Column
নরখাদক গোলাম আজমের প্রাপ্য ঘৃণা

24 Nov 2014

#

ঘটনাটি সত্যি অথবা বানানো, তা নিয়ে কোনও বচসায় যাবনা। ১৯৭১ সালে দেশে যখন স্বাধীনতার যুদ্ধ চলছে, পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের সঙ্গীরা নির্মম ভাবে হত্যা,

 লুন্ঠন ও অত্যাচার চালাচ্ছে দেশবাসীর উপর, তখন হাজার হাজার মানুষ দেশ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ভারতে পালিয়ে যেতে থাকেন। এমনই কিছু পরিবার অনেকদূর চলে এসে পরিশ্রান্ত হয়ে দেশের সীমানার পার্শ্ববর্তী গ্রামে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। তখন পরিবারের কর্তা বলেছিলেন সবাই যেন নিঃশ্বব্দে রাত কাটায়, কেননা কোনও শব্দ হলে আজমের লোক চলে আসবে এবং তাদের মেরে ফেলবে। লোকমনে ভীতি সৃষ্টিকারী কে এই আজম? পাক হানাদার বাহিনী, রাজাকার, আল বদর, আল শামসের না তো শুনেছে সবাই, কিন্তু এই আজম হলেন মহম্মদ গোলাম আজম। তাঁরই অঙ্গুলিহেলনে পরিচালিত হয়েছে রাজাকার সহ দেশদ্রোহী সব সংগঠন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারীদের মধ্যে তাঁরই নাম প্রথমে। এমন কি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও তিনি সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। অবশ্য তিনি ছাড়াও আরও অনেকে (বর্তমানে যুদ্ধাপরাধী) ছিলেন এই দলে। দীর্ঘ ন\' মাস ধরে বাঙালি নিধনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই গোলাম আজম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও তিনি চেষ্টা চালিয়েছেন- পাকিস্তান থেকে নয়- সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যে গিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির। পরবর্তীতে পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে বিভিন্ন দেশে গিয়ে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন তিনি। তাঁর প্রাপ্য ছিল দেশদ্রোহীতার কঠিন শাস্তি। কিন্তু ইতিহাসের ঘটনার স্রোত বয়েছিল অন্য খাতে।

 

বাংলাদেশের গঠনতন্ত্রের পরিকাঠামোতে বড় আঘাত আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট। জিয়াউর রহমান গণতন্ত্র প্রণয়নের নামে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে উন্মুক্ত করে দিয়ে গোলাম আজমকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। এক জন মুক্তিযোদ্ধা এবং পরবর্তীতে সামরিক শাসক, তাঁর পক্ষে পাকিস্তানি ভাবধারা ফিরিয়ে আনার জন্য গোলাম আজমকে ফেরানো ছাড়া আর কোনও উপায় ছিলনা। এক জন মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার ঘোষক (?) কেবল আজমকেই ফিরিয়ে আনেননি, তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী দল জামাতের পুনঃপ্রতিষ্ঠাও করান। সেই জামাতের নেতৃত্ব দেন গোলাম আজম। জনমানসে ভীতি সৃষ্টিকারী আজম মুক্তি যুদ্ধের সময় কী করেননি ! মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশে সাত কোটি মানুষ ছিলেন। আজম সেই সব মুক্তিকামী মানুষদের বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানি সেনাদের। যে সব ঘরে সুন্দরী বিবাহিত অথবা অবিবাহিত তরুণী ছিল, সেই সব বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে তাদের মিলিটারি গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করিয়েছেন। মিলিটারির পক্ষে থাকা এই গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামির মত নরঘাতকদের নির্দেশে মানুষের ঘরবাড়ি,ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। এই সব নরাধম রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ব্যক্তিগর আদর্শ এবং নৈতিকতার স্খলন তো ঘটিয়েইছে, পাশাপাশি চরম অপরাধ করেছে।

 

২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ক্ষমতায় এলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবেন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করেন। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে সেই ট্রাইব্যুনাল গোলাম আজমের বিচারের রায় দেয়। আজমের বয়সের কথা বিচার করে তাঁর প্রাপ্য চরম শাস্তি না দিয়ে ৯০ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। কিন্তু প্রত্যাশা মত সাজা হয়নি বলে দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলেন, এখনও আছেন। গোলাম আজমের শাস্তির ব্যাপারে সরকারকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। হয়তো এই সমালোচনা অসত্য নয়, কিন্তু এ কথাও সত্যি যে, আওয়ামি লিগ সরকার ছাড়া এই বিচার কেউ করতনা, করবেনা। এই সরকার বিচারের ব্যবস্থা করবে বলেই জনগণ শেখ হাসিনাকে বিপুল ভোটে জয়ী করেছিলেন।

 

বয়সের ভারে ন্যুব্জ ছিলেন এই নরাধম। শাস্তি প্রদানের পর বার্ধক্যজনিত কারনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে ঢাকার শেখ মুজিব হাসপাতালে গত ২৩শে অক্টোবর। তাঁর পাকিস্তান প্রীতির জন্য মৃত্যুর পর শোকের আবহ তৈরি হয় পাকিস্তানের শহরে শহরে। সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলি জানায় একজন প্রকৃত পাকিস্তানের প্রেমিকের মৃত্যু হয়েছে। পাকিস্তান এও প্রচার করে যে পাকিস্তানের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসার জন্যই শেখ হাসিনা তাঁর বিচার করে আমৃত্যু কারাবাসের শাস্তি দিয়েছিলেন। এতে কি স্পষ্ট হয়না যে তিনি বাংলাদেশি ছিলেনইনা, ছিলেন মনেপ্রাণে পাকিস্তানি। যে লোক নিজের জন্মভূমিকে ভাল না বেসে অন্য দেশের প্রতি অনুগত, তিনি কি রাষ্ট্রদ্রোহী নন?

 

গোলাম আজম কেবল স্বাধীনতাবিরোধী এবং রাষ্ট্রদ্রোহীই ছিলেননা, তিনি ছিলেন চরিত্রে ধূর্ত এবং নিষ্ঠুরও। পূর্ব পাকিস্তানের সময় জামায়তের প্রথম বাংলাদেশি আমির মওলানা আবদুল রাইস ছিলেন উদারপন্থী চরিত্রের। গোলাম আজম আবদুল রাইসকে পদ থেকে সরিয়ে উগ্রপন্থীদের নিয়ে দল সংগঠিত করেন। যেহেতু জামায়তের পৃষ্ঠপোষক ছিল পাকিস্তানের আই এস আই এবং সৌদি আরব, তাই আজমের ভূমিকা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেনি। মৃত্যুর বহু আগেই তিনি জামায়তের আমিরের পদ ছাড়েন বার্ধ্যক্য হেতু এবং কিছু নেতা-কর্মীর চাপে। হয়তো উদ্দেশ্য ছিল তিনি সরে গেলে জামায়ত বিরোধী বিক্ষোভের ঝড় কিছু কমবে, যদিও অনানুষ্ঠনিক ভাবে তিনি ঐ পদেই থেকে যান। এর কারন, তাঁর সৌদি ও মধ্যপ্রাচ্য-যোগাযোগ ছিল জামায়তের মূলধন। দেশদ্রোহী গোলাম আজমকে দেশে এবং দলে প্রতিষ্ঠা করে জিয়াউর রহমান দেশের প্রতি কী করেছেন, সেই বিচারের ভার দেশবাসীর হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics