Column
বহাল রইল মোজাহিদের মৃত্যুদন্ড

12 Jul 2015

#

১৬ই জুন তারিখে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট শীর্ষস্থানীয় ইসলামি নেতা এবং জামাত-এ-ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল আলি আহসান মহম্মদ মোজাহিদের মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছে।

১৯৭১ সালে হানাদার পাকি্যস্তানি বাহিনীর সহযোগী  হিসাবে এই ব্যক্তির যাবতীয় যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য এই শাস্তির হুকুম হয়েছিল। 


প্রাথমিক ভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বুদ্ধিজীবীদের হত্যার জন্য ২০১৩ সালে মোজাহিদের চরম শাস্তির আদেশ হয় ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালে। সেই বছরেই হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রাখে। এর পর মোজাহিদ  রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপেলেট ডিভিশনে আপীল করেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে চার সদস্যের জুরি শেষ পর্যন্ত সেই আপীলও খারিজ করে দেয়। 


আই সি টি-ঘোষিত এই মৃত্যুদন্ড, যা সুপ্রিম কোর্টও বহাল রেখেছে, বিচারাধীন অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে আইন তাদেরও ছাড়বেনা।


মোজাহিদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলি আনা হয়েছে, সেগুলি গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, বাঙালি নারীদের উপর যৌন নির্যাতন, লুন্ঠন ও অগ্নিসংযোগ সহ মোট ৩৪টি ভয়ানক ঘটনাকে নিয়ে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মোজাহিদ ঢাকার ফকিরপুল এলাকায় একটি বাড়িতে থাকতেন। স্থানীয় রাজাকারেরা তাদের অপকর্মের কৌশল তৈরি এবং তার প্রয়োগের জন্য এই বাড়িটিকে কার্যত তাদের সদর দফত করে তুলেছিল। রাজাকারদের প্রশিক্ষণ এবং বিরোধীদের অত্যাচার কেন্দ্রও হয়ে উঠেছিল এই বাড়ি। 


বাংলাদেশে \'বুদ্ধিজীবী হত্যা\', এই কথাটি ১৯৭১-এর ১৪ই ডিসেম্বর তারিখে ঘটা বুদ্ধিজীবী এবং বিভিন্ন পেশার প্রতিষ্ঠিত মানুষদের  সুপরিকল্পিত নিধন যজ্ঞকে বোঝায়। পাকিস্তানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে যে দিন বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে, তার ঠিক দু\'দিন আগে ঘটেছিলে এই নারকীয় হত্যালীলা। পাকিস্তানপন্থী এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যখন বুঝতে পারল যে তাদের পরাজয় অনিবার্য, তখন তারা এবং দখলদারি পাক বাহিনী পূর্বতন পাকিস্তানের প্রায় সব  অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী এবং পেশাদার মানুষদের বেছে নিয়ে  লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। 


এই কাজটি করার একটিই উদ্দেশ্য ছিল-তখনও অজাত বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেলেও যাতে বুদ্ধি, মননের দিক দিয়ে পঙ্গু এবং নেতৃত্বশুণ্য হয়ে থাকে। 


বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়  ধারাবাহিক গণহত্যার ঘটনাগুলির মধ্যে সব থেকে কলঙ্কজনক পর্বের নায়ক এই মোজাহিদ।


এখন, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও সেই মোজাহিদের বিচার হয়েছে এবং সে সাজা পেয়েছে, তা অবশ্যই মানুষের কাছে ন্যায়বিচারের তুষ্টি বহন করে এনেছে। সেই সময়ে যে যন্ত্রনা এবং অত্যাচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল দেশের মানুষদের তার প্রতিমূর্তি ছিল মোজাহিদ। 


মোজাহিদের বিচার এবং এই ব্যাপারে আদালতের রায় এই কথাই যেন জানিয়ে দেয় যে অপরাধী এবং অপরাধকে কখনওই ভোলা যায়না এবং বিনা বিচারে পার পেতে দেওয়া যায়না। 


তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে যখন \'অপারেশন সার্চলাইট\' নাম দিয়ে দখলদারি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সাধারণ অসামরিক মানুষদের উপর ভয়ংকরতম অত্যাচার নামিয়ে এনেছে, বাংলাভাষী মানুষদের যখন পরিকল্পিত ভাবে গণহারে হত্যা করা হচ্ছে, যখন পিছমোড়া করে হাত বাঁধা অবস্থায় হাজার হাজার মৃত মানুষের দেহ নদীর  জলে ভেসে যাওয়ার খবর আসছে প্রতিদিন, তখন মোজাহিদ এই বর্বর, নারকীয় ঘটনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, এ সবই দেশকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে \'সময়োচিত কাজ।\'


মোজাহিদ উক্তি ছিলঃ "আওয়ামি লিগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর হিন্দু অনুগামীরা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করে মানুষকে বিপথে চালিত করছেন।" "অভ্যন্তরীন এবং বহিরাক্রমণ থেকে  বাঁচাতে" তাঁর অনুগামীদের বিভিন্ন স্তরে আল বদর বাহিনী গড়ে তোলার ডাক দিয়েছিলেন মোজাহিদ।


বর্তমানে ৬৫ বছর বয়স্ক মোজাহিদকে এবার ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবে, যদি না  এর আগেই তাঁর শাস্তি রদের আবেদন নাকচ করে দেওয়া সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে এবং দেশের প্রেসিডেন্ট ক্ষমা করে প্রাণভিক্ষা দেন।


দীর্ঘ চার দশক ধরে ন্যায় বিচারের জন্য অপেক্ষা করার পর অবশেষে বাংলাদেশের মানুষ সুযোগ পেয়েছেন অতীতের সেই চরম অত্যাচারের ফলে পুষে রাখা ক্রোধ প্রকাশ করার। একাত্তরের সব অপরাধীকে ধরা সম্ভব না হলেও প্রশংসনীয় ব্যাপার এই যে, সেই সব  অপরাধ কর্মের সমস্ত চাঁইদের ধরার আন্তরিক চেষ্টা চলছে। দেশের মানুষ আশা করছেন অত্যাচারিতরা অবশেষে ন্যায়বিচার পাবেন।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics