসিনা বিশ্বাস করেন, যুদ্ধাপরাধ প্রক্রিয়া সম্পূর্ন হবে, আর জাতি হবে কলঙ্কমুক্ত।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics