Column
সময় এসেছে জামাতকে নিষিদ্ধ করার

06 Jul 2015

#

২০১৪ সালে হাই কোর্টের একটি আদেশে জামাত-এ-ইসলামি বেআইনি ঘোষিত হয়। এই আদেশের ফলে দলটির নির্বাচনী ভাগ্য স্থির হয়ে যায়,

 অর্থাৎ বন্ধ হয়ে যায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার। জামাতের সমস্ত শীর্ষস্থানীয় নেতাদেরই এখন যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে এবং তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে ইতিমধ্যেই দোষী সাব্যস্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে দন্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে যতবারই সাজা ঘোষণা করা হয়েছে, ততবারই জামাত সমর্থকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হিংসাত্মক আক্রমণ নামিয়ে এনেছে রাস্তা অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর এবং জনগণের সম্পত্তি বিনষ্ট করার মাধ্যমে। 

 

দেশের প্রথম সামরিক একনায়ক এবং বিএনপি-র প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা এবং তা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করার উদ্দেশ্যে ইতিহাসের আস্তাকুঁড় থেকে তুলে এনেছিলেন দেশবিরোধী,স্বাধীনতার বিরোধকারী শক্তিগুলিকে, বিশেষ করে জামাতকে, ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই যাদের রাজনৈতিক দল হিসাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। জামাতকে শুধুমাত্র পুনর্বাসন দেওয়া নয়, আওয়ামি লিগের মোকাবিলা করার জন্য যাতে তারা যথেষ্ট ভা্বে শিকড় গাড়তে পারে তার জন্য জামাতকে পুনর্গঠনের জায়গাও করে দিয়েছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। কারণ সেই সময় আওয়ামি লিগই ছিল প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।


একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং তার জন্য মানুষের জান কবুল লড়াইয়ের তীব্র বিরোধিতা করা অনেক পাকিস্তানপন্থী ব্যক্তিকেই জেনারেল জিয়াউর রহমান বসিয়ে দিয়েছিলেন মন্ত্রীসভার গুরুত্বপূর্ন পদে, এমন কি প্রধানমন্ত্রীর পদেও। দেশের সংবিধানও বদলে দিয়েছিলেন তিনি \'ধর্মনিরপেক্ষ\' শব্দটি সেখান থেকে সরিয়ে দিয়ে। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশে ধর্ম-ভিত্তিক রাজনীতিকে মজবুত করা।


আর কি করেছিলেন তিনি? জামাতের প্রাক্তন প্রধান গুলাম আজমকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন, যে আজমকে স্বাধীনতার পরেই পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই পথ ধরেই দেশের দ্বিতীয় সামরিক একনায়ক জেনারেল এরশাদ স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিগুলির পুনর্বাসনের জন্য আরও অনেক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। তারও পরে, স্বামী জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক নীতি অনুসরণ করে খালেদা জিয়াও জামাত এবং অন্য সমস্ত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলির ঘনিষ্ঠ হয়ে তাদের দেশ শাসনের কাজে  সঙ্গী করেন। 


এই ভাবেই বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাব এবং পেশি শক্তি বাড়িয়ে এত দূর গেছে জামাত যে যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত এবং মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত দলের সাধারণ সম্পাদক আলি মহম্মদ মোজাহিদ এ কথা বলার স্পর্ধা করে যে, দেশ যাকে গৌরবজনক স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে থাকে, তা একটি গৃহযুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। সুতরাং যুদ্ধাপরাধ বলে একাত্তরেও কিছু ছিলনা, এখনও নেই। 

 

জিয়াউর রহমান জামাতকে রাজনৈতিক পুনর্বাসন দেওয়ার পর থেকেই এই দলের সরকারি অবস্থান ছিল এই যে, তারা একাত্তরে কোনও ভুল করেনি। \'দ্বিজাতিতত্ত্ব\' এবং \'ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান\'-এর আদর্শের স্বার্থেই যা উচিৎ মনে করা হয়েছিল, তা-ই করেছিল তারা। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম এবং স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়নি জামাত। এখন, স্বাধীনতার এত বছর পরেও মুক্তি সংগ্রামকে \'গৃহযুদ্ধ\' বলে বর্ননা করে  এই বার্তাই দিল যে দেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে তাদের মনোভাব এখনও এতটুকুও বদলায়নি। এই দলের অনুগামীদের কাছে পাকিস্তান, ইসলাম আর জামাত সমার্থক। পাকিস্তানের মতই জামাতও কুৎসা করে স্বাধীনতার বীরত্বময় সংগ্রামকে। 

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় জামাত যে ভূমিকা নিয়েছিল তার জন্য আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি অপরাধী সংগঠন হিসাবে জামাতের বিচার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জামাতের প্রাক্তন প্রধান গুলাম আজমের বিচার শেষে রায় দানের সময় বিচারক বলেন একাত্তরে যারা স্বাধীনতাবিরোধীর ভূমিকায় ছিল তারা যে এখন তিরিশ লক্ষ শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মুক্তি সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার ব্যাপারে তাদের মনোভাব বদলেছে, এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

ট্রাইব্যুনাল প্রস্তাব দেয়, স্বাধীনতাবিরোধী দল এবং ব্যক্তিদের যে কোনও সরকারী, বেসরকারী এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ন পদে থাকা নিষিদ্ধ করুক সরকার। একই সঙ্গে জামাত এবং অন্য ছ\'টি সংগঠনকে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতা্বিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার জন্য নিষিদ্ধ করার যে সুপারিশ যুদ্ধাপরাধ তদন্তকারীরা করেছেন, তা দেশের মানুষের কাছে এই মূহুর্তে সব থেকে বড় খবর। এই সব সংগঠনের যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সুপারিশও করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল থেকে এই কমিটিকে একাত্তর সালে জামাত এবং তার সমর্থনপুষ্ট সংগঠনগুলির কার্যকলাপ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছিল।

সরকার প্রথম ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ২০১০ সালের ২৫ শে মার্চ এবং দ্বিতীয়টি ২০১২ সালের ২২শে মার্চ। উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার ত্বরান্বিত করা। ট্রাইব্যুনাল-১ এ পর্যন্ত আট জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার শেষ করেছে, ট্রাইব্যুনাল-২ করেছে ন\'টি।


\'আই এইচ এস জেন\'স ২০১৩ গ্লোবাল টেররিজম অ্যান্ড ইনসারজেন্সি অ্যাটাক ইনডেক্স\' শিরোনামে আই এইচ এস ইঙ্কের একটি সমীক্ষায় জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরকে পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে বিপজ্জনক সক্রিয় অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র দলগুলির মধ্যে তৃতীয় স্থানে রাখা হয়েছে। আমেরিকা-কেন্দ্রিক এই গবেষণা সংস্থাটির তালিকা প্রকাশিত হয়েছে ১৩ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তারিখে। 


এই তালিকায় থাকা প্রথম দশটি সংগঠনের মধ্যে ইসলামি ছাত্র শিবিরের ঠিক উপরেই আছে তালিবান এবং শীর্ষ স্থানে রয়েছে  থাইল্যান্ডের বারিসান রেভোলুসি ন্যাশিওনেল। এই তথ্য পাওয়া গেছে আই এইচ এসের ওয়েবসাইটে পোস্ট করা একটি প্রেস রিলিজ থেকে। 

এই  তালিকা আসলে পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা  সন্ত্রাসবাদী এবং বিদ্রোহী সংগঠনগুলির কর্মপ্রবণতা এবং বিভিন্ন ঘটনা থেকে নেওয়া  তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা একটি বার্ষিক প্রতিবেদন। এই আই এইচ এস ইঙ্কের অধীনেই আছে জেন\'স ইনফরমেশন গ্রুপ, যাদের  জেন\'স ডিফেন্স উইকলিকে সারা পৃথিবীর সামরিক এবং বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের উপর প্রকাশিত অগ্রগণ্য পত্রিকা বলে মনে করা হয়। 

এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই সারা পৃথিবীতে  অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র সংগঠনগুলির আক্রমণের ঘটনা ভীষণ ভাবে বেড়ে গেছে।  বলা হয়েছে, "২০১৩ সালে এই ধরণের কাজকর্মের উৎপত্তিস্থল   মধ্যপ্রাচ্য, যার প্রভাবে লাগোয়া আফ্রিকা এবং দক্ষিন এশিয়ায় তৈরি হয়েছে হিংসাত্মক আন্দোলনের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য এলাকা। 

জামাত এবং তার ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবি জোরদার হতে শুরু করে যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় গণহত্যার প্রধান পরিকল্পনাকারী এবং জামাতের আমির গুলাম আজমকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সেই গুলাম আজম, যিনি দাঁত নখ দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে জন্ম নেওয়ার পরেও যাতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া না হয়, তার জন্য বিদেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিলেন এই ব্যক্তি। পাকিস্তানের মতই এই দলটিও আজ পর্যন্ত তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। আজ পর্যন্ত তারা দাবি করে থাকে যে কোনও যুদ্ধাপরাধ করেনি তারা এবং দেশে কোনও স্বাধীনতা সংগ্রামই নাকি হয়নি।

বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকার জন্য স্বাধীনতার পরেই জামাতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল এবং ১৯৭৫ অবধি তাই ছিল। এর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর ক্ষমতায় আসা সরকারগুলি জামাতকে আবার উঠে দাঁড়াবার সুযোগ করে দেয়। কোলাবরেটর্স অ্যাক্ট অসিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং মুক্তি দেওয়া হয় যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ২৩,০০০ ব্যক্তিকে। এ সবই করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালে গুলাম আজম পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরেন। পরের বছরই জামাতকে পুনর্গঠিত করেন তিনি। জামাতকে পুনর্বাসন দিতে সেই সময় ক্ষমতায় থাকা জেনারেল জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের সময় জারি করা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া সহ সব কিছুই করেছিলেন। 

এর পর দীর্ঘ সময় ধরে এই দলটি ব্যাংক থেকে শুরু করে বহু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদ সংস্থার মালিক হয়ে বিপুল আর্থিক শক্তির অধিকারী হয়েছে। বাংলাদেশের ভিতরে এবং বাইরে একটি দৃঢ় গণমাধ্যম ভিত্তি তৈরি হয়েছে এদের। এই দলের বহু নেতাই একাত্তরের গণহত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠন এবং নারকীয় অত্যাচারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস এই যে, স্বাধীনতা সংগ্রামের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনা, পাকিস্তানপন্থী দেশবিরোধী এই শক্তিই স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে এবং সারা বিশ্ব এক সময় স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালীন যে ভয়ানক অত্যাচার প্রত্যক্ষ করেছে, তাকে অস্বীকার করে এরা দাবি করছে যে সেই সময় হয়েছিল, তা গৃহযুদ্ধ, কোনও স্বাধীনতার লড়াই নয়। 

পাকিস্তানের আই এস আই-এর সঙ্গে জামাতের যোগাযোগ এ কথাই প্রমাণ করে যে, দলটি কর্মসূচী যদি আগে থেকে থাকে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করা,তবে এখন তা সেই স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করে দেশকে পাকিস্তানের দাসে পরিণত করা। এই অবস্থায় জামাত এবং তার ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরকে নিষিদ্ধ করা একমাত্র পথ।

যে সব মানুষ স্বাধীনতার আদর্শকে শ্রদ্ধা করেন, স্বীকৃতি দেন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মবলিদানকে, যে সব নারী  ধর্ষিতা হয়েছিলেন এবং ভিটে মাটি ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে এক সময় যাঁদের ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল, তাঁর সকলেই চান স্বাধীন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হোক জামাত। এই সংগঠনের সমস্ত তহবিল, সম্পত্তি, প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করে প্রমাণ করা হোক সত্যিই আজ বাংলাদেশ পাকিস্তানপন্থী শক্তির হাত থেকে মুক্ত।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics