Column
জামাত প্রধান নিজামির প্রাণদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে শুনানি শুরু

19 Sep 2015

#

সেপ্টেম্বর মাসের ন' তারিখ থেকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে জামাত প্রধান মতিউর রহমান নিজামির প্রাণদন্ডের আদেশের বিরুদ্ধে আপীলের শুনানি শুরু হয়েছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করার দায়ে  যুদ্ধাপরাধ  ট্রাইব্যুনাল গত বছরের ২৯শে অক্টোবর এই সাজার আদেশ দিয়েছিল  নিজামির বিরুদ্ধে। চারটি  অভিযোগে নিজামি দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় আই সি টি-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম এনায়েতুর রহমান এই প্রাণদন্ডাদেশ দিয়েছিলেন।

 
১৯৭১ সালের ১৪ই নভেম্বর সংখ্যায় জামাতের মুখপত্র দৈনিক সংবাদ-এ নিজামির বক্তব্য ছাপা হয়েছিল এই বলেঃ "সে দিন আর বেশি দূরে নেই, যখন দেশপ্রেমিক পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে আল-বদরের তরুণ দল ভারতের ধ্বংস সাধন করে হিন্দু শক্তি এবং তাদের সহযোগীদের (স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সংগ্রামীদের এই ভাবে চিহ্নিত করত পাকিস্তানপন্থীরা) সারা বিশ্বে ইসলামের জয় পতাকা ওড়াবে।"
 
"যে সব ভয়ানক অপরাধের জন্য নিজামি দোষী সাব্যস্ত হয়েছে,  মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনও শাস্তি তার সমতুল্য হতে পারেনা," রায় দানের সময় বিচারক বলেছিলেন।
 
"অপরাধীদের যাতে তাদের কৃতকর্মের জন্য মূল্য দিতে হয়, তা সুনিশ্চিত করাই বিচারের উদ্দেশ্য। যে চরম অপরাধ করা হয়েছিল, তা বিবেচনা করলে নৃশংস ভাবে খুন হওয়া বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন পেশার প্রতিষ্ঠিত মানুষ এবং নিরস্ত্র অসামরিক ব্যক্তিদের আত্মীয় স্বজনদের সুবিচারের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য," মন্তব্য করেছিলেন বিচারক।
 
নিজেকে নির্দোষ বলে দাবী করে নিজামি ২৩শে নভেম্বর, ২০১৪ তারিখে এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেন।  আপীলের শুনানি শুরু হওয়ার পর চার সদস্যের অ্যাপেলেট ডিভিশন ৩র নভেম্বর পর্যন্ত শুনানি মুলতুবি রেখেছেন।
 
স্বাধীনতা সংগ্রাম চলার সময় নিজামি এবং তাঁর চ্যালা চামুন্ডারা মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের সমর্থক-দরদীদের সম্পর্কে দখলদারি পাকিস্তানি বাহিনীকে খোঁজখবর দিত, বিভিন্ন সেনা শিবির এবং বধ্যভূমিতে তাঁদের অপহরণ করে এনে হত্যা করত এবং জ্বালিয়ে ছারখার করে দিত এই সব হতভাগ্য মানুষদের বাড়িঘর । শুধু তাই নয়, বাঙালি মেয়েদের তুলে এনে সেনা শিবির গুলিতে যৌন ক্রীতদাসী হিসেবে চালান করত তাদের এবং ইসলামকে রক্ষা করার নামে ধর্ষণ করত মহিলাদের।
 
মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আক্রমণকারী, দখলদারি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সমর্থনে প্রকাশ্য বক্তব্য রেখে এবং খবরের কাগজে নিবন্ধ লিখে নিজামি সেই সময় তার অনুগামীদের প্ররোচিত করেছিল। ১৯৭১ সালের ১৪ই নভেম্বর সংখ্যায় জামাতের মুখপত্র দৈনিক সংবাদ-এ নিজামির বক্তব্য ছাপা হয়েছিল এই বলেঃ "সে দিন আর বেশি দূরে নেই, যখন দেশপ্রেমিক পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে আল-বদরের তরুণ দল ভারতের ধ্বংস সাধন করে হিন্দু শক্তি এবং তাদের সহযোগীদের (স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সংগ্রামীদের এই ভাবে চিহ্নিত করত পাকিস্তানপন্থীরা) সারা বিশ্বে ইসলামের জয় পতাকা ওড়াবে।"
 
মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষে থাকা মানুষদের 'ইসলামের শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করে নিজামি এবং অন্যান্য শীর্ষ জামাত নেতারা তাঁদের বক্তৃতায় ইসলামের অপব্যাখ্যা করে অনুগামীদের উত্তেজিত, প্ররোচিত করতেন। সেই সময়কার সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে কতকগুলি বাক্যবন্ধ, যেমন, "পাকিস্তান ঈশ্বরের বাসস্থান", "হিন্দুরা মুসলমানদের শত্রু", "পাকিস্তান এবং ইসলাম অবিভাজ্য"-ইত্যাদি ভুল বার্তা সত্যি হিসবে এক দল তরুণের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইসলামি আদর্শের নামে এই সব প্রচারে উদ্দীপ্ত এই সব বিপথগামী তরুণ পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভয়াবহ সব অপরাধ কর্ম করেছিল।
 
মামলার নথি থেকে প্রকাশ, অন্তত ৬০১ জন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা এবং ৩১ জন মহিলার ধর্ষণে জড়িত ছিল জামাতের 'মহান নেতা' নিজামি। তার বিরুদ্ধে আনা  সব চেয়ে ভয়ানক অভিযোগ, বাংলাদেশের বিজয় দিবসের আগে দিয়ে পরিকল্পনামাফিক বুদ্ধিজীবী এবং প্রতিষ্ঠিত পেশাদার ব্যক্তিদের গণ হারে হত্যা করে দেশের শ্রেষ্ঠ মেধার অধিকারীদের নিশ্চিহ্ন করায় বড় ভূমিকা নিয়েছিল সে। এই দুষ্কর্মের উদ্দেশ্য ছিল যাতে স্বাধীনতা পেলেও মেধাশুণ্য হয়ে যায় তখনও অজাত বাংলাদেশ । পাকিস্তানি দখলদারি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগী শক্তি, বিশেষত নিজামির নেতৃত্বাধীন রাজাকার ও আল-বদর বাহিনী বেছে বেছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবী এবং প্রতিষ্ঠিত পেশাদার ব্যক্তিদের হত্যা করেছিল স্বাধীন হতে চলা বাংলাদেশকে মরণকামড় দেওয়ার জন্য। তাঁদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে, বাইরে টেনে এনে, চোখ বেঁধে চরম অত্যাচারের পর হত্যা করা হত এবং দেহগুলি পুঁতে দেওয়া হত গণ কবরে। 

অন্তত ৬০১ জন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা এবং ৩১ জন মহিলার ধর্ষণে জড়িত ছিল জামাতের 'মহান নেতা' নিজামি। তার বিরুদ্ধে আনা সব চেয়ে ভয়ানক অভিযোগ, বাংলাদেশের বিজয় দিবসের আগে দিয়ে পরিকল্পনামাফিক বুদ্ধিজীবী এবং প্রতিষ্ঠিত পেশাদার ব্যক্তিদের গণ হারে হত্যা করে দেশের শ্রেষ্ঠ মেধার অধিকারীদের নিশ্চিহ্ন করায় বড় ভূমিকা নিয়েছিল সে।
 
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপেলেট ডিভিশন আর এক জামাত নেতা দেলওয়ার হোসেন সাইদির প্রাণদন্ডের আদেশ খারিজ করে দিয়েছিল, যদিও বিচার চলাকালে প্রমাণিত হয়ে গেছিল যে, স্বাধীনতা সংগ্রামকে গুঁড়িয়ে দিতে যে গণহত্যা এবং গণধর্ষণ চলেছিল, তাতে এই ব্যক্তি সম্পূর্ন ভাবে জড়িত ছিল। তাই সুপ্রিম কোর্টের রায় দেশের মানুষ এবং সরকারের কাছে একটি বড় আঘাত হিসেবে এসেছিল। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুব আলম এই রায়ের  ব্যাপারে তাঁর হতাশা গোপন না রেখে মন্তব্য করেছিলেন যে, প্রাণদন্ড মকুব করে সাইদিকে যাবজ্জীবন কারাবাসের আদেশ অত্যন্ত আশ্চর্যজনক।
 
ইসলামের আড়াল নিয়ে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর অমানুষিক অত্যাচার চালিয়েছিল, দেশের মেয়েদের ধর্ষণ করেছিল, তুলে দিয়েছিল সেনাবাহিনীর হাতে যৌন ক্রীতদাসী হিসেবে, স্বাধীনতা সংগ্রামকে গুঁড়িয়ে দিতে যারা নামিয়ে এনেছিল ভয়াবহ সন্ত্রাস, তারা প্রকৃতপক্ষে তাদের পাকিস্তানি প্রভুদের থেকেও বড় অপরাধী, বড় শয়তান। কোনও ক্ষমাই তাদের প্রাপ্য নয়। নিজামির মত ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীর জন্য মৃত্যু ছাড়া অন্য যে কোনও শাস্তি  ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতা হিসেবে দেখা দেবে।
 
এখানে উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম অস্ত্র পাচার, ২০০৪ মামলাতেও নিজামির প্রাণদন্ডের হুকুম হয়েছে। 



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics