Column
অবশেষে শেষ বিচার সম্পন্ন হল নিজামির

19 May 2016

#

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ রুখতে মতিউর রহমান নিজামি ৪৫ বছর আগে যে সব ঘৃণ্য মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিলেন, ৪৫ বছর পরে অবশেষে তার বিচার মিলল। মে মাসের দশ তারিখের ভোরে ফাঁসি হয়ে গেল এই কুখ্যাত জামাত নেতার। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে যাতে বাংলাদেশ জন্মগ্রহণ না করতে পারে, তার জন্য সব রকমের চেষ্টাই করেছিলেন নিজামি।

একাত্তরের সংগ্রামের সময় সন্ত্রাস নামিয়ে আনা নির্দয় আল-বদর বাহিনী গঠনের অন্যতম কারিগর ছিলেন নিজামি। এই আল বদরের সদস্যরা নিরস্ত্র অসামরিক নাগরিকদের খুন করেছে,  বাঙালি নারীদের ধর্ষণ করেছে, লুঠ করেছে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পত্তি।

 

সংগ্রামের শেষ দিকে  পাকিস্তানের পরাজয় আসন্ন বুঝে পাকিস্তান বাহিনীর স্থানীয় দোসর আল-বদর পরিকল্পিত ভাবে জাতির উজ্জ্বলতম ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে গিয়ে অত্যাচারের পর হত্যা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল তখনও জন্ম না নেওয়া বাংলাদেশকে চিন্তা-ভাবনার দিক দিয়ে পঙ্গু করে দেওয়া। দখলদারি পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়ক সেই আল-বদর জঙ্গি বাহিনীর পুরোভাগে সেই সময় ছিলেন এই  নিজামি।


প্রাণদন্ডের হুকুমের বিরুদ্ধে নিজামির আপীল খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, " আসামীর কৃত সমস্ত অপরাধই চরম নৃশংসতা এবং ভয়াবহতার পরিচয় বহন করে। এই সব অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় শুধুমাত্র নিহতদের পরিজনেরাই নয়, সমগ্র সমাজ তীব্র আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। অনেক দিন ধরেই সমগ্র সমাজ এই সব অপরাধীদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করছে।"
স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করা দায়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল-১ ২০১৪ সালের ২৯শে অক্টোবর মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল নিজামিকে। গণহত্যা, পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা, হত্যার ষড়যন্ত্র এবং ধর্ষণে যুক্ত ছিলেন এই ব্যক্তি। রায় দানের সময় আই সি টি-র বিচারক বলেছিলেন, যে ভয়ানক অপরাধ নিজামি করেছে, মৃত্যুই তার একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি।


স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের হত্যা করা ছাড়াও নিজামির নেতৃত্বাধীন আল-বদর বাংলাদেশের ইসলামিকরণের উদ্দেশ্যে এক তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করেছিল। এই কারণে এই জঙ্গি বাহিনী হিন্দু এবং মুসলমান-উভয় সম্প্রদায় থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের বেছে নিয়ে তাঁদের খতম করেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এবং তার পরে দেশের ভিতরে এবং বাইরে বিভিন্ন খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে নিজামি এবং তার আল-বদর বাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবী হত্যার ভয়ংকর কাহিনী।

 

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হত্যা, তাদের উপর অত্যাচার করে পঙ্গু করে দেওয়া এবং তাঁদের সম্পত্তি লুঠ করা, বাঙালি নারীদের ধর্ষণ, প্রভৃতি বহু নারকীয় ঘটনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন নিজামি। জামাত এবং তার ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র সংঘ, যার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি,  পরিণত হয়েছিল আল-বদরে। ঐতিহাসিকভাবে  স্বাধীনতাবিরোধী একটি শক্তি হিসেবে পরিচিত এই সংগঠনটি ন'মাসব্যাপী অত্যাচার চালানো দখলদারী পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছিল।

 

১৯৭১ সালে জামাতের নিজস্ব মুখপত্র 'দৈনিক সংগ্রাম'-এর বিভিন্ন সংখ্যায় ছাপা হওয়া প্রতিবেদনগুলি থেকে এ কথা পরিষ্কার যে, 'ইসলামের শত্রু' মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতাসংগ্রামের সমর্থকদের বিরুদ্ধে তরুণদের প্ররোচিত করতে নিজামি ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে বক্তৃতা করতেন। সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে এই সব ভুল বার্তা, যেমন, 'পাকিস্তান আল্লাহর বাসস্থান,' 'হিন্দুরা ইসলামের শত্রু' কিংবা 'পাকিস্তান এবং ইসলাম এক এবং অবিভাজ্য', সত্যি হিসেবে তরুণদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইসলামি আদর্শের নামে এই প্রচারে প্ররোচিত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভয়ংকর সব অত্যাচারের ঘটনা ঘটিয়েছিল তারা।


একাত্তরে গোয়েন্দা বাহিনী সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, সেই বছরের ১৪ ই জুন তারিখে জামালপুরে জামাতের ছাত্র সংগঠণ ইসলামি ছাত্র সংঘের একটি সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে নিজামি   ভাষণ দেওয়ার সময় 'ইসলাম এবং পাকিস্তানের রক্ষার্থে' পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ছাত্র সংঘের কর্মীদের।

জঘণ্য অপরাধকে বৈধতা দিতে ধর্মের অপব্যবহারের কী পরিণতি হতে পারে, তা আজকের প্রজন্ম বুঝতে পারছে। দেরীতে হলেও সুবিচার অবশেষে পৌঁছচ্ছে একাত্তরের গণহত্যায় নিহতদের পরিবারগুলির কাছে।


একাত্তর সালে ইসলামি ছাত্র সংঘের প্রধান নিজামি জামাতের মুখপত্র 'সংগ্রাম'-য়ে একটি নিবন্ধে লিখেছিলেন, "তাঁর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য আল্লাহ পাকিস্তানকে তাঁর গৃহ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।" নিজামি বলেছিলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের 'খোদাদ্রোহী' হিসেবে  বর্ননা করেছিলেন। নিবন্ধটিতে তিনি আরও লিখেছিলেন, "যে কাপুরুষেরা সর্বশক্তিমান আল্লাহর বিরুদ্ধে, তারা আল্লাহর পবিত্রভূমি আক্রমণ করেছে।" ডেইলি সংগ্রামের ১৫ই সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ সংখ্যাটিতে নিজামিকে  উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, "প্রতিটি প্রকৃত মুসলিমের উচিত ইসলামের একজন নিবেদিতপ্রাণ সৈনিকের ভূমিকা পালন করা এবং যারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, তাদের হত্যা করা। কারন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার মানে আল্লাহর বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করা।"


উনিশশো একাত্তর সালের ২৫শে মার্চের কালো রাত থেকে শুরু হওয়া হাজার হাজার মানুষের গণহত্যা এবং বাঙালি নারীদের ধর্ষণ কান্ডকে এই ব্যক্তি "দেশের রক্ষার্থে পাকিস্তানি বাহিনীর সময়োচিত হস্তক্ষেপ" বলে বর্ননা করেছিলেন। তিনি যে পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়ক দল হিসেবে রাজাকার এবং আল বদরের জঙ্গি দল গঠন করে তাদের আধুনিক অস্ত্র সজ্জিত করে তুলেছিলেন, সে কথা জামাতের মুখপত্র সংগ্রামেই লেখা হয়েছিল।

 

যখন নিজামি উপলব্ধি করলেন যে, পাকিস্তানের পরাজয় আসন্ন, তখন তিনি এবং তাঁর অনুগামীরা ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর তারিখে, অর্থাৎ বিজয় দিবসের ঠিক দু'দিন আগে
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সমস্ত শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী এবং পেশাদার মানুষদের বেছে বেছে তুলে এনে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করেছিলেন। এই বীভৎস কান্ড ঘটানো হয়েছিল যাতে স্বাধীন হলেও বাংলাদেশে কোনও  যোগ্য নেতৃত্ব না থাকে, সেই উদ্দেশ্য নিয়ে। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সব থেকে কালো দিন। আজও এই দিনটি শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালিত হয়।

 

প্রাণদন্ডের হুকুমের বিরুদ্ধে নিজামির আপীল খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, " আসামীর কৃত সমস্ত অপরাধই চরম নৃশংসতা এবং ভয়াবহতার পরিচয় বহন করে। এই সব অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় শুধুমাত্র নিহতদের পরিজনেরাই নয়, সমগ্র সমাজ তীব্র আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। অনেক দিন ধরেই সমগ্র সমাজ এই সব অপরাধীদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করছে।"

 

একাত্তরে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ জন্মগ্রহন করা সঙ্গে সঙ্গেই নিজামি দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল, কিন্তু ১৯৭৫ সালে রাষ্টের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর ফিরে আসে সে। যে জঘন্য অপরাধ নিজামি করেছিল, তার জন্য শাস্তি দেওয়ার বদলে দেশের প্রথম সামরিক শাসক এবং বিএনপি-র প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান তাকে পুনর্বাসন দেন। ক্রমে ক্রমে বিপুল রাজনৈতিক ক্ষমতা  অর্জন করা  নিজামি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশের শাসনক্ষমতায় থাকা বিএনপি-নেতৃত্বাধীন চার দলের জোট সরকারে মন্ত্রীও হয়। এ এক চরম লজ্জা যে, দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা এক ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী মন্ত্রী হয়ে সরকারে গাড়িতে দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে সেই সময়।

 

যে সব যুদ্ধাপরাধীর প্রাণদন্ড এ পর্যন্ত কার্যকর হয়েছে, নিজামি তাদের মধ্য পঞ্চম। এর আগে জামাত নেতা আবদুল কাদের মোল্লা, মহম্মদ কামারুজ্জামান, আলি আহসান মহম্মদ মোজাহিদ এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরের ফাঁসি হয়েছে।


জঘণ্য অপরাধকে বৈধতা দিতে ধর্মের অপব্যবহারের কী পরিণতি হতে পারে, তা আজকের প্রজন্ম বুঝতে পারছে। দেরীতে হলেও সুবিচার অবশেষে পৌঁছচ্ছে একাত্তরের গণহত্যায় নিহতদের পরিবারগুলির কাছে।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics