Column
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দূর্নীতির নানা মামলা

02 May 2016

#

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া অতীতে অনেক বারই জিয়া অরফ্যানেজ এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গ্রাফট মামলার শুনানিতে গরহাজির থেকেছেন।এই দু'টি দূর্নীতি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে বিচারের উপর স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করেছে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ।

উনিশশো একাশি সালে আততায়ীদের হাতে নিহত তাঁর স্বামী এবং প্রাক্তন সামরিক শাসক জিয়ায়ুর রহমানের নাম অনুসারে জিয়া অরফ্যানেজ ট্রাস্ট গঠন করে তার থেকে দু'কোটি দশ লক্ষ টাকা তছরূপের দায়ে খালেদা জিয়া এবং তাঁর পুত্র এবং বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারিক রহমান সহ আরও পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মামলা শুরু করেছিল অ্যান্টি কোরাপশন কমিশন (এসিসি)।
জিয়া অরফ্যানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গ্রাফট মামলায়  তাঁকে অভিযুক্ত করার বিরুদ্ধে যে পিটিশন দাখিল করেছিলেন খালেদা জিয়া, আদালত তা এক কথায় খারিজ করে দিয়েছে।

 

উনিশশো একাশি সালে আততায়ীদের হাতে নিহত তাঁর স্বামী এবং প্রাক্তন সামরিক শাসক জিয়ায়ুর রহমানের নাম অনুসারে জিয়া অরফ্যানেজ ট্রাস্ট গঠন করে তার থেকে দু'কোটি দশ লক্ষ টাকা তছরূপের দায়ে খালেদা জিয়া এবং তাঁর পুত্র এবং বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারিক রহমান সহ আরও পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মামলা শুরু করেছিল অ্যান্টি কোরাপশন কমিশন (এসিসি)। ১৯৯১ সালে ইউনাইটে সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ১,২৫৫,০০০ মার্কিন ডলারের- সে সময়কার বিনিময় মূল্যে যা ছিল ৪.৪৫ কোটি টাকার সমান- অনুদান আসে  প্রধানমন্ত্রীর অরফ্যানেজ ফান্ডের নামে। টাকা আসার অল্প কিছুদিন আগেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গঠন করেছিলেন এই ফান্ড।

 

অন্য একটি মামলায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট নামের একটি সংস্থা থেকে চার লক্ষ ডলার (তিন কোটি দশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা) সরানোর অভিযোগেও খালেদা জিয়া এবং আরও তিন জনকে অভিযুক্ত করেছে এসিসি।খালেদা জিয়া এবং তাঁর পুত্র তারিক এই ফান্ডটি চালাতেন। এই ট্রাস্টের আয়-ব্যায়ের ঘোষণা এবং কাজকর্মের হিসাবে বিস্তর অসংগতি রয়েছে এবং এই ধরণের ট্রাস্ট সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নিয়ম-বিধি ভংগের পরিষ্কার নজির আছে। মনে করা হয়, অসাধু উপায়ে অর্জিত ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের  অর্থই এই ট্রাস্টের আয়ের প্রধান উৎস ছিল। বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা এমন মনে করা হচ্ছে যে, ব্যক্তি এবং পরিবারের প্রয়োজনে এই ফান্ড থেকে বিভিন্ন সময়ে  টাকা তোলা হয়েছে।

 

এই দু'টি ছাড়া আরও কয়েকটি দূর্নীতি বিষয়ক মামলা ঝুলছে খালেদা জিয়ার নামে। তার মধ্যে আছেঃ

 

গ্যাটকো মামলাঃ তেজগাঁও থানায় এসিসির দায়ের করা একটি অভিযোগে বলা হয়েছে যে, ২০০৩ সালের পয়লা মার্চ খালেদা জিয়া বিধিবদ্ধ পদ্ধতি অনুসরণ না করে গ্লোবাল অ্যাগ্রো ট্রেড কোম্পানি(গ্যাটকো)কে অবৈধ ভাবে ঢাকার ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপো এবং সাউথ ইস্টার্ন চিটাগং পোর্টের ঠিকাদারি বরাত পাইয়ে দিয়েছিলেন। এর ফলে রাষ্ট্রের ১৪০ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ এক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

 

নিকো মামলাঃ .এই মামলায় এসিসি খালেদা জিয়া এবং অন্য দশ জনের নামে চার্জশিট দিয়েছে। কেস রিপোর্ট জানাচ্ছে যে, প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন ব্যাপারে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কানাডার তেল এবং গ্যাস অনুসন্ধানকারী সংস্থা নিকোর সঙ্গে নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে চুক্তি অনুমোদন করা হয়, এবং তা করা হয় অর্থের বিনিময়ে। পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড  প্রোডাকশন কোম্পানি এই চুক্তির বিরোধিতা করে, কিন্ত এ সব কিছু অগ্রাহ্য করে নিকোকে বরাত দেওয়া সমর্থন করেন এবং তার ফলে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয় ১৩,৭৭৭ কোটি টাকা।

 

বরপুকুরিয়া কোল মাইন উৎকোচ মামলা ঃ এই মামলাতেও বেনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যম্য একটি চিনা কোম্পানিকে বরাত পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত খালেদা জিয়া এবং আরও ১৫ জন। চায়না ন্যাশনাল অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশনকে এই কন্ট্রাক্ট পাইয়ে দেওয়ায় সরকারের ক্ষতি হয় ১৫৮.৭১ কোটি টাকা।

সর্বনাশ আসন্ন বুঝে তাঁর বিনপির কর্মীদের জড়ো করে খালেদা জিয়া এখন প্রচার করতে চাইছেন যে, তাঁর এবং তাঁর পুত্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগগুলি আনা হয়েছে। লোকের নজর ঘুরিয়ে দিতে আওয়ামি লিগকে জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে ভারতের হয়ে কাজ করা দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছেন তিনি।

 

 

টেলিলিংক প্রোজেক্টঃ  এই কেলেংকারির ঘটনা এই যে, তাঁর প্রধানমন্ত্রী পদের অপব্যবহার করে খালেদা জিয়া এই প্রকল্পটি জার্মানির টেলিকম এবং আই টি কোম্পানি সিমেন্স এবং একটি চিনা কোম্পানির হাতে তুলে দিতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। আরও গুরুতর ব্যাপার এই যে, তৎকালীন টেলিকমুনিকেশন মন্ত্রী আমিনুল হক এবং খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফত রহমান কোকো, যিনি সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় প্রয়াত হয়েছেন, এই দু'টি বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে উৎকোচ নিয়েছিলেন এবং সেই অর্থ রাখা হয়েছিল বিদেশি ব্যাংকে। তদন্তে এই সব তথ্যই প্রকাশ পেয়েছে।

 

বিএনপি-শাসনকালে (২০০১-২০০৬), যখন খালেদা জিয়া দেশের সর্বশক্তিমান ব্যক্তি, সেই সময় তিনি বিভিন্ন গোপন লেনদেনে নিজেকে জড়ান। এগুলির মধ্যে আছে অর্থের বিনিময়ে মন্ত্রীত্ব দেওয়া, সরকারি ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার বদলে 'কাট মানি' আদায় করা,  কাজ দেওয়া, বদলি এবং পোস্টিং এর জন্য টাকা নেওয়া এবং সমস্ত উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বরাত পাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে 'কমিশন' আদায় করা। প্রায় উপকথায় পরিণত হওয়া জিয়া পরিবারের 'ভাঙ্গা সুটকেস' অসাধু উপায়ে অর্জিত অর্থে ভরে ওঠে। অসৎ পথে আসা সেই অর্থ পাচার করা হয় বিদেশি ব্যাংকে।

 

খালেদা জিয়ার দূর্নীতিমূলক কাজকর্মগুলি সাধারণের গোচরে আসে সামরিক মদতে থাকা তদারকি সরকার দূর্নীতি বিরোধী অভিযান চালানোর সময়। সেই সময় খালেদাকে জেলে পাঠানো হয়। এসিসির তদন্তে প্রকাশ পায় কী ভাবে অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়েছেন তিনি ও সেই সঙ্গে তাঁর পরিবার। এসিসি এবং টাস্ক ফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই)-এর অফিসারদের জেরায় বিএনপি শাসন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে কাজ করা অফিসারেরা এবং তদারকি সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হওয়া দুষ্কৃতী সন্ত্রাসবাদীরা খালেদা জিয়ার দূর্নীতিমূলক কাজের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ন খবর দিয়েছিল। বিএনপি-জামাতের সর্বশেষ শাসনকালে দেখা গিয়েছিল কী ভাবে ইসলামি জাতীয়তাবাদকে পরিচ্ছদ হিসাবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ইতিহাসের নিকৃষ্টতম দূর্নীতির জন্ম দেওয়া হয়েছিল। খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারিক রহমান, যাঁকে সামরিক সরকারের মদতে চলা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের মার্চ মাসে দূর্নীতিবিরোধী অভিযান চলার সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, এখনও বিচারকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। জামিনে ছাড়া পেয়ে ২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তিনি চিকিৎসার নাম করে গ্রেট ব্রিটেনে যান এবং তার পর থেকে আর ফিরে আসেননি। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার অন্যতম শর্ত পূরণ করতে তাঁকে বিএনপির জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেলের পদ ছাড়তে এবং সমস্ত রকম রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে সরে যেতে হয়েছিল। কিন্তু বিস্ময়কর ভাবে সম্প্রতি তাঁকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়েছে। এর অর্থ এই যে, ভবিষ্যতে মায়ের অবর্তমানে তিনিই দলকে নেতৃত্ব দেবেন। .

 

সর্বনাশ আসন্ন বুঝে তাঁর বিনপির কর্মীদের জড়ো করে খালেদা জিয়া এখন প্রচার করতে চাইছেন যে, তাঁর এবং তাঁর পুত্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগগুলি আনা হয়েছে। লোকের নজর ঘুরিয়ে দিতে আওয়ামি লিগকে জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে ভারতের হয়ে  কাজ করা দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছেন তিনি। তদারকি সরকারের পিছনে থাকা তৎকালীন সেনা প্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, যাঁর উদ্যোগের ফলে খালেদা জিয়ার দূর্নীতি এবং তাঁর পুত্রের বিদেশি ব্যাংকে থাকা অসাধু উপায়ে অর্জিত সম্পত্তির কথা প্রকাশ পেয়েছিল, তাঁর বিচারের দাবিও সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন তিনি।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics