Column
যুদ্ধাপরাধ স্বীকার না করায় একগুঁয়ে পাকিস্তান

08 May 2016

#

বাংলাদেশের মানুষ তীব্র আঘাতপ্রাপ্ত, অপমানিত! জামাত নেতা এবং সুপরিচিত যুদ্ধাপরাধী আলি আহসান মহম্মদ মোজাহিদ এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরির প্রাণদন্ড কার্যকর করার নিন্দা করে এবং ১৯৭১-এর ঘটনাবলীকে খুঁড়ে বের না করার জন্য বাংলাদেশকে হুঁশিয়ারি দিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি।

দখলদারি পাক সেনা এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের হাতে ১৯৭১ সালে ঠিক কত মানুষ নিহত হয়েছিলেন তার সঠিক হিসাব অজানা। তবে কোনও কোনও হিসাব অনুযায়ী সেই সংখ্যা তিরিশ লক্ষ এবং এ ছাড়াও আরও আট থেকে দশ লক্ষ হিন্দু ও মুসলমান নিরাপত্তার অভাবে দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রতিবেশী ভারতে। নানা ধরণের মানবতাবিরোধী অপরাধ করা ছাড়াও পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীরা আনুমানিক আড়াই লক্ষ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করেছিল। তাদের নারকীয় অত্যাচার কাঁপিয়ে দিয়েছিল বিবেক এবং মানবিক অধিকারের ভিত্তি।
এই প্রস্তাবে বাংলাদেশের বিচার পদ্ধতিরও নিন্দা করা হয়েছে। এই ভাবে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে-তা হল এই যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম চলার সময় মোহাজিদ এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরির করা মানবতাবিরোধী অপরাধগুলিকে সে সমর্থন করে এবং পূর্বতন পাকিস্তানের পূর্বাংশ হারানো এখনও সে মানতে পারছেনা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সঠিক ভাবেই দেশের অভ্যন্তরীন ব্যাপারে পাকিস্তানের হস্তক্ষেপের নিন্দা করেছেন।

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামাত নেতাদের বিচার সম্পূর্ন ভাবে স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ ভাবে হচ্ছে। যে ট্রাইবুনালগুলিতে বিচার হচ্ছে, সেগুলি আইন মোতাবেকই গঠিত হয়েছে এবং সমস্ত রকমের আইনি পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। মুক্ত আদালতে সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিতে চলা  এই বিচারের পদ্ধতির ব্যাপারে কোনও লুকোচুরির ব্যাপার নেই। সুতরাং যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে কুমীরের কান্না না কেঁদে এবং বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সম্পর্কে প্রশ্ন না তুলে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় স্থানীয় সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে যে বীভৎসা গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানের সৈন্যরা, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুক পাকিস্তান।

উনিশশো চুয়াত্তর সালের যে ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারত সই করেছিল, তাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রমের সময় পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচারের জন্য  ক্ষমাপ্রার্থনা করা বাধ্যতামূলক বলা হয়েছিল। এই ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে পরিষ্কার ভাবে বলা হয়েছিল যে, সেনাবাহিনী কোনও অপরাধ করে থাকলে পাকিস্তান সরকার তার নিন্দা করছে এবং  গভীর দুঃখপ্রকাশ করছে। আরও বলা হয়েছিল,পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অতীতের অন্যায় ভুলে গিয়ে মাপ করে দেওয়ার জন্য (ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট) বাংলাদেশের মানুষের কাছে আবেদন  কছেন এবং তার প্রতি সম্মান জানিয়ে ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দী পাকিস্তানি সেনাকে ক্ষমা করে দিয়ে তাদের বিচার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী।

কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে গণহত্যা, ধর্ষণ এবং অন্যান্য জঘন্য অপরাধ করা যুদ্ধবন্দী পাক সেনাদের ফিরে যেতে দেওয়া হলেও পাকিস্তান তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায়নি অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী কথিত 'ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট" বাস্তবায়িত  হলনা এখনও।

 

দখলদারি পাক সেনা এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের হাতে ১৯৭১ সালে ঠিক কত মানুষ নিহত হয়েছিলেন তার সঠিক হিসাব অজানা। তবে কোনও কোনও হিসাব অনুযায়ী সেই সংখ্যা তিরিশ লক্ষ এবং এ ছাড়াও আরও আট থেকে দশ লক্ষ হিন্দু ও মুসলমান নিরাপত্তার অভাবে দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রতিবেশী ভারতে। নানা ধরণের মানবতাবিরোধী অপরাধ করা ছাড়াও পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীরা আনুমানিক আড়াই লক্ষ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করেছিল। তাদের নারকীয় অত্যাচার কাঁপিয়ে দিয়েছিল বিবেক এবং মানবিক অধিকারের ভিত্তি।

 

অনেক ক্ষেত্রেই অল্পবয়সী মেয়েদের যৌন সহচরী হিসাবে এক সেনা শিবির থেকে অন্য শিবিরে নিয়ে যাওয়া হত। যে পৈশাচিক অত্যাচার হত তাদের উপর, তার মধ্যে ছিল স্তন কেটে নেওয়া এবং বেয়নেট অথবা বন্দুকের নল ঢুকিয়ে গোপনাঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া। আহতদের গাছ থেকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হত মৃত্যু। হাত পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় নদী দিয়ে বহু সহস্র মৃতদেহের ভেসে যাওয়া সাধারণ দৃশ্য ছিল সে সময়। নিরস্ত্র অসামরিক মানুষদের যথেচ্ছ হত্যা এত পরিমাণে হয়েছিল যে, সেই সব শবদেহ সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পেশাদার সাফাইকর্মীদের নিয়োগ করতে হত। এ সমস্ত কিছুই করা হয়েছিল যে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদ পাকিস্তানের কবল থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে মানুষকে অস্ত্র হাতে নিতে উদ্দীপ্ত করেছিল, তার শিরদাঁড়া ভাঙার জন্য।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ব্যাপক গণহত্যা এবং অত্যাচারের জন্য ক্ষমা চাইতে ক্রমাগত ভাবে অস্বীকার করে যাচ্ছে পাকিস্তান। এটি একটি অতি আবেগ-তাড়িত বিষয়, যা বাংলাদেশ-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতিতে বাধা দিয়ে যাচ্ছে।

 

পাকিস্তানের প্রয়াত এক সেনা অফিসার মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজার লেখা এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ' আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি-ইস্ট পাকিস্তান' নামের বইটিতে  তৎকালীন ্পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক জেনারেল আমির আবদুল্লা খান নিয়াজির বলা একটি কথার উল্লেখ আছে। নিয়াজি বলেছিলেন, তিনি তাঁর সেনাদের পূর্ব পাকিস্তানের নারীদের উপর ছেড়ে রাখবেন, যত দিন না পর্যন্ত বাঙালিদের জাতি পরিচয় বদলে যায়। কী অসম্ভব উদ্ধত, স্পর্ধিত, বিপজ্জনক কথা!

 

পাকিস্তানের পরাজয়ের কারন খতিয়ে দেখার জন্য সে দেশের সরকার যে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছিল (হামুদুর রহমান কমিশন)। সেই কমিশন বলেছিল, ব্যাপক অত্যাচার, পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সামরিক-বেসামরিক নেতৃত্বের সম্পূর্ন ব্যর্থতাই পূর্ব পাকিস্তান হারানোর কারন। সরকারের কাছে দেওয়া রিপোর্টে কমিশন বলেছিল  অত্যাচারের জন্য  ক্ষমা চেয়ে নিক পাক কর্তৃপক্ষ।

 

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির পূর্বশর্ত হিসাবে যখন বাংলাদেশ  চাইছে যে, ইসলামাবাদ ক্ষমাপ্রার্থনা করুক, সেখানে পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বাসিত আলি, যিনি এখন ভারতে পাক হাই কমিশনার হিসাবে নিযুক্ত, ঢাকাকে অতীত ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে  আশা প্রকাশ করেছেন সম্পর্কের ব্যাপারে অতীত প্রভাব  বিস্তার করবেনা। এর উত্তরে বাংলাদেশ সঙ্গে সঙ্গে জানিয়েছে যে, একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবেই।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ব্যাপক গণহত্যা এবং অত্যাচারের জন্য ক্ষমা চাইতে ক্রমাগত ভাবে অস্বীকার করে যাচ্ছে পাকিস্তান। এটি একটি অতি আবেগ-তাড়িত বিষয়, যা বাংলাদেশ-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতিতে বাধা দিয়ে যাচ্ছে।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics