Column
স্বাধীনতা সংগ্রামীর মর্যাদা পেলেন 'বীরাঙ্গনা'রা

17 Oct 2015

#

১২ই অক্টোবর তারিখ একটি গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ৪১ জন 'বীরাঙ্গনা'র একটি তালিকা প্রকাশ করে দখলদারি পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের দ্বারা যৌন নির্যাতিতা মহিলাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্বীকৃতি দিল বাংলাদেশ সরকার।

এই স্বীকৃতি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই সব মহিলাদের অবদানের জন্য। অন্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মতই বেশ কিছু বিশেষ সুযোগ সুবিধা এবং মাসিক ভাতা পাবেন  বীরাঙ্গনারা। স্বীকৃতি দানের সিদ্ধান্ত গত বছরের ১৩ই অক্টোবরে নিয়েছিল শেখ হাসিনা-সরকার।

 

একাত্তরে ন' মাস ধরে স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালীন খুনে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় তাঁবেদারদের হাতে ঠিক কত নারী লাঞ্ছিতা হয়েছিলেন, তার সঠিক হিসাব জানা নেই। বিভিন্ন মতে এই সংখ্যা বিভিন্ন রকম, কিন্তু যে ভয়ংকর কাহিনী সবাই বলে থাকে, তা চার দশক আগের মত এখনও একই রকম হৃদয়বিদারী।
বাংলাদেশ সংসদে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে 'বীরাঙ্গনা', অর্থাৎ ১৯৭১ এর ধর্ষণকান্ডের শিকার যে সব দুর্ভাগ্যপীড়িত নারী, তাঁদের স্বাধীনতা সংগ্রামীর মর্যাদা দিয়ে তাঁদের এবং তাঁদের সন্তানদের কিছু রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগের অধিকারী করা হয়েছে। সরকার থেকে এই বীরাঙ্গনাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করার কাজও শুরু হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে শেষ করা হবে।

 

একাত্তরে ন' মাস ধরে স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালীন খুনে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় তাঁবেদারদের হাতে ঠিক কত নারী লাঞ্ছিতা হয়েছিলেন, তার সঠিক হিসাব জানা নেই। বিভিন্ন মতে এই সংখ্যা বিভিন্ন রকম, কিন্তু যে ভয়ংকর কাহিনী সবাই বলে থাকে, তা চার দশক আগের মত এখনও একই রকম হৃদয়বিদারী।

 

একাত্তরে ধর্ষিতাদের সংখ্যা দু' থেকে চার লক্ষ বলে ধরা হয়ে থাকে। স্বাধীনতা সংগ্রামের অবসানে বাংলাদেশে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের অনুরোধে কাজ করতে আসা চিকিৎসক ডাঃ জিওফ্রে ডেভি্সের হিসাব অনুযায়ী, ধর্ষিতাদের সংখ্যা নিয়ে যা সাধারণত বলা হয়ে থাকে তা আসল সংখ্যার তুলনায়  'অত্যন্ত রক্ষণশীল'। 

 

এই পাশবিক তান্ডব যারা চালিয়েছিল, তারা রাত্রি  বেলা বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে পরিবার পরিজনের সামনে মহিলাদের উপর যৌন নির্যাতন করত। উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শাস্তি দেওয়া এবং সন্ত্রস্ত করে তোলা। অল্প বয়সী মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে বন্দী করে রাখা হত বিশেষ সেনা শিবিরে, আর সেখানে দিনের পর দিন গণধর্ষণ চলত তাদের উপর। সেনা শিবিরে আটক এই সব নারীদের অনেককেই পরে হত্যা করা হয়েছিল অথবা অসম্মানের লজ্জা থেকে নিষ্কৃতি পেতে আত্মহত্যা করেছিলেন তাঁরা। কার্যত বেশ্যালয়ে পরিণত হওয়া যে সব সেনা শিবিরে অপহরণ করে আনা মেয়েদের আটকে রাখা হত, সে রকম একটি জায়গা সম্পর্কে টাইম পত্রিকায় এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিলঃ

 

"ভয়ংকরতম যত তথ্য প্রকাশ পেয়েছে তার মধ্যে একটি বাঙালি মহিলাদের নিয়ে, যাদের মধ্যে অনেকেরই বয়স মাত্র ১৮, যাদের সংগ্রামের প্রথম দিককার সময় থেকেই ঢাকার ঘিঞ্জি মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে আটকে রাখা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন বাড়ি থেকে তুলে এনে সৈন্যদের যৌনদাসী হতে বাধ্য করা এই সব মেয়েরা সবাই তিন থেকে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তাদের গর্ভপাত ঘটাতে সেনারা নাকি তাদের ছাউনিতেই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের এনেছিল, কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল তাতে। এর পর সেনারা সেই মেয়েদের ছেড়ে দিতে শুরু করে এবং বাড়ির পথে পা বাড়ানোর সময় তাদের অনেকেরই কোলে তখন পাকিস্তানি সৈন্যদের ঔরসে জন্মানো শিশু।" 

 

এই রকম বহু সহস্র মহিলাকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে দেহ গণকবরে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, টুকরো করে দেওয়া হয়েছে তাঁদের স্তন এবং গোপনাঙ্গ। প্রাণে বেঁচে যাওয়া যে সব ধর্ষিতা পরিবার পরিত্যক্তা হয়েছিলেন,  তাঁরা গোপনে ভারতে চলে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এঁদের অনেকেই তাঁদের শিশু সন্তানকে হত্যা করেছেন অথবা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। ধর্ষণের শিকার এই সব মহিলাদের ভাগ্যে কোনও সম্মান জোটেনি পরিবার অথবা সমাজের থেকে।  তাঁদের অনেকেরই পরিবার 'সতীত্ব হারানো'কে চরম লজ্জাজনক ব্যাপার  মনে করে ঘরের মেয়ে-বউকে পরিত্যাগ করেছিলেন।

 

সংগ্রামের শেষে ধর্ষণের শিকার এই সব মহিলাদের দ্বিতীয় বার যাতনার মধ্যে দিয়ে যেতে হলো। ঢাকার ত্রাণ শিবিরে কাজ করা চিকিৎসকদের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ১৭০,০০০ গর্ভপাত করানো হয়েছিল এবং জন্ম নিয়েছিল ৪৫,০০০ জারজ সন্তান। ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অফ জুরিস্টস-এর একটি রিপোর্ট বলেছে সঠিক সংখ্যা যা-ই হোক না কেন, ব্রিটিশ এবং আমেরিকান সার্জনদের বিভিন্ন দল যে সমানে গর্ভপাত ঘটানোর কাজ করে গেছেন এবং দুর্ভাগ্যের শিকার এই সব মেয়েদের যাতে তাঁদের পরিবার গ্রহণ করে তার জন্য সরকারের করা নিরন্তর প্রচার থেকেই প্রমাণিত হয় কী ব্যাপক হারে ঘটেছিল ধর্ষণের ঘটনা। উপরওয়ালাদের থেকে ঢালাও অনুমতি পাওয়া সাধারণ সৈন্যরাই যে শুধু এই কান্ডে লিপ্ত ছিল তা নয়, পাকিস্তানি সেনা অফিসারেরাও অপহরণ করে আনা নারীদের নিজেদের ভোগের জন্য বন্দী করে রাখতেন। 

 

ধর্ষণের শিকার যাঁরা হয়েছিলেন, দেশের স্বাধীনতার পর তাঁদের 'সামাজিক আবিলতা' ও লজ্জার চিহ্ন বলে মনে করত সাধারণ পরিবারগুলি। এই ধর্ষিতাদের 'বীরাঙ্গনা' নাম দিয়েছিলেন   রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমান,  কিন্তু পরবর্তীকালে এই শব্দটি একটি ভিন্ন অর্থ পরিগ্রহ করে মনে করিয়ে দিত যে এই মহিলারা ধর্ষিতা হয়েছেন, সম্ভ্রম হানি করা হয়েছে তাঁদের। দুর্ভাগ্যক্রমে 'বীরাঙ্গনা' শব্দটি এক সময় 'বারাঙ্গনা'র সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে যায়।
 
 এই সব মহিলাদের বিবাহ দেওয়া এবং সত্যিই যুদ্ধের বীরাঙ্গনা হিসাবে সমাজে তাঁদের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করার যে কৌশল নিয়েছিল তখনকার সরকার, তা ব্যর্থ হয়, কারণ খুব কম পুরুষই এঁদের বিয়ে করতে এগিয়ে আসতেন, এবং যাঁরাও বা আসতেন, তাঁরা আশা করতেন এর বিনিময়ে সরকার তাঁদের বিশাল যৌতুক দেবে। যে সব মহিলার বিয়ে হয়েছিল, স্বামীর ঘরে তাঁরা সাধারণত দুর্ব্যবহার পেতেন এবং বেশির ভাগ 'বীরাঙ্গনা' স্ত্রীদেরই তাঁদের স্বামীরা যৌতুক পেয়ে যাওয়ার পর ত্যাগ করতেন।
 
দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই বীরাঙ্গনাদের যে চরম আত্মত্যাগ করতে হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। এর আগে এত দিন ধরে এঁদের অবদান যে স্বীকৃতি পায়নি, তা সত্যিই জাতীয় ব্যর্থতা। লোকে এঁদের সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার করত যেন ধর্ষিতা হওয়া এই মহিলারা নিজেরাই অপরাধ করেছেন। 'বীরাঙ্গনা'দের বুক ভেঙ্গে দেওয়া বহু কাহিনীই বহুদিন ধরে লজ্জা আর গোপনীয়তার আড়ালে ছিল। . 
এই রকম বহু সহস্র মহিলাকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে দেহ গণকবরে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, টুকরো করে দেওয়া হয়েছে তাঁদের স্তন এবং গোপনাঙ্গ। প্রাণে বেঁচে যাওয়া যে সব ধর্ষিতা পরিবার পরিত্যক্তা হয়েছিলেন, তাঁরা গোপনে ভারতে চলে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এঁদের অনেকেই তাঁদের শিশু সন্তানকে হত্যা করেছেন অথবা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।

 

যে অবর্ননীয় মানসিক যাতনার মধ্য দিয়ে একাত্তরের যৌন নিগৃহিতাদের যেতে হয়েছে, সে কথা ভেবেই এই সব দুঃখী মহিলাদের স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে স্বীকৃতি জানিয়ে তাঁদের ও তাঁদের সন্তানদের কিছু সরকারি সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমানের শেখ হাসিনা-সরকার। দেরি হলেও এই মহান কীর্তি দেশ-বিদেশের সমস্ত মহল থেকেই প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখে। শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন, তাঁর জন্যেই একাত্তরের এই বীরাঙ্গনারা এখন থেকে পুরুষ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মতই সম্মান ও মর্যাদা পাবেন।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics