Column
জামাত ও তার আর্থিক ক্ষমতা

09 Jul 2015

#

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবেবাংলাদেশে আত্মপ্রকাশ করার সময় থেকেই জামাত-এ-ইসলাম এক দিন না এক দিন অবধারিত ভাবে তাদের যুদ্ধাপরাধ বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

 এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে তারা অধ্যবসায়ের সঙ্গে বিপুল তহবিল গড়ে তুলেছে। অনেক বছর ধরে যে সম্পত্তি তারা অর্জন করেছে তার থেকে রীতিমত ভাল রকম আয় হয় এই দলের


ঢাকা বিশ্ববি্দ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আবুল বরকতের মতে জামাত \'রাষ্ট্রের মধ্যে একটি রাষ্ট্র\' এবং জাতীয় অর্থনীতির মধ্যে আর একটি অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। দেশে এরা যে সব বিভিন্ন ধরণের ব্যবসা চালায় তার থেকে বছরে গড় আয় হয় ২৭৮ মিলিয়ন ডলার। এর দশ শতাংশ খরচ হয় জামাতের এবং অন্যান্য জঙ্গি ধর্মীয় সংগঠনগুলির খরচ যোগাতে।

অধ্যাপক বরকতের কথা অনুযায়ী যেখানে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ৫-৬ শতাংশ, জামাত-নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির বার্ষিক বৃদ্ধির হার সেখানে ৯ শতাংশ। তিনি আরও জানিয়েছেন যে জামাত-নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির আয়তন দেশের উন্নয়ন বাজেটের ৮.৬২ শতাংশ।

ব্যবসা থেকে বিপুল আয় ছাড়াও কাতার চ্যারিটেবল সোসাইটি, রিভাইভাল অফ ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটি অফ কুয়েত এবং ব্রিটেনের ইন্সটিট্যুট অফ ইসলামিক পলিটিকাল থট এবং মুসলিম এইড, ইউ কে এবং আমেরিকা-কেন্দ্রিক ইসলামিক কাউন্সিল অফ নর্থ আমেরিকা (আই সি এন এ) প্রতিষ্ঠানগুলির কাছ থেকে অর্থ পায় জামাত।

সৌদির ইসলামি এন জি ও রাবেতা-আল-আলাম-আল ইসলামিও জামাতের তহবিল জোগানোর একটি গুরুত্বপূর্ন উৎস। অন্য যে সব এন জি ও জামাতকে অর্থ পাঠায়, তাদের মধ্যে আছে কুয়েত রিলিফ ফান্ড এবং ইউ এ ই-র আল নাহিয়াত ট্রাস্ট। এই সব অর্থ এন জি ও-দের হাত থেকে  জামাত-নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক এবং দাতব্য সংস্থাগুলির মাধ্যমে পাঠানো হয়। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত আল হেরা সমাজ কল্যান ফাউন্ডেশন এই ধরণের একটি জামাত-নিয়ন্ত্রিত দাতব্য সংস্থা। ইসলামের প্রচার করা, ধর্মীয় বই ও পত্রিকা প্রকাশ করা, মাদ্রাসা ও অনাথ আশ্রম পরিচালনা করা, দাতব্য চিকিৎসালয় চালানো, দরিদ্রদের মধ্যে ঋণ ও আর্থিক অনুদান বিতরণ করা এই সংস্থার কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত।

গ্রামাঞ্চলে ইসলামের প্রচার করা ছাড়াও এই এন জি ও গুলির কর্মীরা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে ইসলামি নবজাগরণ বিষয়ক পুস্তিকাও বিলি করে থাকে। এ ছাড়া উপসাগরীয় এবং পশ্চিম এশিয় দেশগুলিতে কাজের ব্যবস্থা করে বাংলাদেশের মানুষদের পাঠায় এরা।এই ধরণের ৩০ টি সংস্থা জামাতের নিয়ন্ত্রণে আছে।

বাইরে থেকে আসা এই সব অর্থ হুন্ডি সহ বিভিন্ন রকমের গোপন পথে আসে। রাসেলা কুরিয়ার সার্ভিস একমাত্র জামাতের কাছেই তহবিল পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। এই কুরিয়ার সার্ভিসের প্রধান মুজিবুর রহমান মন্ডল জামাতের ছাত্র শাখা ইসলামি ছাত্র শিবিরের একজন প্রাক্তন সভাপতি।  

 বলা হয়, বাইরের সাহায্য থেকে জামাতের অভ্যন্তরীন আয় বেশি। তবে  যে সব দেশীয় সংস্থাগুলি থেকে এই আয় হয়,  অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পশ্চিম এশিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু সংগঠন এবং ব্যক্তির সঙ্গে সেগুলির  ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। 
দেশের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক সংস্থা এবং দক্ষিন এশিয়ার প্রথম তিনটি ব্যাংকের অন্যতম জামাত- নিয়ন্ত্রিত ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড গঠন করা হয়েছিল সৌদি আরবে। এর ৬০ শতাংশ শেয়ারের মালিক সৌদির মানুষজন এবং সংস্থা।  সৌদি আরবের আল রাজি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত এই ব্যাংকটির শুরু হয়েছিল ১৯৭৫ সালে, ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আবদুল্লা আল খাতিব এবং তাঁর স্ত্রীর উদ্যোগে। এই ব্যাংকের শেয়ার সৌদি আরব ছাড়াও ছড়িয়ে আছে ইউ এ ই, কুয়েত এবং কাতারের মত দেশগুলিতে। ইসলামি ব্যাংক যেখানে জামাতের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড, সেখানে বাংলাদেশের আরও ১৪টি ব্যাংক জামাতের নিয়ন্ত্রনাধীন। জামাতের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ন অন্যান্য অর্থনৈতিক সংস্থাগুলির মধ্যে আছে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত ফার ইস্টার্ন ইসলামি ইনস্যুরেন্স কর্পোরেশন এবং ইসলামি ব্যাংক ফাউন্ডেশন।


আর্থিক সংস্থা হাতে থাকার ফলে বিদেশ থেকে টাকা আনানো এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইসলামি সংগঠনগুলিকে অর্থ সরবরাহ করার সুযোগ হয় জামাতের। জঙ্গি সংগঠনগুলির জন্য বিদেশের অর্থ আসে প্রধানত জামাত-নিয়ন্ত্রিত ইসলামি আর্থিক সংস্থাগুলির মাধ্যমে। \'আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশ\'-য়ের প্রধান অধ্যাপক আসাদুল্লা-আল-গালিব, যাঁর মাধ্যমেও এই কাজ হয়।

জামাতের মালিকানায় বেশ কিছু প্রকাশনা সংস্থা, সংবাদপত্র এবং দ্য সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজ-য়ের মত \'থিংক ট্যাংক\' সংস্থা আছে। ২০০৫ সালে জামাতের কেন্দ্রীয় নেতা মির কাশেম আলি-প্রতিষ্ঠিত নয়া দিগন্ত বর্তমানে দেশের মধ্যে সব থেকে বেশি প্রচারিত খবরের কাগজগুলির মধ্যে অন্যতম। দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশনের মালিকানাধীন স্যাটেলাইট চ্যানেল দিগন্ত টেলিভিশন  বিশাল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে তাদের মধ্যে জামাতের আদর্শ প্রচার করে এবং দলের পক্ষে জনমত তৈরি করে।  জামাতের মুখপত্র ডেইলি সংগ্রামও দেশের অন্যতম প্রাচীন সংবাদপত্র। জামাতের প্রকাশনা সংস্থাগুলির মধ্যে আছে আধুনিক প্রকাশনী, শতাব্দী প্রকাশনী, প্রভৃতি। দলের পক্ষ থেকে ইউথ ভয়েসের মত সাময়িকী, পুস্তিকা এবং ইসলামি সাহিত্য পত্রও প্রকাশ করে বিক্রি করা হয়। 


দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রেও থাবা বসিয়েছে জামাত। দারুল উলুম কেন্দ্রে যে শিক্ষা দেওয়া হয় তা প্রযুক্তিগত দক্ষতার উপর জোর দেয়, যা তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়। দলীয় তহবিল স্ফীত করা ছাড়াও এই সংস্থাগুলি সুপরিকল্পিত ভাবে ছাত্র সমাজের উপর জামাতের প্রভা্ব বৃদ্ধি করার কাজে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা নেয়।


এর উপরে জামাতের পরিচালনায় সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা কোচিং সেন্টারগুলি থেকে মোটা অর্থ আসে দলের তহবিলে। এই ধরণের ১২ টি কোচিং সেন্টারের ৩৫ টি শাখা আছে। রেটিনা কোচিং সেন্টার, যারা ছাত্রদের মেডিক্যাল এবং এঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তির জন্য তৈরি করে, দেশের মধ্যে জামাত-পরিচালিত সব থেকে বড় কোচিং সেন্টার। এই সব সংস্থাগুলি থেকে দলের আয় কত, তা সযত্নে গোপন রাখা হয়। 

অধ্যাপক আবুল বরকত দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধাপরাধ বিচার আটকানোর জন্য পিরামিডের মত ত্রিভুজাকৃতি ঢাল নিয়ে এগিয়ে চলেছে জামাত। সেই ত্রিভুজের এক দিকে আছে \'মৌলবাদী অর্থনীতি\', যার দৃঢ় ভিত্তি রয়েছে দেশে এবং যার বৃদ্ধি দেশের আর্থিক বৃদ্ধির থেকে দ্রুত। ত্রিভুজের অন্য দুটি দিকে আছে বিপুল লোকবল এবং সাম্প্রদায়িকতা অথবা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা। অধ্যাপক বরকত বলেছেন, ইসলামি চরমপন্থা এবং মৌলবাদী অর্থনীতি--উভয়কেই দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করে যুদ্ধাপরাধ বিচারকে অর্থবহ করে তোলা দরকার।

প্রভূত সম্পদশালী জামাতের এন জি ও-গুলি সমাজে বিশেষত নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র শ্রেনীর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। জামাত মনে করে যুদ্ধাপরাধ বিচারের মধ্য দিয়ে দলকে ধ্বংস করা চেষ্টা হলে তাদের থেকে উপকার পাওয়া এই সব মানুষরাই এগিয়ে আসবেন দলকে বাঁচাতে।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics