Column
মুক্ত, প্রগতিশীল চিন্তাকে স্তব্ধ করার অপপ্রয়াস

16 Mar 2015

#

গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের একুশে বই মেলা থেকে বেরোবার সময় আততায়ীদের হাতে খুন হয়ে গেলেন অভিজিত রায় (৪২),

 গুরুতর আহত তাঁর স্ত্রী রফিদা আহমেদ। বাংলাদেশে জন্ম হওয়া আমেরিকার নাগরিক অভিজিতকে আক্রমণকারীরা রাম দা  দিয়ে পিছন থেকে আঘাত করে মাথা ফাঁক করে দেয়। তাঁকে বাঁচাতে এলে অভিজিতের স্ত্রীকেও আক্রমণ করে দুষ্কৃতিরা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়ার পর  অভিজিতের মৃত্যু হয়। একটি আঙুল হারিয়ে এবং মাথায় আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তাঁর স্ত্রীও। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার  পর আমেরিকায় ফিরে গেছেন তিনি।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক অজয় রায়ের পুত্র অভিজিত আমেরিকায় সফটওয়ার ইঞ্জিনীয়ার হিসাবে কর্মরত ছিলেন।  ১৬ই ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকায় এসেছিলেন বই মেলায় যোগ দিতে। সেখানে  এই বছরে প্রকাশ পাওয়া তাঁর তিনটি বই প্রদর্শিত হচ্ছিল। ৪ঠা মার্চ আমেরিকায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর।


পেশাগত ভাবে ইঞ্জিনীয়ার হলেও ধর্মনিরপেক্ষ এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং সেইসঙ্গে তাঁর শক্তিশালী লেখনীর জন্য  নাম করেছিলেন অভিজিত রায়। বাংলা ব্লগ \'মুক্তমনা\'র প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। ২০০০ সালে থেকে দক্ষিন এশিয়ায় স্বাধীন চিন্তা-ভাবনার মানুষ, যুক্তিবাদী এবং সংশয়বাদীদের  মঞ্চ হিসাবে কাজ করে এসেছে মুক্তমনা। বাংলাদেশে স্বচ্ছ চিন্তা-ভাবনার আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষ হিসাবে উদার ধর্মনিরপেক্ষ লেখনী, বৈজ্ঞানিক যুক্তি, মানবাধিকার এবং নির্দিষ্ট সামাজিক বিষয় নিয়ে কথা বলতেন অভিজিত। জিহাদি এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীদের প্রতিপক্ষ ছিলেন তিনি। 


তাঁর লেখা বই \'বিশ্বাসের ভাইরাস\' এবং \'শুন্য থেকে মহাবিশ্ব\'-র জন্য ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন অভিজিত। ধর্মীয় উগ্রতাকে তিনি বলতেন \'বিশ্বাসের ভাইরাস\', যা বাতাস বাহিত ছোঁয়াচে ভাইরাসের মতই সাংঘাতিক। 


গত বছর মৌলবাদী ব্লগার এবং জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের প্রাক্তন কর্মী শফিউর রহমান ফারাবির হুমকির মুখে রকমারি.কম নামে একটি অনলাইন বুকস্টোর তাদের তালিকা থেকে অভিজিতের বইগুলি বাদ দিয়ে দিতে বাধ্য হয়। অভিজিত-হত্যার অন্যতম সন্দেহভাজন হিসাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ফারাবিকে। ফেসবুক এবং টুইটারে অভিজিতকে হত্যার হুমকি দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে সে।


 একের পর এক লেখায় মানবিক এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করায় গত এক বছর ধরেই গোঁড়া ধর্মীয় উগ্রবাদীদের শাসানি পাচ্ছিলেন অভিজিত। ক্রমাগত বেড়ে চলা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এখন এক বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশে।


অভিজিত হত্যার আগে একই ধরণের আক্রমণের শিকার হয়েছেন বিশিষ্ট লেখক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ এবং দুই ব্লগার-রাজীব হায়দার ও আসিফ মহিউদ্দিন। বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদীদের আক্রমণ থেকে একবার প্রাণে বেঁচে যাওয়ার পর ২০০৪ সালে মিউনিখে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে। ২০১৩ সালে খুন করা হয় ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠা রাজীব হায়দারকে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মানবতা বিরোধী অপরাধ যারা করেছিল, তাদের মৃত্যুদন্ডের দাবিতে শাহবাগ আন্দোলনে অংশ নেওয়া আসিফ মহিউদ্দিন  গুরুতর আহত হন অন্য এক আক্রমণের ঘটনায়।


ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার সিবলি নোমান বলেছেন, অভিজিতের উপর যে কায়দায় আক্রমণ করা হয়েছে, তার সঙ্গে জামাত-শিবিরের আক্রমণের ঢং-এর খুব মিল আছে। ইতিমধ্যে, \'আনসার বাংলা\' নামে একটি টুইটার অ্যাকাউন্টে অভিজিত হত্যার দায় স্বীকার করা হয়েছে। 


আনসারুল্লা বাংলা টিম নামে পরিচিত আনসার বাংলা একটি চরমপন্থী, জঙ্গি সংগঠন। ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি শাহবাগ আন্দোলনকারী রাজীব হায়দারকে হত্যার মধ্য দিয়ে এদের আত্মপ্রকাশ। এই সংগঠনের বেশির ভাগ সদস্যদেরই জামাত-শিবির যোগাযোগ আছে। রাজীব-হত্যার মূল চক্রান্তকারী সালমান ইয়াসের মাহমুদ আগে ইসলামি ছাত্র শিবিরের একজন সক্রিয় কর্মী ছিল। ইরাকের আল কায়দা শাখা আনসার-উল-ইসলামের ধাঁচেই সংগঠিত আনসারুল্লা বাংলা।


বাংলাদেশে জামায়তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ এবং হরকত-উল-জিহাদ-আল ইসলামির মত আল কায়দার অনুসারী জঙ্গি সংগঠনগুলি নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে এখন বিভিন্ন নামে কাজ করে চলেছে। জামাত-শিবিরের প্ররোচনায় এদের অনেকেই  যোগ দিয়েছে আনসারুল্লা বাংলা টিমে ।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের ভবনের সামনে অপরাজেয় বাংলায় গত ১লা মার্চ অভিজিতের দেহ এনে রাখা হয়েছিল। সমাজের সমস্ত শ্রেনীর হাজার হাজার মানুষ সেখানে এসে তাঁদের শ্রদ্ধা জানিয়ে গেছেন এই লেখককে । অভিজিতের ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর বাবা চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্রদের গবেষণার স্বার্থে দেহটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ-কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেন। এই হত্যার তদন্তের জন্য আমেরিকার প্রস্তাব গ্রহণ করে এফ বি আই-এর সাহায্য নেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। 




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics