Column
দারিদ্র্য অপনয়ণে বাংলাদেশের বিশেষ সাফল্য

11 Sep 2015

#

বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে এখন বলা হচ্ছে 'অসম্ভবকে সম্ভব করার দেশ।' মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোলস(এম ডি জি)-এর কর্মসূচী নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য-মুক্ত সমাজ গড়ার পথে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেছে। দেশে দারিদ্য হার কমিয়ে আনার এই অতীব উল্লেখযোগ্য সাফল্য বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছে আন্তর্জাতিক স্তরে।

২০২৫ সালের মধ্যে ক্ষুধা দূরীকরণের লক্ষ্যে নভেম্বর মাসে আমেরিকায় একটি বিশ্বব্যাপী উদ্যোগের সূচনা হতে চলেছে এবং সেই অনুষ্ঠানের 'ফোকাল কান্ট্রি' বাংলাদেশ। 

বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইয়োহানেস জুট বলেছেন, "সমস্ত রকমের প্রতিবন্ধকার সঙ্গে লড়াই করে বাংলাদেশ গত দশ বছরে এক কোটি ষাট লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য সীমার উপরে নিয়ে এসে অসাম্য কমিয়েছে। এটি একটি বিরল, উল্লেখযোগ্য সাফল্য।"

 

পনেরো কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে দারিদ্র্যই আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে সব থেকে বড় সমস্যা। তাই স্বাভাবিক ভাবেই দেশের উন্নয়ন-কর্মসূচীতে  দারিদ্র্য মোচন অগ্রাধিকার পেয়ে আসছে, যার প্রতিফলন পাওয়া যাবে সমস্ত পরিকল্পনার নথিতেই। সাম্প্রতিক কালে দারিদ্র্য কমিয়ে আনার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। এই সাফল্যের প্রায় সবটাই সম্ভব হয়েছে দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচী প্রয়োগে বর্তমান সরকারের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে। গত পাঁচ বছরের সাফল্যের হার অব্যহত থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে  দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হবে বাংলাদেশ।

  

২০১৪-১৫ সালের বাজেট প্রস্তাবে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প খাতে বরাদ্দ করা হয়েছিল ১৫০০ কোটি টাকা।
 দু' হাজার ন' সালে  যখন আওয়ামি লিগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন দেশে গরীব মানুষের সংখ্যা ছিল পাঁচ কোটি, এর মধ্যে ২. ৮৮ কোটি মানুষই ছিলেন চরম গরীব। ঐ সময় থেকে সরকারের মেয়াদকাল, অর্থাৎ ২০১৪ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার গড়ে ১.১৬ শতাংশ বাড়লেও গরীব এবং অতি গরীবের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩.৮৫ কোটি এবং ১.৫৭ কোটি। উল্লেখযোগ্য যে, অতি দরিদ্র্য সীমায় বাস করা মানুষদের ৪৫ শতাংশ উপরে তুলে আনা হয়েছে গত পাঁচ বছরে।

২০১৪-১৫ সালের বাজেট প্রস্তাবে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প খাতে বরাদ্দ করা হয়েছিল ১৫০০ কোটি টাকা। ২০১০ সালের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভের রিপোর্টে প্রকাশ, দেশের ২৪.৫৭ শতাংশ পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছিল। 

 

দারিদ্র্য দূরীকরণে গতি আনতে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলিকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ভর করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই ভাবে এই মূহুর্তে বাংলাদেশ 'ন্যাশনাল সোশাল প্রোটেকশন স্ট্র্যাটেজি'র দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। হতদরিদ্রদের তালিকা তৈরি এবং একটি 'ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার' তৈরি করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যাতে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের প্রকৃত উপকৃতদের চিহ্নিত করা যায়। 

 

বিভিন্ন ধরণের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প রচনা করার জন্য শেখ হাসিনা সরকার মূলত চারটি নীতি অনুসরণ করে চলেছেঃ

 

(১) বিশেষ ভাতা দিয়ে অতি দরিদ্রদের আর্থিক ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা

 

(২) ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের মাধ্যমে অতি দরিদ্র্দের জন্য কাজ এবং স্বনির্ভরতার সুযোগ তৈরি করা

 

(৩) বিনা মূল্যে অথবা সামান্য মূল্যে খাদ্য সাহায্য দিয়ে অতি দরিদ্রদের খাদ্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা

 

(৪) শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ দিয়ে অতি দরিদ্রদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা

 

  খাদ্য, আশ্রয়, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের মত মানুষের ন্যূনতম চাহিদাগুলি পূরণ করার উদ্দেশ্যে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি তৈরি করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে যে প্রকল্পগুলি হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলি হল ফুড ফর ওয়ার্ক (এফ এফ ডাব্লু), ভালনারেবল গ্রুপ ডেভলপমেন্ট (ভিজিডি), ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ), ওল্ড এজ অ্যালাওন্সেজ ফর রিটার্ডেড পিপল, অ্যালাওয়ন্সেজ ফর উইডোজ অ্যান্ড ডিসট্রেসড উইমেন এবং গ্র্যান্টস ফর অরফ্যানেজেস। 

 

এ ছাড়াও আছে মাইক্রো ক্রেডিট প্রোগ্রাম, অ্যালাওয়েন্সেজ ফর ফ্রিডম ফাইটার্স, ইত্যাদি। সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় থাকা মানুষদের মধ্যে দুর্গত মহিলা, শিশু এবং বিকলাংগ মানুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই ধরণের প্রকল্পগুলি আবার দু'টি ভাগে বিভক্তঃ সামাজিক সুরক্ষা এবং সামাজিক ক্ষমতায়ণ। সামাজিক সুরক্ষা শ্রেনীর প্রকল্পগুলিতে নগদে ভাতা প্রদান, খাদ্য সুরক্ষা প্রদান এবং নতুন কর্মসূচী রূপায়নে অর্থ বরাদ্দ করা হয়ে থাকে। অন্য দিকে সামাজিক ক্ষমতায়নের প্রকল্পগুলিতে গৃহনির্মাণ এবং পুনর্বাসন, ক্ষুদ্র ঋণ,বিবিধ তহবিল এবং উন্নয়ণমূলক কর্মসূচী নেওয়া হয়।

 

১৯৯০ সালে থেকে ধরলে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ৬০ শতাংশ থেকে নেমে ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
 খাদ্য সুরক্ষার জন্য সরকার থেকে বিভিন্ন ধরণের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা প্রকল্পগুলির মধ্যে আছে ভালনারেবল গ্রুপ ফান্ডিং (ভিজিএফ), ওপেন মার্কেট সেলস (ওএমএস), ক্যাশ ফর ওয়ার্ক (সিএফডাব্লু), ফুড ফর ওয়ার্ক (এফ এফ ডাব্লু), ভালনারেবল গ্রুপ ডেভলপমেন্ট (ভিজিডি), গ্র্যাচুইশাস রিলিফ (জি আর) এবং হান্ড্রেড ডেজ এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিম।

 

১৯৯০ সালে থেকে ধরলে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ৬০ শতাংশ থেকে নেমে ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা। সরকারের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্য ১৩.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। মাধ্যমিক স্কুলগুলিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লিঙ্গ অসাম্য দূর হয়েছে, শিশু মৃত্যুর হার অর্ধেক হয়েছে ১৯৯০ সালে থেকে এ পর্যন্ত এবং ২০১২ সালের মধ্যে মানুষের গড় আয়ু দশ বছর বেড়ে ৬৯ বছরে দাঁড়িয়েছে, যা ভারতের থেকে ৪ বছর বেশি।  দক্ষিন এশিয়ায় সামান্য কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি দেশ যে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস-এর প্রায় সব ক'টি লক্ষ্যমাত্রায় সফল হয়ে এখন পরবর্তী লক্ষ্যের দিকে এগোনোর জন্য তৈরি হচ্ছে।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics