Column
২১শে অগাস্ট ২০০৪ঃ বিচারের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা

01 Sep 2015

#

সম্প্রতি বাংলাদেশের মানুষ যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করলেন ২১শে অগাস্টের এগারোতম বার্ষিকী। ে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে নিষ্ঠুরতম দিন বলে বিবেচিত হয় এই দিনটি ।

২০০৪ সালে এই দিনে ঢাকায় আওয়ামি লিগের একটি জনসভার উপর সুপরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছিল, যাতে নিহত হয়েছিলেন আওয়ামি লিগের প্রথম সারির  ২৪ জন  নেতা-নেত্রী। নিহতদের মধ্যে ছিলেন লিগের মহিলা শাখার প্রধান এবং দেশের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সহধর্মিনী আইভি রহমান। এই বর্বর আক্রমণে আহতের সংখ্যা ছিল চারশোর বেশি, যাদের মধ্যে অনেকে জীবনের মত পঙ্গু হয়ে যান।


ঘটনার সময় আওয়ামি লিগের প্রেসিডেন্ট এবং তখনকার বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনা বক্তৃতা করছিলেন। অতি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনাকে একটি বুলেট প্রুফ গাড়িতে করে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এই আক্রমণের ফলে তাঁর শ্রবণ ক্ষমতা এবং দৃষ্টি শক্তির গুরুতর ক্ষতি হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য তাঁকে আমেরিকায় নিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে।


এই আক্রমণের পিছনে উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করা, কারণ চিরকালের মত ক্ষমতা দখল করে রাখার জন্য মরীয়া বিএনপি এবং তার আঁতাত সঙ্গী জামাতের পথের একমাত্র বাধা ছিলেন তিনিই।


পাকিস্তানপন্থী এবং ইসলামি মৌলবাদীরা শেখ হাসিনার ব্যাপারে সর্বদাই অতি সতর্ক, কেননা জনমানসে তিনিই স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শের একমাত্র বাহক। পাকিস্তান-কথিত দ্বিজাতি তত্ত্বেরও শত্রু তিনি।  একুশে অগাস্টের রক্তাক্ত ঘটনার পরে এর তদন্তের ভার নেয় সি আই ডি। কিন্তু গৃহ দপ্তরের  তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী লুৎফোজ্জামান বাবরের তত্ত্বাবধানে যে তদন্ত হয়, তা ছিল নিতান্তই প্রহসন। তদন্তকারীদের কথা অনুযায়ী জজ মিয়া নামে এক জন ছোট মাপের  অপরাধী এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তি, এক জন ছাত্র এবং আওয়ামি লিগের এক জন নেতা সহ ২০ জন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এদের মধ্যে জজ মিয়া সহ তিন জনের থেকে জোর করে ঘটনায় জড়িত থাকার ব্যাপারে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। আদালতে কিন্তু এ কথা প্রমাণ করা যায়নি। 


লোক দেখানো বিভিন্ন রকমের তদন্ত করিয়ে তখনকার বিএনপি-জামাত সরকার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল যে, বিএনপি সরকারকে হেয় করে বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসাবে দেখানোর উদ্দেশ্যে আওয়ামি লিগ নিজেই এই আক্রমণের ঘটিয়েছে (ততকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্য থেকে উদ্ধৃতি)। "বহির্দেশীয় শত্রু"র প্ররোচনায় ভারতে পালিয়ে থাকা কিছু দাগী অপরাধী এই আক্রমণ চালিয়েছিল- এমটি প্রমাণ করারও চেষ্টা হয়। 



ঘটনাটি আন্তর্জাতিক স্তরে যে আলোড়ন তুলেছিল, তার ফলে  বিএনপি সরকাকে অবশ্য পরে এফবিআই এবং ইন্টারপোলের সাহায্য চাইতে হয়েছিল, কিন্তু এই সব আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির তদন্তের ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। 


এই গ্রেনেড আক্রমণের ঘটনায় নতুন মোচড় পড়ে   যখন বিচারক মহম্মদ জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। সরকারের কাছে জমা দেওয়া কমিশনের রিপোর্টের সংক্ষিপ্তসারে দাবি করা হয় যে, ঘটনার পিছনে প্রধান মস্তিষ্ক যারা, তাদের চিহ্নিত করা গেছে। এই রিপোর্টে ভারতের নাম না করে বলা হয়েছে যে, একটি বৃহৎ বিদেশি শক্তি, যারা পাকিস্তান ভাগ করে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পিছনে সক্রিয়ভাবে ছিল, তাদের গোয়েন্দা বিভাগই এই আক্রমণের মূল হোতা। রিপোর্টটির উপসংহারে বলা হয়েছে,  যে 'শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা বিভাগ ধর্মনিরপেক্ষতা ও তার বিরোধী শক্তি এবং স্বাধীনতার পক্ষে বিপক্ষে থাকা বাংলাদেশের মানুষদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল, প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণে  আক্রমণ গঠনায় তাদের জড়িত থাকার ইঙ্গিত স্পষ্ট। 

এই সব অদ্ভূত ঘটনাপ্রবাহের পর বিনপি সরকার কেসটিকে ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দেয়। ঐ ভয়ানক আক্রমণের ঘটনার পঞ্চাশ মাস পরে, যখন সামরিক মদতে চলা তত্ত্বাবধায়ক সরকারে হাতে দেশের শাসন ক্ষমতা, সেই সময়, ২০০৮ সালে ঢাকার একটি আদালত সেই বীভৎস ঘটনার পঞ্চাশ মাস পরে, যখন  সামরিক মদতে চলা তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের শাসন ক্ষমতায় আসীন, সেই সময়, ২০০৮ সালের ২৯শে অক্টোবর তারিখে ঢাকার একটি আদালত বিএনপি-র প্রাক্তন মন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু সহ ২২ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে। অন্য ২১ জনের মধ্যে ছিল হুজির কর্মীরা। দু'হাজার ন' সালের জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনা-নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লিগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঐ বছরেরই ৩রা অগাস্ট ঢাকার স্পিডি ট্রায়াল ট্রাইব্যুনাল জজ গ্রেনেড আক্রমণের ঘটনার পুনর্তদন্তের আদেশ দেন। এর কারণ, আগের সমস্ত তদন্তের রিপোর্টই হয় বিভ্রান্তিমূলক, নয়তো বানানো এবং ভিত্তিহীন। 


 ঘটনার ৮২ মাস পর আইনরক্ষকেরা জানতে পারেন আক্রমণ এবং তার পরিকল্পনায় পূর্বতন বিএনপি-জামাত সরকারের প্রায় সব প্রথম গুরুত্বপূর্ন মন্ত্রী এবং নেতাই জড়িত ছিলেন। আক্রমণের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে শেষ করে দেওয়া। এর পর সি আই ডি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র এবং বিএনপি-র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারিক রহমান কোকোর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বের করে। কিন্তু তিনি তার আগে থেকেই লন্ডনে পালিয়ে গিয়ে সেখানে বসবাস করতে থাকায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। খালেদা জিয়ার ভ্রাতুষ্পুত্র সইফুল রহমান ডিউক, খালদার প্রাক্তন রাজনৈতিক সচিব হ্যারিস চৌধুরি,  স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান বাবর  এবং কিছু পদস্থ আমলা ও পুলিশ 
 অফিসারের বিরুদ্ধেও চার্জ আনা হয়। 


২০১১ সালে সি আই ডির ফাইল করা চার্জশিট অনুযায়ী, ইসলামি মৌলবাদীরা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সব থেকে মারাত্মক আক্রমণের ঘটনাটি ঘটানোর জন্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারিক রহমানের রাজনৈতিক দপ্তর হাওয়া ভবনের  সঙ্গে যোগসাজশ করেছিল। পরিহাসের বিষয়, সেই সরকারেরই স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মন্ত্রী বাবর আক্রমণের ঘটনায় যুক্ত ব্যক্তি অথবা সংগঠনের বিষয়ে যে কোনও তথ্যের জন্য এক কোটি টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করেছিলেন। 


 আক্রমণকারীদের এখনও ধরা যায়নি এবং মামলাটি এখনও চলছে। বোঝাই যাচ্ছে, জজ মিয়াকে জড়িয়ে মামলাটি শুরু করা হয়েছিল কেন- যাতে প্রকৃত অপরাধীদের দিক থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া  যায়- সেই উদ্দেশ্যে। 


 দু'হাজার আট সালে মামলা শুরুর সময় থেকে আজ পর্যন্ত ফৌজদারি আদালত ৪৯১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৭৬ জনের সাক্ষ্য নথিবদ্ধ করেছে। ফৌজদারি আদালতের রায়ের পর অভিযুক্তরা হাই কোর্ট এবং তার পরে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপেলেট ডিভিশনে আপিল করার সুযোগ পাবে। সুতরাং মামলার সম্পূর্ন নিষ্পত্তি হতে আরও অনেক সময় লাগতে পারে। এর অর্থ, এগারো বছর পার হয়ে গেলেও আরও অনেকটা পথ যেতে হবে এই বিচারের যবনিকা পতনের জন্য। কিছু তাৎপর্যপূর্ন অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও অদূর ভবিষ্যতে এই মামলা শেষ হওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics